চিত্ত যেথা ভয় শূণ্য , উচ্চ যেথা শির । উক্তিটির তাৎপর্য আলোচনা করো। দ্বাদশ শ্রেণী বাংলা প্রার্থনা কবিতা।
![]() |
প্রশ্ন:; “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির”-এখানে 'যেথা’ বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? উদ্ধৃতাংশের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর : ‘যেথা'-র পরিচয় : প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'নৈবেদ্য' কাব্যের ৭২ নং কবিতা 'প্রার্থনা' থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে
কবি এমন এক ভারতবর্ষের আকাঙ্ক্ষা করেছেন, যা হবে আদর্শনিষ্ট ও স্বর্গের মতো সুন্দর। যেখানে চিত্ত অর্থাৎ মানবমন থাকবে সকলপ্রকার সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে; ক্ষুদ্রতা বা মানসিক অচলায়তনের গণ্ডির বেড়াজালে আবদ্ধ থাকবে না মানুষের হৃদয়-মন; নির্ভীক মানসিকতায় এবং দীপ্ত ভঙ্গিতে প্রত্যেকে আপন আপন কর্মসাধনায় মগ্ন থাকবেন। আলোচ্য কবিতায় ‘যেথা বলতে এমনই এক আদর্শ ভারতের কথা বুঝিয়েছেন।
তাৎপর্য : কবিগুরু আমাদের গর্বের প্রাচীন ভারতের প্রশংসা করেছেন উদ্ধৃতাংশের মাধ্যমে। তৎকালে ভারতীয়দের মনে ভীতিগ্রস্ততা ছিল না। উন্নত শিরে, মেরুদণ্ড সোজা রেখে সকলপ্রকার বিরুদ্ধতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াত ভারতীয়রা। কাপুরুষতা তাদের চরিত্রে ছিল না। ভয়শূন্য চিত্ত ও উচ্চশির থাকার কারণে নানাপ্রকার সংকীর্ণ আচার-বিচারের আবিলতার দ্বারা ভারতীয়দের পৌরুষকে খণ্ডিত করা যায়নি। চিত্তের দীনতা ও ভীতি থাকলে কখনোই জীবনযুদ্ধে জয়লাভ করা যায় না। এই সংসারে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে সর্বদাই যুদ্ধ চলছে। প্রতিমুহূর্তে জীবনকে বিপর্যস্ত করতে পারে অন্যায়। এরই বিরুদ্ধে সংগ্রামে সফল হয়েছে প্রাচীন ভারত। অকুতকয় ত উন্নত শির হলে ভারতবর্ষ আবার পূর্বাবস্থায় ফিরতে পারে—প্রশ্নোদ্ভূত অংশে কবি এমন ভারতকেই আকাঙ্ক্ষা করেছেন।
প্রশ্ন:: “জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,”- মুক্ত জ্ঞান' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? গৃহের প্রাচীর কীভাবে বসুধারে খণ্ড ক্ষুদ্র করেনি আলোচনা করে বুঝিয়ে দাও।
উত্তর : ‘মুক্ত জ্ঞান’-এর পরিচয় : প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘নৈবেদ্য’ কাব্যের ৭২ নং কবিতা ‘প্রার্থনা’ থেকে নেওয়া হয়েছে।
আলোচ্যমান কবিতায় কবি মুক্ত জ্ঞানের কথা বলেছেন। কবির মতে জ্ঞান কেবল পাঠ্যপুস্তকের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে না। পাঠ্যপুস্তক থেকে অর্জিত জ্ঞান হল খণ্ডিত বা সীমাবদ্ধ জ্ঞান। এখানে সংকীর্ণ চিন্তার সুযোগ থাকে। যে জ্ঞান প্রকৃতির
পারিপার্শ্ব থেকে সংগ্রহ করা হয়, তাতে থাকে হৃদয়ের ঔদার্য, চিন্তার স্বাধীনতা; ক্ষুদ্রতা, মলিনতা দ্বারা এই জ্ঞান আবদ্ধ নয়। এরূপ জ্ঞানকেই বলা হয় মুক্ত জ্ঞান।
