অদল বদল গল্পে কিছু বড় প্রশ্নের উত্তর - Online story

Sunday, 19 July 2026

অদল বদল গল্পে কিছু বড় প্রশ্নের উত্তর





অদল বদল গল্পের বড় প্রশ্নের উত্তর



কমবেশি ১৫০ শব্দের মধ্যে উত্তর লেখো

প্রশ্ন >  ‘হাত ধরাধরি করে অমৃত ও ইসাব ওদের কাছে - ওদের' বলতে কাদের কথা বোঝানো হয়েছে? অমৃত ও ইসাবের পরিচয় দাও।

উত্তর >  পান্নালাল প্যাটেল রচিত 'অদল বদল' গল্পে ‘ওদের’ বলতে গ্রামের ছেলের দলকে বোঝানো হয়েছে। গল্পের মূল চরিত্র অমৃত ও ইসাবকে ঘিরে যে-ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে, তাতে অনুঘটকের কাজ করেছে এই ছেলের দল।

|| আলোচ্য গল্পে অমৃত ও ইসাব দুজনে অভিন্নহৃদয় বন্ধু। তাদের যে পরিচয় গল্পকার দিয়েছেন, তা নিম্নরূপ-

> পারিবারিক অবস্থা : অমৃত ও ইসাব উভয়ই দরিদ্র চাষি পরিবারের সন্তান। ওদের বাড়ির জমিও প্রায় সমান সমান। অভাবের কারণে ওদের পিতাদের ছাটোখাটো প্রয়োজনে প্রায়ই মহাজনের কাছে হাত পাততে হয়।

> শিক্ষা : অমৃত ও ইসাব উভয়ই একই স্কুলে, একই ক্লাসে পড়ে।

বাড়িঘর : চাষি পরিবারের সন্তান অমৃত ও ইসাবের রাস্তার মোড়ে দুটো ঘড়িও মুখোমুখি অবস্থান করেছে।

পরিবারের মানুষজন : অমৃতর বাড়িতে রয়েছে তার বাবা-মা আর তিন চাই, কিন্তু ইসাবের কেবল বাবা ছাড়া আর কেউ নেই।

 মানবিক বোধ : অমৃত ও ইসাবের এই নিখাদ বন্ধুত্বে আন্তরিক গভীরতা হল। তাই অমৃতর মার খাওয়ার আশঙ্কা থাকলেও কালিয়ার হাত থেকে অমৃতকে বাঁচাতে ইসাব ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আবার নতুন জামা ছিঁড়ে যাওয়ার অপরাধে রাবার হাতে মার খাওয়া থেকে ইসাবকে বাঁচাতে অমৃত তার নতুন জামাটি ইসাবকে পরতে দেয়।

প্রশ্ন : "অমৃত সত্যি তার বাবা-মাকে খুব জ্বালিয়েছিল। -অমৃত কীভাবে বাবা-মাকে জ্বালাতন করেছিল? অবশেষে অমৃতের মা কী করেছিলেন ?



উত্তর > পান্নালাল পাটেলের 'দল বদল' গল্পে অমৃত আর ইসাব—দুজন খুব ভালো বন্ধু। পরস্পরের বন্ধুত্ব যেমন গাঢ় তেমনই পোশাক-পরিচ্ছদ হেতু

পরস্পরের রেষারেষি বেশ প্রবল। দুজনের বাবাই খেতমজুর। খেতে কাজ করতে গিয়ে ইসাবের জামা ছিঁড়ে যাওয়ায় তার বাবা তাকে নতুন জামা কিনে তার দেখাদেখি অমৃতও নতুন জামা কেনার জন্য বাবা-মার কাছে জেদ করে। এক্ষেত্রে দেখাদেখি অমৃত ও নতুন জামা আদায়ের জন্য সে যা করেছিল, তা হল-

মায়ের কাছে দাবি : অমৃত প্রথমেই মাকে জানিয়ে দেয়, ইসাবের মা কিনে দিতে হবে, না-হলে সে স্কুলে যাবে না।


নিজের জামা ছিঁড়ে ফেলা : অমৃতর মা অমৃতকে বোঝান, ইসাব মাঠে কাজ করতে গিয়ে জামা ছিঁড়ে ফেলেছে বলে তার বাবা তাকে জামা কিনে দিয়েছেন, কিন্তু তার জামা তো নতুন রয়েছে। এসব শুনে অমৃত নিজের জামার একটা ছেঁড়া জায়গায় আঙুল ঢুকিয়ে আরও ছিঁড়ে দেয়।

