প্রার্থনা কবিতার উৎস সহ বিষয়বস্তু আলোচনা করো। দ্বাদশ শ্রেণী বাংলা। প্রার্থনা কবিতা - Online story

Wednesday, 7 January 2026

প্রার্থনা কবিতার উৎস সহ বিষয়বস্তু আলোচনা করো। দ্বাদশ শ্রেণী বাংলা। প্রার্থনা কবিতা

 


প্রার্থনা কবিতার উৎস সহ বিষয়বস্তু আলোচনা কর

উৎস
‘প্রার্থনা' কবিতাটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'নৈবেদ্য' কাব্যগ্রন্থ থেকে গ্রহণ করা হয়েছে। 'নৈবেদ্য' কাব্যে ১০০টি কবিতা রয়েছে, তার ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা' কবিতাটি। প্রসঙ্গত বলা যায় যে, 'নৈবেদ্য' কাব্যের কোন কবিতারই নামকরণ করেননি কবি, নৈবেদ্য'-র ৭২ নং কবিতাটির প্রথম চরণ হল – চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির'। এই কবিতাটিই এখানে ‘প্রার্থনা’
শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। নৈবেদ্য কাবাটির প্রথম প্রকাশ ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে। রবীন্দ্রনাথ এই কাব্যটি উৎসর্গ করেছেন পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে।

প্রার্থনা কবিতার বিষয়বস্তু:-
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নৈবেদ্য' কাব্যের কবিতাগুলি লিখতে শুরু করেন ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দে আর শেষ করেন ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে। রবীন্দ্রকাব্য বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারব ‘চৈতালি’ থেকে ‘ক্ষণিকা' পর্যন্ত কবির মানসলোকে যে সর্বোচ্চ আদর্শের গভীর আকুতি লক্ষ করা যায়, তারই অন্তিম পর্যায় “নৈবেদ্য” কাব্যপর্ব। প্রাচীন ভারতের সরল, শান্তিময় জীবনধারার মধ্যেই যে কবি জীবনের সর্বোত্তম আদর্শকে খুঁজে পেতে চেয়েছেন, তারই সাক্ষ্য বহন করছে নৈবেদ্য" কাব্যের অন্যান্য কবিতার মতোই ৭২ নং কবিতা "প্রার্থনা'"। কবির অন্তরাত্মার অনুভবের ফসল আলোচ্য কবিতাটি।
ভারতের প্রাচীন সহজসরল সত্তাকে কবি বর্তমানে কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না। সর্বগ্রাসী অধঃপতন যেন ভারতকে গ্রাস করেছে। কবি অনুভব করেন ভারতীয়দের মর্মলোক আজ আচ্ছন্ন হয়েছে গ্লানিতে। অল্পেই তাদের শির হচ্ছে অবনত আর জ্ঞান এখানে বন্ধ হয়ে পড়ছে সংকীর্ণতার জটাজালে। কবি চান ভারতীয়রা চিত্তকে ভয়শূন্য করে, উন্নত শিরে, মুক্ত জ্ঞানের অধিকারী হোক।
গৃহের সীমাবদ্ধ গন্ডিকে অতিক্রম করে মুক্ত পৃথিবীতে এগিয়ে যেতে হবে দেশবাসীকে, নানা কাজের মধ্যে কর্মমুখর থেকে নিজেকে করতে হবে সার্থক।
সংকীর্ণ আচারের মলিনতাকে দূর করতে হবে আর ভারতীয়দের জাগ্রত হতে হবে আপন পৌরুষত্বে। ঈশ্বরবিশ্বাসী কবির মতে সকল কর্ম-চিন্তা-আনন্দের নেতা হলেন পরমেশ্বর। তিনিই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে ভারতীয়দের প্রাচীন গৌরবে প্রতিষ্ঠিত করবেন। অর্থাৎ নানা আঘাতের মধ্য দিয়েই ভারতীয়দের মানসিক অচলাবস্থা দূরীভূত হবে এবং তারা পূর্ব গৌরবময় পরিবেশ সৃষ্টি করতে সক্ষম হবেন।



