সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্য বাণী। পূণ্য বাণীটি কি ? কেন এই পুণ্য বাণীটি প্রয়োগ অনিবার্য হয়ে উঠেছে ? আফ্রিকা কবিতা || দশম শ্রেণী
![]() |
প্রশ্ন: ‘দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে; /বলো 'ক্ষমা করো-হিংস্র প্রলাপের মধ্যে/সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।
—উদ্ধৃত পঙ্ক্তিগুলির মধ্য দিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তার যে-পরিচয় মেলে, তা আলোচনা করো।
অথবা, 'দাঁড়াও ওই মানহারা মানবীর দ্বারে; কবি কোন মানহারা মানবীর দ্বারে দাঁড়াতে বলেছেন তা 'আফ্রিকা' কবিতার বিষয়বস্তু অবলম্বনে আলোচন করো।
উত্তর> ‘আফ্রিকা' কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের প্রতিবাদী সত্তার প্রতীক। সম্রাজ্যবাদী শাসনের নগ্ন চেহারা কবি নিজে চোখে প্রত্যক্ষ করেছেন। তাই তিনি ছিলেন ঘোরতর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী। কবির 'মানহারা মানবী' হল 'আফ্রিকা'।
সে যেন আমাদের রূপকথার দুয়োরানি। তাকে নিজের অধিকার পেতে হাজারো পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। পাশ্চাত্য ঔপনিবেশিক সভ্যতা 'মানবী' আফ্রিকার বুকের মধ্য থেকে ছিনিয়ে নেয় সম্পদের ভাণ্ডারকে আর স্থাপন করে উপনিবেশ। এরপর দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে তার সরল সাদাসিধে মানুষগুলিকে, কিন্তু স্বীকৃতি দেয় না তার সভ্যতা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টিকে। তাই আফ্রিকাকে ডুবে থাকতে হয় উপেক্ষার আবিল অন্ধকারে। ‘ক্ষমা করো’ উদ্ধৃতিটির মধ্য দিয়ে কবি ক্ষমা চাওয়ার কথা বলেছেন। কবি-সাহিত্যিকেরা সত্য ও সুন্দরের প্রতিষ্ঠাতা। তাই শোষণ লাঞ্ছনার স্বীকার আফ্রিকার মর্মবাণী যেন সংবেদনশীল কবি হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছিলেন। ‘আফ্রিকা' কবিতার রচনার সময় গোটা ইউরোপে সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা। শুরু হয় ঔপনিবেশিক ও ফ্যাসিস্ট শক্তির স্বার্থের টানাপোড়েন ও ক্ষমতা হস্তান্তরের পালা। বিশ্বব্যাপী এই হিংস্র প্রলাপের মাঝে কবির দৃষ্টিভঙ্গিতে আফ্রিকা হয়ে ওঠে নিপীড়িত মানবাত্মার প্রতীক। তাই তাঁর মতে
আফ্রিকা ও তার নাগরিকদের ওপর যে-অত্যাচার সভ্যসমাজ করেছে, এর
একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত ক্ষমা ভিক্ষা। হিংসার উন্মত্ততার মাঝে, মানবতার পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাই হবে সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।
প্রশ্ন: সেই হোক তোমার সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণী।। - ‘পুণ্যবাণী’-টি কী? কেন সেই পুণ্যবাণীর প্রয়োগ অনিবার্য হয়ে উঠেছে?
অথবা, যুগান্তের কবির বক্তব্যের সার্থকতা 'আফ্রিকা' কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো।
উত্তর> রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'আফ্রিকা' কবিতা অনুসারে সভ্যতার শেষ পুণ্যবাণীটি হল, শ্বেতাঙ্গ শাসকের অত্যাচারে ক্ষতবিক্ষত আফ্রিকার কাছে নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থনা।
|| কবি এক ভয়াবহ সংকটের প্রাক্কালে এই কবিতাটি রচনা করেন।
ঔপনিবেশিক এবং ফ্যাসিস্ট শক্তির স্বার্থের সংঘাত সেসময় জন্ম দিয়েছিল এক ভয়াবহ সমাজ-রাজনৈতিক অস্থিরতা; যা ক্রমশ সমস্ত পৃথিবীকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয়। হিংসার এমন চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ দেখে ব্যথিত কবি আফ্রিকাকে নিপীড়িত
মনুষ্যত্বের প্রতিভূ হিসেবে তুলে ধরেন। কারণ সাম্রাজ্যবাদী শ্বেতাঙ্গ শাসকের সীমাহীন বর্বরতার এ মহাদেশ বারবার রক্তাক্ত হয়েছে। তাদের কাঁটা-মারা জুতোর দাগ, অসহায় আফ্রিকার হৃদয়ে এঁকে দিয়েছে কলঙ্কের চিরচিহ্ন। আর আফ্রিকাকে কান্না নাম আর রক্তে রাঙ্গিয়ে নির্লজ্জ শাসক নিজ দেশে করেছে সুন্দরের আরাধনা। সেখানে নিরাপদ নিরুপদ্রব জীবনে চোখে পড়ে না কোনো খেদ বা আক্ষেপ। কবি টের পান সাম্রাজ্যবাদী শাসকের এই দ্বিচারিতা, হিংসা ও লোভই আসলে সমগ্র সভ্যতাকে পতন ও অবক্ষয়ের শেষ সীমায় নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে
বেরোতে হলে মানবতাকে পুনরুদ্ধার করা প্রয়োজন। তাই তথাকথিত 'সভ্য'
শাসকের ক্ষমাপ্রার্থনাই হতে পারে তাদের ঘৃণ্য কৃতকর্মের একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত।
যুগান্তরের কবি সেই মানবিকতার অর্ঘ্য সাজিয়েই, শেষ পুণ্যবাণীতে সবাইকে দীক্ষিত করতে চেয়েছেন।