মার খেতে রাজি হওয়া : ইসাবের বাবা ইসাবকে নতুন জামা দেওয়ার আগে খুব মেরেছিলেন বলে অমৃতর মা অমৃতকেও জামা নেওয়ার জন্য বাবার হাতে মার খেতে হবে বলে। অমৃত এতেও রাজি হয়ে যায়। 

স্কুলে যাওয়া ও খাওয়া বন্ধ করা : অমৃত জানত তার মা না-বললে তার বাবা জামা কিনে দিতে রাজি হবেন না। সেক্ষেত্রে, বাবাকে রাজি করানোর উদ্দেশ্যে সে সত্যি-সত্যিই স্কুলে যাওয়া ও খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল।

রাতে বাড়ি না-ফেরার সিদ্ধান্ত : মায়ের মাধ্যমে বাবাকে রাজি করাতে সে রাতের বেলাতেও বাড়ি ফিরতে রাজি হয়নি।

গোয়ালঘরে লুকিয়ে থাকা : মা-বাবাকে জামা কিনে দিতে রাজি করানোর জন্য অমৃত ইসাবের বাবার গোয়ালঘরে লুকিয়ে যায়।

এইভাবে অমৃত তার বাবা-মাকে তার জেদ পূরণে জ্বালাতন করেছিল।

|| অমৃতর মা অমৃতকে তার এই জেদের জন্য বেকায়দায় ফেলতে কৌশলে নতুন জামা কেনার ব্যাপারে তার বাবার কাছে বলতে বলেন। এও বলেন, ইসাবকে জামা কিনে দেওয়ার আগে তার বাবা তাকে খুব মেরেছিলেন। এক্ষেত্রে অবশ্য অমৃত মার খেতেও রাজি হয়ে যায়।

অমৃতর মা জানতেন, অমৃত বাবার মুখের ওপর কথা বলবে না, আর অমৃত জানত মা যদি জামা কেনার ব্যাপারে না-বলেন, তবে তার বাবার রাজি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।

অবশেষে অমৃতর মা হাল ছেড়ে দিয়ে অমৃতের বাবাকে রাজি করিয়েছিলেন তাকে জামা কিনে দেওয়ার জন্য।

প্রশ্ন: 'ছেলের দল আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল,-ছেলের দলের আনন্দের কারণ ব্যাখ্যা করো। এই আনন্দ স্থায়ী হয়েছিল কী?


অথবা, 'তামাশা করে হলেও এখন ব্যাপারটা ঘোরালো হয়ে পড়েছে –তামাশা করে হওয়া ঘটনাটি ব্যক্ত করো। ব্যাপারটা ঘোরালো হয়ে পড়ল কেন ?

উত্তর > পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল' গল্পে হোলির দিন ভিন্ন সম্প্রদায়ের অভিন্নহৃদয়ের অধিকারী দুই বন্ধু অমৃত আর ইসাব একই রঙের, একই মাপের নতুন জামা পরে বেরোয়। গ্রামের দুষ্টু ছেলেরা তা দেখে মজা পায় এবং তাদের শারীরিক শক্তিও এরকম কিনা জানার জন্য অমৃতকে কুস্তি লড়ার প্রস্তাব দেয়, বলে – “তোরা ছুজনে কুস্তি কর তো, দেখি তোরা শক্তিতেও সমান সমান, না একজন বড়ো পালোয়ান।' একদিকে বন্ধুত্ব আর অন্যদিকে মায়ের জামা ময়লা বা নষ্ট না-হওয়ার কঠোর নির্দেশ—এই দুই কারণে অমৃত কুস্তি লড়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু নাছোড় ছেলের দল তাকে জোর করে মাঠে নিয়ে যায়। সেখানে কালিয়া তাকে জোর করে মাটিতে ফেলে দেয়। অমৃত যে কালিয়ার কাছে হেরে গেছে এই দেখে ছেলের দল আনন্দ করতে থাকে।