অর্থ উল্লেখ করে উদ্ধৃত অংশটির তাৎপর্য আলোচনা করো।

উত্তর : প্রশ্নোকৃত অংশটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'নৈবেদ্য' কাব্যের অন্তর্গত ৭২ নং কবিতা প্রার্থনা' থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে 'কর্মধারা' বোঝাতে অনবরত কর্মপ্রবাহকে বুঝিয়েছেন কবি। অর্থাৎ ‘কর্মধারা’ কথা
অর্থ হল কর্ম-প্রবাহ।
ভারতবাসী কখনও কর্মহীনতা তথা অলসতাকে প্রশ্রয় দেয়নি। কর্মহীনতা তথা গতিহীনতা জীবনকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। সুপ্রাচীন কাল থেকেই ভারতবাসী এই নীতিকে শাহার সঙ্গে গ্রহণ করেছে এবং কর্মের লক্ষ্যেই ছুটে চলেছে তারা। শুধু আপনার জন্মস্থান বা বিশেষ কোনো দেশে নিজেকে আটকে না-রোখে বিশ্বের নানা প্রান্তে ভারতীয়রা পৌঁছে গেছে কর্মের পতাকা বহন করে। কর্ম ও কল্যাণসাধনের মাধ্যমেই তারা জীবনের সত্যকে অনুভব করেছে। তারা
বুঝেছে যে, কর্মপ্রবাহ তথা কর্মধারাই সভ্যতার গতিকে অব্যহত রাখতে পারে।

প্রশ্ন:  তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি কী করতে পারে আর কী করতে পারেনি— 'প্রার্থনা' কবিতা অবলম্বনে লেখো।
উত্তর : কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রার্থনা
'' কবিতায় তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি-র উত্থাপন করেছেন। এই মরুবালুরাশি বিচারের পথকে গ্রাস করে ফেলতে পারে।
"তুচ্ছ আচারের মধুবালুরাশি হল সংকীর্ণ আচারসর্বস্বতার নেতিবাচক দিক ।আচার-বিচারের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মানবমনের স্বাভাবিক বিচারবোধ বা বিবেকবোধ জাগ্রত হতে পারে না। ফালে মানুষ হারিয়ে ফেলে ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্য খোঁজার ক্ষমতাকে। আর তখনই প্রকৃত বিচার সে করতে পারে না। যুগ যুগ ধরেই নানা সংকীর্ণ আচার মেনে আসছে ভারতীয়রা, যা সভ্যতার অগ্রগতির পরিপন্থী। কিন্তু কবি সেই ভারতের কথা বলেছেন- যেখানে
সংকীর্ণ সংস্কারের আবর্তে নিজেদের বিবেকবোধ ও বিচারবোধকে হারিয়ে ফেলেনি ভারতীয়রা। ফলে বিচারের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেনি।
"তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি, অর্থাৎ সংকীর্ণ চেতনা ভারতীয়দের ন্যায়বোধ বা বিচারবোধকে গ্রাস করতে পারেনি।

প্রশ্ন:- প্রার্থনা' কবিতায় কবি কাকে এবং কেন 'সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা' বলেছেন?
উত্তর : কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'প্রার্থনা' কবিতায় 'সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা' বলেছেন পরমেশ্বরকে।
পরমেশ্বরে বিশ্বাসী কবি মনে করেছেন এই জগৎ ও জীবনের স্রষ্টা হলেন ঈশ্বর। তিনিই সর্বশক্তিমান। জগতে এমন কোনো কার্য বা ঘটনা ঘটে না, যেখানে পরমেশ্বরের পবিত্র স্পর্শ পড়ে না। কবিগুরু অনুভব করেছেন বর্তমান
ভারতীয়রা অলস, কর্মবিমুখ, চিন্তাশক্তিহীন একপ্রকার জড়তা দ্বারা আক্রান্ত। ফলে ভারতীয়রা হারিয়েছে তাদের পূর্বগৌরব। এই অবস্থা থেকে ভারতীয়দের উত্তরণ ঘটাতে পারে কেবলই সর্বশক্তিমান পরম-পিতা। তিনিই পারবেন
বর্তমান ভারতীয়দের চিন্তাচেতনার জগতে আঘাত হেনে তাদের কর্মস্রোতে ফিরিয়ে আনতে। পরমেশ্বরই পারবেন জ্ঞানচর্চার সীমাবদ্ধতার অবসান ঘটিয়ে ভারতীয়দের প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান দিতে। যেহেতু ঈশ্বরের অবস্থান সর্বময় এবং মানবজীবনের সকল কিছুরই স্রষ্টা তিনি। তাই আলোচ্য কবিতায় কবি পরমেশ্বরকে উদ্দেশ্য করে 'সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা বলেছেন।
প্রশ্ন:;"নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ,”–কবির এমন আপনার তাৎপর্য আলোচনা করো।
উত্তর : প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'নৈবেদ্য' কাব্যের অন্তর্গত 'প্রার্থনা' কবিতা থেকে নেওয়া হয়েছে। প্রাচীন ভারতের জ্ঞানচর্চা, সাহসিকতা সম্পর্কে কথা প্রসঙ্গে কবি উক্তিটি করেছেন।
কবির মতে প্রাচীন ভারতের মানুষের জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র ছিল মুক্ত, উদার। নানা প্রকার সংস্কার-আচারের আবিলতা সেই জীবনধারাকে গ্রাস করতে পারেনি। কিন্তু বর্তমানে শুষ্ক আচার-অনুশাসনের জালে বন্দি ভারতীয়দের
জীবন। মুক্ত জ্ঞানচর্চার অবকাশ নেই এখানে। বর্তমান ভারতীয়রা যেন আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে মোহনিদ্রায়। ভারতীয়দের এমন জড়তাগ্রস্ততা,
মোহাচ্ছন্নতা দূর করতে পারেন কেবল পরমেশ্বর। তাই পরমেশ্বরের কাছে কবি প্রার্থনা করেছেন—তিনি যেন কঠোর আঘাতের মাধ্যমে ভারতীয়দের
তন্দ্রাচ্ছন্নতার অবসান ঘটিয়ে, তাদের যেন প্রাচীন গৌরবে উন্নীত করেন; অর্থাৎ ভারতীয়দের জাগতিক উন্নতির লক্ষ্যেই পরমেশ্বরের কাছে কবির প্রশ্নোদ্ধৃত প্রার্থনা।

