ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণগুলি উল্লেখ করো। নবম শ্রেণী ইতিহাস। - Online story

Friday, 27 March 2026

ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণগুলি উল্লেখ করো। নবম শ্রেণী ইতিহাস।

 



প্রশ্ন :  ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কারণ ব্যাখ্যা করো।


[উত্তর সংকেত : ভূমিকা – অর্থনৈতিক কারণ : (১) রাজতন্ত্রের অমিতব্যয়িতা, (২) ত্রুটিপূর্ণ কর ব্যবস্থা, (৩) বিভিন্ন রকম কর, (৪) সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি, (৫) রুটির জন্য দাঙ্গা, (৬) সংস্কারের চেষ্টা – রাজনৈতিক কারণ : (১) স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র, (২) অভিজাত সম্প্রদায়ের অযোগ্যতা, (৩) দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারব্যবস্থা, (৪) লেতর দ্য ক্যাশে, (৫) ইনটেনডেন্ট, (৬) পররাষ্ট্র নীতি মূল্যায়ন।]


উত্তর> ভূমিকা : ফরাসি বিপ্লবের মূল কারণ হিসেবে সেদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা দায়ী ছিল। ইংরেজ অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ মন্তব্য করেন—“বিপ্লবের পূর্বে ফ্রান্স ছিল ভ্রাস্ত অর্থনীতির জাদুঘর।”

অর্থনৈতিক কারণ : ফরাসি বিপ্লবের পশ্চাতে যেসকল অর্থনৈতিক কারণগুলি হল—

(১)রাজতন্ত্রের অমিতব্যয়িতা : ফরাসি রাজাদের অমিতব্যয়িতা, বিলাসিতা ফরাসি রাজকোশকে শূন্য করে তুলেছিল, রানি মেরি আঁতোয়ানেৎ-এর বিলাসপূর্ণ জীবনযাপন সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।

(২) ত্রুটিপূর্ণ কর ব্যবস্থা : ফরাসি বিপ্লবের আগে ফ্রান্সের কর ব্যবস্থা ছিল যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। সাধারণত সুবিধাভোগী, বিত্তশালী শ্রেণি রাষ্ট্রের করের সিংহভাগ বহন করে থাকে। কিন্তু ফ্রান্সের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, সুবিধাহীন তৃতীয় সম্প্রদায়ের মানুষদেরকেই করের প্রায় সবটাই বহন করতে হত।

(৩) বিভিন্ন রকম কর : নানাবিধ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর প্রদানের ফলে তৃতীয় সম্প্রদায়ের মানুষের আর্থিক সংকট তীব্র হয়ে উঠেছিল।

(৪) সরকারি কর্মচারীদের দুর্নীতি : ইনটেনডেন্ট নানক প্রাদেশিক শাসনকর্তা ও ফারমারস জেনারেল নামক রাজস্ব আদায়কারী কর্মচারীরা প্রজাদের কাছ থেকে অসাধু উপায়ে অধিক হারে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে রাজস্ব আদায় করত।

(৫) রুটির জন্য দাঙ্গা : এসময় ফ্রান্সে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন কমে যায় এবং সারাদেশে খাদ্যাভাব ও ব্যাপক হারে মুদ্রাস্ফীতি ঘটে। সাধারণ মানুষ শুরু করে রুটির জন্য দাঙ্গা।

(৬) সংস্কারের চেষ্টা: অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মুক্ত পাওয়ার জন্য ফরাসি রাজা ষোড়শ লুই কর ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস ও অর্থনৈতিক সংস্কারের চেষ্টা করেন, কিন্তু ব্যর্থ হন। শেষপর্যন্ত অভিজাতদের চাপে রাজা ষোড়শ লুই ১৭৫ বছর পর ফরাসি পার্লামেন্ট স্টেটস্ জেনারেল-এর অধিবেশন ডাকলে বিপ্লবের সূচনা হয়।

● রাজনৈতিক কারণ: ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের পিছনে যেসকল কারণ ছিল, সেগুলির মধ্যে রাজনৈতিক কারণ ছিল যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, যেমন—

(১) স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র : বুরবো রাজারা চরম স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। রাজা চতুর্দশ লুই বলতেন, “আমিই রাষ্ট্র’। প্রজাস্বার্থ না-দেখে রাজারা অমিতব্যয়ী ও সংস্কারবিমুখ হয়ে পড়েন এবং জড়িয়ে পড়েন একের-পর-এক ব্যয়বহুল যুদ্ধে। এর ফলে ফরাসি জনসাধারণ রাজতন্ত্রের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে।

(২) অভিজাত সম্প্রদায়ের অযোগ্যতা : বংশানুক্রমিকভাবে অভিজাত পদ লাভের প্রক্রিয়া চালু থাকার ফলে অযোগ্য শাসকরাও শাসনব্যবস্থায় উচ্চপদের অধিকারী হয়। এর ফলে ফ্রান্সে যোগ্য প্রশাসকের অভাব দেখা যায় ও বৃদ্ধি পায় দুর্নীতি।

(৩) দুর্নীতিগ্রস্ত বিচারব্যবস্থা : বিচারব্যবস্থা ছিল যথেষ্ট ব্যয়বহুল, জটিল ও দুর্নীতিপূর্ণ। বিচারকরা লঘুপাপে গুরুদণ্ড দিতেন, আবার কখনও-বা উৎকোচ নিয়ে বিচার নিষ্পন্ন করতেন।

(৪) লেতর দ্য ক্যাশে : লেতর দ্য ক্যাশে নামের একটি রাজকীয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ব্যবহার করে অভিজাতরা সাধারণ মানুষকে গ্রেফতার করে তাদের বিনা বিচারে দীর্ঘদিন আটক করে রাখত। ফলে রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ বিপ্লবের পথে অগ্রসর হয়।

(৫) ইনটেনডেন্ট : দুর্নীতিগ্রস্ত, স্বার্থপর ও অত্যাচারী ইনটেনডেন্ট নামক সরকারি কর্মচারীরা নির্দিষ্ট পরিমাণের অনেক বেশি রাজস্ব অত্যন্ত কঠোরভাবে আদায় করত বলে সাধারণ মানুষ এদের 'রক্তলোলুপ নেকড়ে' আখ্যায় ভূষিত করে।

(৬) পররাষ্ট্র নীতি : বুরবোঁ রাজারা পররাষ্ট্র নীতিতেও চরম ব্যর্থতার পরিচয় দেন এবং সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের মর্যাদাহানির কারণ হয়ে দাঁড়ান, যা ফরাসি বিপ্লবের কারণে রূপান্তরিত হয়।


মূল্যায়ন: রাজা ষোড়শ লুই, রানি মেরি আঁতোয়ানেৎ ও অভিজাতদের প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে যদি আর্থিক সংস্কার দৃঢ়ভাবে করতে পারতেন তাহলে হয়তো বৈপ্লবিক পরিস্থিতি এড়ানো যেত, কিন্তু তিনি তা পারেননি। এজন্য ঐতিহাসিক মাদেলাঁ বলেন, “ফরাসি রাজতন্ত্রই বিপ্লব ঘটিয়েছিল।”