! ছেলের দলের এই আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কারণ প্রিয় বন্ধু।অমৃতর দুর্দশা দেখে ইসাব চুপ থাকতে পারেনি। সে কালিয়ার হাত ধরে বলে- ‘আয়, আমি তোর সঙ্গে লড়ব।' কালিয়া প্রথমে ইতস্তত করলেও পরে কুস্তি শুরু হয়ে যায়। সে কালিয়াকে ল্যাং মেরে মাটিতে ফেলে দেয়। কালিয়া কাঁদতে থাকে। মুহূর্তের মধ্যে ছেলের দলসহ ইসাব, অমৃতও সে স্থান ত্যাগ করে কালিয়ার মা-বাবার ভয়ে। এভাবেই ব্যাপারটি ঘোরালো হয়ে ওঠে।

প্রশ্ন >  'ইসাবের বাবা ছেঁড়া শার্ট দেখা মাত্র ওর চামড়া তুলে নেবে।-বিষয়টি স্পষ্ট করো। এই পরিণতি থেকে রক্ষা পেতে তারা কোন্প থ অবলম্বন করেছিল?


উত্তর > পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল' গল্পের দুই কেন্দ্রীয় চরিত্র অমৃত ও ইসাব দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। তাদের বাবাদের দারিদ্র্য এতটাই যে হোলি উপলক্ষ্যে ছেলেদের নতুন জামা তৈরির জন্যও মহাজনদের কাছে তাদের হাত পাততে হয়েছে। এমন পরিবারের ছেলেরা যদি নতুন জামা ছিঁড়ে ফেলে তবে সেটা যে ক্ষমাহীন অপরাধের মধ্যে পড়ে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নতুন জামা পরে অমৃত ও ইসাব দুই বন্ধু রাস্তায় বের হলে একদল দুষ্টু ছেলের মাথায় মতলব আসে তাদের শক্তি পরীক্ষার। তারা অমৃত ও ইসাবকে কুস্তি লড়ার প্রস্তাব দেয়। অমৃত এতে রাজি না-হওয়ায় তারা তাকে রাস্তায় ফেলে আনন্দ করতে থাকে। বন্ধুর হেনস্থা দেখে ইসাব প্রতিশোধ নিতে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। তার নতুন জামা ছিঁড়ে যায়। কষ্টের টাকায় কেনা জামা ছিঁড়ে ফেলায় ইসাবকে যে বাবার হাতে মার খেতে হবে সেই আশঙ্কার কথাই এখানে বলা হয়েছে।

॥ এই পরিণতি থেকে বাঁচতে বুদ্ধি করে দুই বাড়ির মাঝে এক নির্জন স্থানে অমৃত তার অক্ষত জামাটি ইসাবের গায়ে তুলে দেয় আর তার ছেঁড়া জামাটা নিজে পরে নেয়।

প্রশ্ন: 'হঠাৎ অমৃতের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল।—অমৃত কে? তার মাথায় হঠাৎ খেলে যাওয়া বুদ্ধি দুই বন্ধুকে কীভাবে বাঁচিয়েছিল?


অথবা, 'অমৃত ও ইসাবের পরস্পরের প্রতি ভালোবাসার গল্প শুনে তাঁদেরও বুক ভরে গেল।-এমন বলার কারণ আলোচনা করো।

উত্তর>  পান্নালাল প্যাটেলের 'অদল বদল' গল্পের অন্যতম প্রধান চরিত্র হল অমৃত।

॥ অমৃত ও ইসাব দুই অভিন্নহৃদয় বন্ধু। তারা একই স্কুলে একই ক্লাসে পড়ে। রাস্তার মোড়ে মুখোমুখি বাড়িতে থাকে। কিন্তু এসব বাইরের মিল ছাড়াও তাদের বন্ধুত্ব আর বিশ্বাসের শিকড় এতটাই গভীর ছিল, তারা একে অন্যের বিপদকে নিজের বলে মনে করেছে।

হোলির দিন বিকেলে তারা দুজনে দুটি একইরকম দেখতে নতুন জমা পড়ে বেরোয়। এই দৃশ্য দেখে পাড়ার একদল দুষ্টু ছেলে বদ ফন্দি আঁটে। উভয়ের জামা নষ্ট করার মতলবে কালিয়া নামে তাদের মধ্যে একজন অমৃতকে খোলা মাঠে ফেলে দেয়। বন্ধু অমৃতর এরূপ পরিস্থিতির প্রতিবাদে ইসাব কালিয়ার সঙ্গে মারপিটে জড়িয়ে পড়ে।

ধস্তাধস্তির ফলে ইসাবের জামাটি ছিঁড়ে যায়। ‘রণভূমি' ত্যাগ করার পর দুজনেই টের পায় নতুন জামা ছেঁড়ার অপরাধে আজ কপালে তাকে বাবার মারের হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবে না; কারণ  মাতৃহারা ইসাবের বাবা ছাড়া কেউ নেই। তাই বন্ধুকে মারের হাত থেকে রক্ষা করতে অমৃত তাকে নিজের অক্ষত জামাটি দিয়ে দেয়। ইসাব ইতস্তত করলেও নিরুপায় হয়ে রাজি হয়। বাড়ি ফেরার পরে অমৃতের মা জামা দেখে ভ্রু কুঁচকালেও; হোলির দিন বলে মাফ করে জামাটি রিফু করে দেন। এভাবেই উভয়ে বাঁচলেও ইসাবের বাবা সমস্ত ঘটনাটি দেখে ফেলেন। দুই বন্ধুর ভালোবাসা, নির্ভরতা ও ত্যাগের গল্প ক্রমে হাসানের মুখ থেকে পাড়াপড়শি মায়েরাও জেনে ফেলে। সকলেরই ছোট ছেলে দুটির কাণ্ড দেখে গর্বে, আনন্দে বুক ভরে ওঠে।


প্রশ্ন >  'ও আমাকে শিখিয়েছে, খাঁটি জিনিস কাকে বলে।-কে, কাকে শিখিয়েছে? ‘খাঁটি জিনিস' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?


উত্তর > পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল' গল্পে দশ বছরের বালক অমৃত তার অভিন্নহৃদয়ের বন্ধু ইসাবের পিতা পাঠানকে ‘খাঁটি জিনিস’ কাকে বলে তা শিখিয়েছে।

■ আলোচ্য গল্পে দুটি খাঁটি জিনিসের পরিচয় আমরা পাই; একটি হল মায়ের স্নেহ ও ভালোবাসা, যা ক্ষেত্রবিশেষে পিতার কাছে সর্বদা মেলে না। আর অন্যটি হল নিখাদ বন্ধুত্ব, যেটি অভিন্নহৃদয়ের দুই বন্ধু অমৃত ও ইসাবের মধ্যে দেখা গিয়েছিল। অমৃত ও ইসাবের বন্ধুত্বের শিকড় যে কত গভীর তা বোঝা যায় তখন, যখন অমৃত কালিয়ার হাতে মার খেয়ে পড়ে গেলে ইসাব ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে এবং অমৃতকে বাঁচাতে গিয়ে মারপিটে জড়িয়ে পড়ে। সে তার জামা ছিঁড়ে ফেলে। অমৃত ইসাবকে বাঁচাতে তার ভালো জামাটা ইসাবকে দিয়ে দেয়। ইসাব প্রশ্ন তোলে অমৃতকেও তো মার খেতে হতে পারে। অমৃত তখন জানায় তাকে রক্ষার জন্য তার মা আছেন কিন্তু ইসাবের তো মা নেই ৷ আড়াল থেকে শোনা অমৃতের কথাগুলি ইসাবের বাবাকে ভাবিয়ে তুলেছিল। তিনি বুঝেছিলেন মাতৃহারা সন্তানের পিতাকে শুধু পিতা নয় মা-ও হয়ে উঠতে হবে। এ ছাড়া দুই বন্ধুর বন্ধুত্বের গভীরতা ইসাবের বাবার মনের পরিবর্তন এনে দিয়েছে।

প্রশ্ন> আজ থেকে আমরা অমৃতকে অদল আর ইসাবকে বদল বলে ডাকব।'—বক্তা কে? তাঁর এই উক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।

অথবা, 'অমৃত-ইসাব অদল-বদল, অদল-বদল।—কীভাবে এই আওয়াজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল?