রচনাধর্মী প্রশ্নোত্তর
প্রশ্ন ‘প্রার্থনা' কবিতায় কবি কীভাবে ভারতবর্ষকে স্বর্গে জাগরিত করার কথা বলেছেন, তা নিজের ভাষায় আলোচনা করো।
উত্তর: কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'নৈবেদ্য' কাব্যগ্রন্থের ৭২ নং কবিতা হল ‘প্রার্থনা'। আলোচ্যমান কবিতায় কবি প্রাচীন ভারতের বীরত্ব, উন্নত মানসিকতা, জ্ঞানচর্চার কুণ্ঠাবিহীন প্রশংসা করেছেন শুধু নয়, বর্তমান ভারতবর্ষকে পূর্বগৌরবে উন্নীত করার প্রার্থনাও করেছেন পরমেশ্বরের কাছে।
ভারতীয় সংস্কৃতির মূলসুর হল ঐক্য। ঐক্যের শক্তিতেই ভারতীয়দের মন থেকে বিদূরিত হয়েছিল আপন স্বার্থবোধ ও বিদ্বেশের চেতনা। তবে বর্তমানে সেই অখণ্ড ভারতের চিন্তার ক্ষেত্র থেকে অনেকটাই দূরে সরে গেছে ভারতীয়রা—এটা কবির ধারণা। তাই বর্তমান অবস্থার পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা করেছেন কবিগুরু। ভারতের প্রাচীন গৌরব ছিল স্বর্গের মতোই শ্রেষ্ঠত্বের স্থানে। আলোচ্যমান 'প্রার্থনা' কবিতায় কবিগুরু যে স্বর্গের কথা বলেছেন, তা কোনো কাল্পনিক বা পারলৌকিক স্থান নয়, সেই স্বর্গ বিরাজমান এই মাটির পৃথিবীতেই; সেই স্বর্গ হল উদার মানসিকতা, উন্নত বুদ্ধি ও বিবেকবোধ সমন্বিত এই ধরাধাম। একদা ভারতবর্ষ তার জ্ঞানচেতনা, বিচারবোধ ও আধ্যাত্মিক কর্মসাধনার মাধ্যমে বিশ্বে শ্রেষ্ঠত্বের আসন লাভ
করেছিল। বর্তমান ভারত সেই ঔদার্যের স্থান থেকে অনেকটাই নীচে নেমে গেছে। কবির প্রার্থনা পরমেশ্বরের কাছে—তিনি ভারতীয়দের চেতনায় আঘ হেনে তাদের জাগিয়ে তোলেন, যেন তারা জ্ঞান-গরিমা, ন্যায়নীতিপূর্ণ বলিষ্ঠ জীবনাদর্শ পালনের মধ্য দিয়ে উন্নত শিরে উদার মানবিক চেতনায় উদ্‌বোধিত হবে। তাদের কর্মধারা দিকে দিকে প্রসারিত হবে, প্রাচীর যাবে ভেঙে, প্রতিষ্ঠিত।হবে বলিষ্ঠ জীবনাদর্শ। এভাবেই ভারতবাসী আবার উদার মানসিকতা, উন্নত বুদ্ধি, বিবেকবোধ সমন্বিত স্বর্গে জাগরিত হবে বলে কবির বিশ্বাস।