যেভাবে গৃহের প্রাচীর বসুধারে মুক্ত রেখেছে : কবির মতে বর্তমান ভারতবাসী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে পিছিয়ে যাচ্ছে, কারণ জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র এখানে
সংকীর্ণতায় আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কিন্তু প্রকৃত জ্ঞানচর্চাকে গৃহের প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে বিশ্বমাঝে বিস্তৃত হওয়াই বাঞ্ছনীয়। ‘রাখে নাই ক্ষুদ্র খণ্ড করি' উক্তিটি ইঙ্গিতবাহী। কবি উপলব্ধি করেছেন প্রাচীন ভারতবর্ষে জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্র ছিল সংকীর্ণ চেতনার ঊর্ধ্বে। তুচ্ছ আচারের বালুরাশি দ্বারা আবদ্ধ ছিল না জ্ঞানচর্চার অঙ্গন। শিক্ষাকে আপন আপন গৃহের প্রাচীরের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখা হত না তৎকালে। ফলে ভারতের জ্ঞানচর্চার বার্তা পৌঁছে যেতে পেরেছিল মুক্ত পৃথিবীতে। এভাবেই গৃহের প্রাচীর বসুধারে ক্ষুদ্র খণ্ড করে রাখেনি।
প্রশ্ন:; “যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি—পৌরুষেরে করে নি শতধা,”
—তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি' বলতে কবি কী বুঝিয়েছেন? উদ্ধৃতাংশের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
উত্তর : ‘তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি : প্রশ্নোদ্ধৃত অংশটি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'নৈবেদ্য' কাব্যের ৭২ নং কবিতা 'প্রার্থনা' থেকে নেওয়া হয়েছে।
ভারতীয়রা যুগ যুগ ধরেই নানাপ্রকার 'আচার’ মেনে আসছে, যার অধিকাংশই অবৈজ্ঞানিক চিন্তার ফসল, যা সমাজের অগ্রগতির পরিপন্থী। বালুকারাশিও চলার পথকে মসৃণ না-করে অনেক বেশি বন্ধুর করে তোলে। অগ্রগমনের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বালুকারাশি। কবি এখানে ‘তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি' বলতে আচার- বিচারের সংকীর্ণতাকেই বুঝিয়েছেন।
তাৎপর্য : আলোচ্যমান কবিতায় কবি কুণ্ঠাহীনভাবে প্রাচীন ভারতবর্ষের প্রশংসা করেছেন। কবির মতে প্রাচীন ভারতীয়দের চিত্ত ছিল ভয়শূন্য, উন্নত মস্তকে সাহসিকতাকে আশ্রয় করে তারা বিপদের বিরোধিতা করত।
তাদের বীরত্ব, হার না মানা মনোভাব, পৌরুষ ছিল অটল। কোনো ভয় বা প্রলোভনের দ্বারাই তাদেরকে আদর্শ থেকে বিচ্যুত করা যেত না। তাদের নানাবিধ কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়েই পৌরুষের প্রকাশ ঘটত। তারা কখনোই ভীরুতার সাধনায় বিশ্বাসী নয়। তাদের লৌহসম কঠিন, বীরোদাত্ত পৌরুষ ছিল অভঙ্গুর। আচার-বিচারের সংকীর্ণতা কখনোই তাদের গ্রাস করেনি। কুণ্ঠাহীনভাবেই দেশের কাজে তারা শির বলিদান করতে পারত। কোনো পথেই তাদের অখণ্ড পৌরুষত্ব খণ্ডিত হয়নি। আলোচ্য উদ্ধৃতাংশের মাধ্যমে কবি এ কথাই বুঝিয়েছেন।