উত্তর > প্রশ্নোদ্ধত উক্তিটির বক্তা অমৃত এবং ইসাবের গ্রামের গ্রামপ্রধান।

পান্নালাল প্যাটেলের 'অদল বদল' গল্পে দুটি ছোট্ট ছেলের পারস্পরিক ভালোবাসা ও বন্ধুপ্রীতির ঘটনাটি মানবিক আবেদনের এক আশ্চর্য ব্যঞ্জনা ফুটিয়ে তুলেছে। অমৃত আর ইসাব শুধু দুজন বন্ধুমাত্র নয়, তারা পরস্পরের পরিপূরক। তাই ইসাব নতুন জামা পেলে অমৃতও তার বাবা-মাকে নতুন মা কিনে দিতে বাধ্য করে। আবার দুষ্টু কালিয়ার হাতে বন্ধু অমৃতকে অপদস্থ হতে দেখে ইসাব কালিয়াকে ল্যাং মেরে ফেলে দেয়। এই সময়েই ঘটনাচক্রে ইসাবের নতুন জামাটি ছিঁড়ে যায়। উভয়েই বিপদে পড়ে।

অমৃত উপলব্ধি করে বাড়িতে বাবার মারের হাত থেকে তাকে তার মা বাঁচালেও, মাতৃহীন ইসাবকে বাঁচানোর কেউ নেই। সে নিজের অক্ষত জামাটি ইসাবকে দিয়ে দেয়। ইসাবের বাবা এসময়ে উপস্থিত থাকায়, পারস্পরিক ভালোবাসার এমন আশ্চর্য কাহিনি তার মুখ থেকে সকলে জেনে যায়। শেষে গ্রামপ্রধানও ঘটনাটি শুনে অমৃত ও ইসাবের নামকরণ করেন অদল আর বদল।

ছোট্ট দুটি ছেলের বন্ধুত্ব আর বিশ্বাসের শিকড় এতটাই গভীর ছিল যে তারা একে অন্যের বিপদকে নিজের বলে মনে করেছে। সেখানে ধর্ম বা সম্প্রদায়ের বিভাজন তাদের মানবিকতার কাছে বারবার তুচ্ছ হয়ে গেছে। তাই গ্রাম ছাড়িয়েও অমৃত-ইসাব অদল-বদল আওয়াজে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে।



প্রশ্ন: অমৃতর মায়ের চরিত্রটি আলোচনা করো।

উত্তর>  সাহিত্যের রসবিচারে চরিত্র একটি বড়ো ভূমিকা পালন করে।

কাহিনি যেমন চরিত্রকে অবলম্বন করে ক্রম অগ্রসরমান হয়, তেমনি চরিত্রও কাহিনিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আলোচ্য পান্নালাল প্যাটেল বিরচিত 'অদল বদল' গল্পের একটি নারীচরিত্র হল অমৃতর মা ‘বাহালি বৌদি। তাঁর চরিত্রের বিশেষ কয়েকটি দিক হল-

বিবেচক : অমৃতর মায়ের বিবেচনা বোধ ছিল প্রবল। একদিকে দরিদ্র পরিবারের টানাটানি, অন্যদিকে অমৃত-সহ চার সন্তানের অভাব-অভিযোগ- আবদার সামলানোর অভ্যাস দুই-ই তাঁর রয়েছে।


আদর ও শাসনের সামঞ্জস্য রক্ষাকারী : অমৃত নতুন জামার জন্য গোঁ ধরায় প্রথমে তিনি তাকে বুঝিয়েসুঝিয়ে নিরস্ত করতে চান। এমনকি ভর্ৎসনা

ও প্রহারের ভয়ও দেখান। এতেও কাজ না-হলে তিনি অমৃতকে কায়দা করে বাবার কাছে পাঠাতে চান। তিনি জানতেন, যে-আবদার অমৃত তাঁর কাছে করছে, তা সে তার বাবার কাছে করতে পারবে না। এতেও সফল না হলে অমৃত নানাভাবে তাঁদের মানসিক উৎপীড়ন করতে থাকলে, আবার তিনিই অমৃতর বাবাকে জামার জন্য রাজি করান।

নির্ভরযোগ্য : অমৃতর মায়ের দায়িত্ববোধ, আদর ও শাসনের সমতা পুত্র অমৃতকেও তাঁর ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। অমৃত জানত, মা যতই শাসন করুক-না-কেন, দিনের শেষে মা-ই তার একমাত্র আশ্রয়।

