চির চিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে। কাকে এ কথা বলা হয়েছে? কিভাবে তার অপমানিত ইতিহাসের চির চিহ্ন মুদ্রিত হল? আফ্রিকা কবিতা || দশম শ্রেণী - Online story

Saturday, 14 March 2026

চির চিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে। কাকে এ কথা বলা হয়েছে? কিভাবে তার অপমানিত ইতিহাসের চির চিহ্ন মুদ্রিত হল? আফ্রিকা কবিতা || দশম শ্রেণী

 



প্রশ্ন: ‘চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে।।—কাকে এ কথা বলা হয়েছে? কীভাবে তার অপমানিত ইতিহাসে চিরচিহ্ন মুদ্রিত হল?

অথবা, 'চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে।।– “তোমার’ বলতে কার কথা বলা হয়েছে? তার ‘অপমানিত ইতিহাস'-এর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দাও।


উত্তর> রবীন্দ্রনাথের 'আফ্রিকা' কবিতায় উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটিতে অপমানিত আফ্রিকাকে এ কথা বলা হয়েছে অর্থাৎ ‘তোমার’ বলতে কবি আফ্রিকা মহাদেশের কথা বলেছেন।

|| রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'আফ্রিকা' কবিতায় 'অপমানিত ইতিহাস' বলতে সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের দ্বারা শোষিত আফ্রিকার বঞ্চনা ও লাঞ্ছনার ইতিহাসকে বুঝিয়েছেন। সৃষ্টির সূচনা থেকেই আফ্রিকা অরণ্যাবৃত। সে তথাকথিত উন্নত সভ্যতার আলো থেকে বহু দূরে নির্বাসিত ছিল। সভ্য ইউরোপীয় সভ্যতার চোখেও আফ্রিকা উপেক্ষিত ছিল দীর্ঘদিন। তথাকথিত 'সভ্য' পাশ্চাত্য সভ্যতা আফ্রিকার নিজস্ব জীবনধারা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ইত্যাদিকে স্বীকার করত না। কিন্তু ঊনবিংশ শতকে ইউরোপীয়রা আফ্রিকায় উপনিবেশ স্থাপনের সূচনার ফলে ক্রমে এ শতকের শেষে প্রায় পুরো আফ্রিকাই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের উপনিবেশে পরিণত হয়। আফ্রিকার সম্পদের সন্ধান পেতে এই শ্বেতাঙ্গ ঔপনিবেশিক তথা সাম্রাজ্যবাদীর দল শুরু করে মানবিক লাঞ্ছনা। তাই কবি বলেন-

এল ওরা লোহার হাতকড়ি নিয়ে,

নখ যাদের তীক্ষ্ণ তোমার নেকড়ের চেয়ে।

আফ্রিকার কৃয়াজা সরল মানুষগুলিকে লোহার হাতকড়ি পরিয়ে 'মানুষ-ধরা' এই বর্বরেরা তাদের পরিণত করে ক্রীতদাসে। তাদের বর্বরতা ও লোভ আফ্রিকার সূর্যতারা অরণ্যের চেয়েও কালো। এইসব অত্যাচারিত মানুষদের রক্ত ও অশ্রুতে কর্ণমাপ্ত হয় আফ্রিকার বনপথের ধুলো। সাম্রাজ্যবাদ দস্যুদের কাটা মারা জুতোর তলার কাদার পিন্ড এভাবেই আফ্রিকার অপমানিত ইতিহাসে চিরচিহ্ন দিয়ে গেছে।

প্রশ্ন: 'প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রুদ্ধশ্বাস / যখন গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুরা বেরিয়ে এল-  'প্রদোষকাল ঝঞ্ঝাবাতাসে রুদ্ধশ্বাস' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? 'গুপ্ত গঙ্গার' থেকে পশুদের বেরিয়ে আসা কোন ঐতিহাসিক ঘটনার ইঙ্গিত বহন করে?


উত্তর>  'আফ্রিকা' কবিতার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী শাসনের প্রত্যক্ষদর্শী

রবীন্দ্রনাথ ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদকে তীব্র ধিক্কার জানিয়েছেন সাম্রাজ্যবাদ দীর্ঘস্থায়ী হলেও তা যে চিরস্থায়ী নয় সে-কথা বোঝাতেই কবি যেন 'আফ্রিকা' কবিতা লিখেছেন। আফ্রিকার জন্মলগ্ন থেকে শুরু করে সাম্রাজ্যবাদী হামলায় মানবতার

অবক্ষয় এবং শেষে ঔপনিবেশিকতার যবনিকা তথা আসন্ন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘোষণা এই কবিতার ব্যক্ত হয়েছে। 'প্রদোষকাল শব্দটির অর্থ সন্ধ্যা অর্থাৎ দিনের শেষ সময়। 'বঙ্কাবাতাস' ও 'রুদ্ধশ্বাস' শব্দ দুটি সমকালীন অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার সূচক। তাই উদ্ধৃত পঙ্ক্তিটির সাহায্যে কবি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি দেখিয়েছেন, যে-সাম্রাজ্যবাদী শাসন এতদিন অসহায় আফ্রিকার ওপর অত্যাচার চালিয়ে এসেছে এবার তার শেষ সময়। এবার পশ্চিমি সভ্যতা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখে, বিপন্ন হতে চলেছে তার অস্তিত্ব।

| ‘গুপ্ত গহ্বর থেকে পশুদের বেরিয়ে আসা বলতে কবি আড়াল থেকে শোষণ, অত্যাচার চালানো পাশবিক শক্তির সামনাসামনি আসাকে বোঝাতে চেয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা একসময় অসহায় আফ্রিকার ওপর চালিয়েছে অকথ্য অত্যাচার। হত্যা করেছে মানবিকতাকে।

প্রথম যুদ্ধোত্তর কালে এই অসুখে মানুষ বেসামাল হয়ে পড়ে, তখন থেকেই অনিবার্যভাবে প্রকট হয়ে উঠেছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনা। গুপ্ত গহ্বর থেকে হিংস্র পশুর বেরিয়ে আসা আসলে সভ্যসমাজের বর্বর রূপের বহিঃপ্রকাশেরই ইঙ্গিতবাহী।