পরিশেষে বলা যায় এই মাতৃমূর্তি চিরন্তনী। তাঁর কোনো নাম প্রয়োজন ছিল না, যদিও ইসাবের বাবাকে শোনা যায় তাঁকে ‘বাহালি বৌদি' বলে ডাকতে। মোটের ওপর ভালোবাসা ও মমতা দিয়ে গড়া এক স্বয়ংসম্পূর্ণ মা হয়ে উঠেছে অমৃতর মায়ের চরিত্রটি।


প্রশ্ন:  ‘অদল বদল' গল্প অবলম্বনে ইসাব চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তর >  পান্নালাল প্যাটেলের 'অদল বদল' গল্পে অমৃতর মতোই একটি উল্লেখযোগ্য চরিত্র হল মাতৃহারা ইসাব। সমালোচক বলেছেন- 'Character is the Soul of Drama'। ছোটোগল্প যদিও নাটকয়নয়, তবু চরিত্রনির্মাণের ক্ষেত্রে ইসাব চরিত্রটি 'অদল বদল' গল্পের 'Soul' হয়ে উঠেছে। ইসাব চরিত্রের কয়েকটি দিক হল-

বন্ধুবৎসল : ইসাব তার বন্ধু অমৃতকে খুব ভালোবাসে। সেকারণে কুস্তি লড়তে না-চাওয়া অমৃতকে কালিয়া জোর করে কুস্তি লড়তে বাধ্য করলেয়ইসাবের মেজাজ চড়ে যায়। তাই সে কালিয়ার সঙ্গে কুস্তি লড়ে বন্ধুর অপমানের প্রতিশোধ নেয়।

ভীরু প্রকৃতি : কালিয়ার সঙ্গে ইসাব সাহসিকতার পরিচয় দিলেও অন্যান্য আর পাঁচটা ছেলের মতো সে ভীরু প্রকৃতির ছিল। তার যেমন ভয় ছিল জামা ছিঁড়ে যাওয়ার, তেমনি কালিয়া মাটিতে পড়ে কাঁদতে শুরু করলে কালিয়ার বাবা-মা তাকে মারতে পারে, এই ভেবে সে রণভূমি থেকে পালিয়েছিল।

অসহায়তা : ইসাব মাতৃহারা। তাকে তার বাবার সঙ্গে খেতে কাজ করতে হয়। মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত ইসাব বাবার প্রহারের কাছে সত্যিই বড়ো অসহায়।

> নিঃস্বার্থপর : ইসাবকে তার বাবার প্রচন্ড প্রহার থেকে বাঁচাতে অমৃত তাকে নতুন জামা পরিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু প্রথমে সে জামা পরতে চায়নি, কারণ এতে অমৃতরও বাড়িতে মার খাওয়ার সম্ভাবনা ছিল। সেক্ষেত্রে অমৃতই বরং তাকে বুঝিয়েছিল—‘কিন্তু আমাকে বাঁচানোর জন্য তো আমার মা আছে।'

মানসিক উদারতা : ইসাব মুসলমান আর অমৃত হিন্দু সম্প্রদায়ের ছেলে হলেও কোনো ধর্মীয় বাধা তাদের বন্ধুত্বকে ম্লান করতে পারেনি। মানসিক উদারতার ইসাব সর্বদা অমৃতর পাশেই থেকেছে, তাকে ভালোবেসেছে, বেদনায় কষ্ট পেয়েছে।

এইভাবে মাতৃহারা ইসাব চরিত্রটি গল্পকারের লেখনীতে সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।

প্রশ্ন:  ইসাবের বাবার চরিত্রটি আলোচনা করো

উত্তর পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল' গল্পে ইসাবের বাবা হাসান পাঠান একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্শ্বচরিত্রের ভূমিকা পালন করেছেন।

- স্নেহশীল : ইসাবের বাবা একজন দরিদ্র চাষি। কারণে-অকারণে মহাজনের কাছে হাত পাততে হয় তাঁকে। অভাব তাঁর নিত্যসঙ্গী হলেও হোলি উৎসব

উপলক্ষ্যে পুত্র ইসাবকে নতুন জামা তৈরি করে দেওয়ার মধ্যে, এক স্নেহশীল পিতা হিসেবেই তাঁকে দেখা যায়। বিপত্নীক হাসান নিজেকে সর্বদা ঠিক রাখতে না-পেরে মাঝে মাঝে ছেলেকে শাসন করেছেন, তবে তা অন্তর থেকে নয়। অভাবের সংসারে তিনি ছেলেকে খেতে কাজ করাতেও বাধ্য হয়েছেন।

সংবেদনশীল : ইসাবের বাবা ছোট্ট অমৃতর কথা ‘...কিন্তু আমাকে বাঁচানোর জন্য তো আমার মা আছে, শোনার পর উপলব্ধি করেন যে, মা-হারা ছেলের বাবাকে মা-বাবার দ্বৈত ভূমিকা পালন করতে হয়। এর থেকে ইসাবের বাবার সংবেদনশীল মনের পরিচয় পাওয়া যায়।

আবেগপ্রবণ ও শিশুসুলভ : ইসাবের বাবা আবেগে আপ্লুত হয়ে অমৃতর মায়ের কাছ থেকে অমৃতকেই চেয়ে বসেন। তাঁর মন এতটাই পুলকিত হয়েছিল যে, অমৃতর কথা তিনি সকলকে বলতে থাকেন। এক্ষেত্রে তাঁর মধ্যে একটা শিশুসুলভ আবেগ লক্ষ করা যায়।

> উদার পিতৃহৃদয় ও অসাম্প্রদায়িক মন : ইসাবের বাবা আসলে একাধারে যেমন উদার পিতৃহৃদয়ের অধিকারী তেমনই তাঁর মধ্যে রয়েছে একটি অসাম্প্রদায়িক মন। তাই ছোট্ট দুটি ছেলের মধ্যে জামা অদলবদলের ঘটনা দেখে তিনি অতিসহজেই অমৃতর হৃদয়ের মাতৃভক্তি, বন্ধুপ্রীতি ও অকৃত্রিম ভালোবাসার মতো 'খাঁটি জিনিস'-টিকে চিনে নিয়েছেন। তাঁর প্রশংসার ফলেই অদলবদলের ঘটনা গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়েছে। তিনি নিজেও স্বার্থহীন ও অসাম্প্রদায়িক, তাই ছোট্ট অমৃতর কাছ থেকে ভালোবাসা ও উদারতার শিক্ষা নিয়ে নিজেকে বদলে ফেলে তিনি নিজেও একটি মহৎ চরিত্র হয়ে উঠেছেন।


প্রশ্ন: ‘অদল বদল' গল্পের নামকরণ কতখানি সার্থক হয়েছে, তা আলোচনা করো।


উত্তর >  উত্তর >  অদলবদল গল্পের নামকরণের সার্থকতা পান্নালাল প্যাটেল রচিত 'অদল বদল' গল্পের মূল উপজীব্য বিষয়টি অমৃত ও ইসাব নামক দুই বন্ধুর জামা অদলবদলের ঘটনা। কিন্তু আপাত নিরীক এই ঘটনাটিই কাহিনির গতি নির্ধারণ করে, এমনকি গল্পের চরিত্রগুলির অবস্থান বদলে, তাদের রূপান্তর ঘটায়। গল্পে দেখা যায়, অমৃতর হেনস্থা দেখে ক্রুদ্ধ ইসাব, তাকে বাঁচাতে যায়। ঘটনাচক্রে ইসাবের নতুন জামা ছিঁড়ে যায়। ভীত ইসাবকে নিজের জামা দিয়ে অমৃত রক্ষা করতে চায়। অমৃত যদি ইসাবের সঙ্গে তার এই জামা বদল না-করত, তবে অমৃতর চিন্তাভাবনার উদারতা ও উচ্চতা, ইসাবের বাবা ও পাড়াপড়শিদের কাছে অজানাই থেকে যেত। এমনকি এই ঘটনার সূত্রেই মাতৃহীন সন্তানের প্রতি যথাযথ দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও ইসাবের বাবা হৃদয়ে অনুভব করেন। সুতরাং, অতিসাধারণ একটি ছোটোগল্প, নাটকীয় মোড় নেয় এই অদলবদলের ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে। তাই এই জামাবদলের ঘটনাটিকে গল্পের ক্লাইম্যাক্সও বলা যেতে পারে। আবার গল্পের শেষ অংশে এসে দেখা যায়, ঘটনাটি গ্রামপ্রধানের কানে যাওয়ায় তিনি স্বয়ং ছেলে দুটির নামকরণ করেছেন ‘অদল' ও 'বদল'। জামার অদলবদলটুকু শুধু গল্পের কেন্দ্রীয় ঘটনামাত্র নয়, সমগ্র কাহিনির সার্থক নামকরণ শেষে ইসাবের বাবার সঙ্গে সঙ্গে গোটা গ্রামের মানসিক রূপান্তরের এক প্রচ্ছন্ন প্রতীকী মোটিফ হিসেবে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাই গল্পটির ‘অদল বদল' নামকরণ সার্থক ও গভীরভাব ব্যঞ্জনাবাহী।



প্রশ্ন:; 'অদল বদল' গল্পের মাধ্যমে চিরন্তন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দেওয়া হয়েছে—আলোচনা করো।

উত্তর > "ধর্ম কারার প্রাচীরে বজ্র হানো, এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো। ভারতবর্ষ ধর্মবর্ণনির্বিশেষে সকল ভারতবাসীর। কিন্তু বিভেদকামী সাম্প্রদায়িক শক্তি বারবার ভারতবর্ষের পবিত্র ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তিকে পঙ্কিল করেছে। তবুও মানুষের উদার অসাম্প্রদায়িক মানসিকতা আজও প্রজ্বলিত রেখেছে মানবতার প্রদীপকে। পান্নালাল প্যাটেল রচিত ‘অদল বদল’ গল্পের অমৃত ও ইসাব হল সেই প্রদীপের শিখা। ভিন্ন ধর্মের সেই কিশোরদের পারস্পরিক বন্ধুত্বের মাধ্যমে গল্পকার স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন ভারতবর্ষের পরধর্ম সহিষ্কৃতার সুমহান ঐতিহ্যকে।

পান্নালাল প্যাটেলের ‘অদল বদল' গল্পটি গড়ে উঠেছে অমৃত আর ইসাবের বন্ধুত্বকে কেন্দ্র করে। অমৃত ও ইসাব দুই বন্ধু। তারা একই স্কুলে একই শ্রেণিতে পড়ে। মুখোমুখি বাড়িতে থাকে। দুজনই অভাবী চাষির বাড়ির ছেলে। ইসাবের বাবা ছেলের জামা ছিঁড়ে যাওয়ায় সুদখোরের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে অনেক বাছাবাছি করে ইসাবকে একটি জামা তৈরি করে দেন। সেই দেখে অমৃতও জেদ ধরে তারও নতুন জামা চাই। সে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে ঠিক একইরকম একটি জামা আদায় করে। দুই বন্ধু হোলির দিন বিকেলে নতুন জামা গায়ে দিয়ে বেরোয়। কিন্তু দুষ্টু ছেলেদের একটি দল পিছনে লাগে। কালিয়া বলে একটি ছেলে অমৃতকে ধরে মাঠের মধ্যে ছুড়ে ফেলে দেয়। এর প্রতিবাদে ইসাব তাকে ল্যাং মারে। তবে ধস্তাধস্তিতে ইসাবের নতুন জামাটি ছিঁড়ে যায়। দুজনেই জামা ছেঁড়ার কারণে বাড়ি ফিরতে ভয় পায়। তখন অমৃত নিজের অক্ষত জামাটি ইসাবকে দিয়ে সে তার ছেঁড়া জামাটি পরে। কারণ অমৃতকে বাবার হাতের মার থেকে মা বাঁচালেও মাতৃহীন ইসাবকে বাঁচানোর কেউ ছিল না। ছোট্ট ছেলে দুটির এই কাণ্ড ইসাবের বাবা হাসান দেখে ফেলেন। ভালোবাসা আর বন্ধুত্বের এমন আশ্চর্য নিদর্শন দেখে তিনি অবাক হন। ক্রমে হাসানের মুখ থেকে পাড়া-প্রতিবেশী হয়ে এ ঘটনার কথা গোটা গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। মুখ্য গ্রামপ্রধান দুজনের নাম দেন অদল বদল। বিশ্বাস-স্বার্থ-শূন্যতা ও ভালোবাসা যে ধর্মসম্প্রদায়ের সংকীর্ণ ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে, এই গল্পে তাই প্রমাণ করে। গল্পকার অমৃত ও ইসাবের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং নির্ভরতার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেন মানুষের মানবিকতার সম্বন্ধ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের অনেক ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত। এ যেন নজরুলের সেই বাণী

" গাহি সাম্যের গান—

যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।