হংসরূপী রাজপুত্র শিবনাথ শাস্ত্রী। রূপকথার গল্প
![]() |
হংসরূপী রাজপুত্র
শিবনাথ শাস্ত্রী
এক রাজার এগারটি পুত্র ও একটি কন্যা ছিল। এই কয়টি পুত্র ও কন্যা রাখিয়া রাণী পরলোকে গমন করিলেন। বড় রাণীর মৃত্যুর পর রাজা আবার আর একটি স্ত্রীলোককে বিবাহ করিয়া ঘরে আনিলেন। ঐ স্ত্রীলোক দেখিতে অতি সুন্দরী ছিল বটে, কিন্তু তাহার স্বভাব অতিশয় হিংস্র। সে কাহারও ভাল দেখিতে পারিত না। তাহার উপরে আবার সে একটা বিদ্যা জানিত, –মনে করিলে মানুষকে বদলাইয়া ফেলিতে পারিত।
ছোট রাণী রাজভবনে ঘরকন্না করিতে আসিয়া দেখিল, রাজা আগেকার পুত্র কন্যাদিগকে বড় ভালবাসেন। ইহা তাহার প্রাণে সহিল না। সে সর্ব্বদাই ভাবিতে লাগিল, কিসে তাহাদের অনিষ্ট করিবে। অবশেষে একটা ছল করিয়া মেয়েটিকে রাজধানী হইতে অনেকদূরে পাড়াগাঁয়ে এক চাষার বাড়িতে পাঠাইয়া দিল। মেয়েটিকে বিদায় করিয়া ছেলেদের নামে রোজ রোজ নানা কথা রাজার কানে লাগাইতে লাগিল। ক্রমে রাজা পুত্রদের উপরে চটিয়া গেলেন। আর বড় একটা তাহাদের খোঁজ খবর রাখেন না, তাহারা কি খায়, কেমন থাকে, কোথায় শোয়, তাহা বড় একটা দেখেন না, তাহারা নিকটে আসিলে ভাল করিয়া কথা কহেন না। ইহাতে রাজকুমারেরা সর্ব্বদাই কষ্ট অনুভব করিতে লাগিলেন। এইরূপে সন্তানদের প্রতি রাজার মন যখন চটিয়া গেল, তখন ছোট রাণী ভাবিল, এইবার ইহাদিগকে দূর করিয়া দিবার সময় আসিয়াছে। এই ভাবিয়া তাহার সেই বিদ্যার বলে এগারটি রাজপুত্রকে রাজহংস করিয়া ফেলিল এবং বলিল, – “তোমরা দুর হও, যে দেশে ইচ্ছা সেই দেশে গিয়া চরিয়া খুঁটিয়া খাও।”
হংসরূপী রাজপুত্রেরা গৃহ হইতে তাড়িত হইয়া যেন অকুল সমুদ্রে ভাসিল। কিন্তু উপায় কি? অবশেষে তাহারা সেই রাত্রেই পিতার রাজধানী ছাড়িয়া ডাকিতে ডাকিতে এক জঙ্গলের দিকে চলিল। আকাশে কত নক্ষত্র ফুটিয়া রহিয়াছে, বৃক্ষলতা নীরবে দাঁড়াইয়া আছে, অন্যান্য পাখীরা আপন আপন কুলায়ে ঘুমাইতেছে, সকল দিকেই কেমন শান্ত ভাব, কেবল সেই এগারটি ভ্রাতা দুঃখে ভাসিতেছে, যে দিকে চক্ষু যায়, সেই দিকে যাইতেছে।
যাইতে যাইতে বনের পারে, কৃষকের বাড়ি দেখিতে পাইল, সেখানে তাহাদের ভগিনী রহিয়াছে। তখনও সম্পূর্ণ প্রাতঃকাল হয় নাই। তাহার কৃষকের কুটিরের দ্বারে কত ডাকিল, কত ছটপট করিল, তাহারা মনে করিয়াছিল ভগিনী ডাক শুনিতে পাইয়া একবার বাহিরে আসিবে, তাহারা তাহার মুখখানি একবার দেখিয়া যাইবে। কিন্তু কিছুতেই রাজকুমারীর ঘুম ভাঙ্গিল না। শেষে তাহারা মনের দুঃখে ডাকিতে ডাকিতে দেশ দেশান্তরে চলিয়া গেল।
এদিকে ছোট রাণী রাজাকে বলিল, কুমারেরা রাগ করিয়া দেশান্তরে চলিয়া গিয়াছে। রাজা শুনিয়া পুত্রদের প্রতি বিরক্ত হইলেন, ভাবিলেন আপদ গিয়াছে। ইহার পর কত বৎসর চলিয়া গেল। রাজা মেয়েটির কথা এক একবার বলেন, আর ছোট রাণী একটা না একটা ছল করিয়া কাটাইয়া দেয়। অবশেষে রাজকুমারীর বয়স যখন পনের বৎসর, তখন রাজা তাহাকে আনিবার জন্য লোক পাঠাইলেন। তখন রাজকুমারী যেন রূপে ফাটিয়া পড়িতেছেন। এমন রূপ লাবণ্য প্রায় মানুষের দেখা যায় না। দেখিয়া ছোটরাণী ভাবিল, -- "সর্বনাশ। রাজা যদি ইহাকে দেখেন, তবে ত আর আমার সন্তানদের প্রতি ফিরেও চাহিবেন না। অতএব যেমন করিয়াই হউক ইহাকে কদাকার করিয়া ফেলিতে হইতেছে। এই ভাবিয়া স্নানের ঘরে গিয়া, স্নান করিবার গামলায় তিনটা কোলাব্যাঙ ছাড়িয়া দিয়া আসিল। সে ব্যাঙগুলিকে এমন মন্ত্র পড়িয়া দিয়া আসিল যে, রাজকুমারী স্নান করিতে গেলেই তাহারা তাহার গায়ে উঠিবে, একটি তাঁহার মস্তকের উপরে বসিবে, তাহাতে রাজকুমারীরা বুদ্ধিশুদ্ধি লোপ পাইবে, একটি কপালের উপর বসিবে তাহাতে মুখ কদাকার হইয়া যাইবে, আর একটি বক্ষস্থলে বসিবে, তাহাতে তাঁহার মন নীচতাতে পূর্ণ হইবে। কিন্তু রাজকুমারীর মন এমনি পবিত্র ছিল যে, ছোট রাণীর ব্যাঙ তাঁহার গায়ে উঠিয়াও কিছু করিতে পারিল না। তাঁহার পবিত্রতার গুণে তিনিটি ব্যাঙ তিনটি সুন্দর জবাফুল হইয়া তাহার অঙ্গে শোভা পাইতে লাগিল। তখন ছোট রাণী নিজের হাতে এক প্রকার তেল মাখাইয়া রাজকুমারীর মুখ এমনি কাল করিয়া দিল যে, রাজা তাঁহাকে যখন দেখিলেন, তখন আর চিনিতে পারিলেন না। বলিলেন— “এ কি আমার মেয়ে? ত আমার মেয়ে নয়।” ছোট রাণী বলিল, – “তাই ত এ কাদের মেয়ে? দূর হ, দূর হ।” এই বলিয়া রাজকুমারীকে দূর দূর করিয়া তাড়াইয়া দিল।
রাজকুমারী পিতার গৃহ হইতে তাড়িত হইয়া বনে বনে ঘুরিয়া বেড়াইতে।লাগিলেন। ক্ষুধায় তৃষ্ণায়, অনাহারে শরীর দূর্ব্বল হইয়া পড়িল। বাঘ ভালুকের চীৎকারে রাত্রে ঝোপের মধ্যে লুকাইয়া থাকেন, দিনের বেলা ভাইদের অম্বেষণে বনে বনে ঘুরিয়া বেড়ান, ক্ষুধায় বনের ফল খান ও তৃষ্ণা হইলে নির্ঝরের জল পান করেন। যাহাকে দেখেন, তাহাকে জিজ্ঞাসা করেন, “এগার জন রাজপুত্রের কথা কিছু বলিতে পার?” কেহই কিছু বলিতে পারে না। একদিন একজন বৃদ্ধা স্ত্রীলোক এক ধামা ফল মাথায় করিয়া যাইতেছিল, তাহাকে জিজ্ঞাসা করাতে সে বলিল, “এগারটি রাজপুত্রের কথা কিছু জানি না, কিন্তু ঐ নদীতে এগারটি রাজহাঁস চরিতেছে দেখিয়া আসিয়াছি, তাদের মাথায় সোনার মুকুট।” শুনিয়া রাজকুমারী সেই নদীর দিকে ছুটিলেন। কিন্তু এগারটি রাজহংস দেখিতে পাইলেন না। সেই নদীর কূল দিয়া চলিতে চলিতে ক্রমে সমুদ্রের নিকট গিয়া উপস্থিত হইলেন।
দেখিলেন সম্মুখে অকূল সমুদ্র, কেবল জলরাশি ধূ ধূ করিতেছে, সাগরের তরঙ্গ আসিয়া আঘাত করিতেছে, তাহাতে তুলার রাশির ন্যায় ফেনা ফুটিতেছে। সন্ধ্যা আগত প্রায়, সূর্য সাগর জলে ডুবিতেছে, তাহার কিরণরাশি আকাশে যেন সিন্দুর ছড়াইয়া দিয়াছে। সেই নির্জ্জন বনের ধারে, সাগরের কূলে বসিয়া রাজকুমারী ভাবিতে লাগিলেন, -- "এ প্রাণ রাখিয়া আর কাজ কি? ভাইদের উদ্দেশ ত পাইলাম না। আর কোথায় বা অম্বেষণ করিব? এমন করিয়াই বা আর কতদিন বাঁচিব। দুর হোক এই দুঃখ, সাগর জলে প্রাণ-ত্যাগ করি।” আবার ভাবিলেন, – “জগদীশ্বর কি এমনি করিবেন।
তাহার প্রতি ত আমার প্রবল বিশ্বাস। তিনি আমার ভাইগুলিকে মিলাইয়া দিবেন না? দেখি, আরও কয়েকদিন অন্বেষণ করিয়া দেখি। এইরূপ ভাবিতেছেন, এমন সময়ে দেখিতে পাইলেন, এগারটি রাজহংস ডাকিতে ডাকিতে সাগর পার হইয়া সেই দিকে আসিতেছে। তেমন প্রকান্ড ও সুন্দর রাজহংস তিনি কখনও দেখেন নাই। তাহাদের মস্তকে সোনার মুকুট।
ইহাদগিকে দেখিয়া রাজকুমারী সাগরের কূল হইতে উঠিয়া একটা ঝোপের মধ্যে গিয়া লুকাইলেন। এগারটি রাজহংস উঠিয়া আসিয়া সেই ঝোপের নিকটেই বসিল। দেখিতে দেখিতে সূর্য সাগর জলে অদর্শন হইয়া গেল।
কি আশ্চর্য, সূর্য যেই অস্ত গেল অমনি রাজহংসগুলির শরীরের পালক খসিয়া গেল ও তাহারা এগারটি রাজপুত্রের আকার ধারণ করিল। রাজকুমারী দেখিবামাত্র ভ্রাতাদিগকে চিনিতে পারিলেন। অমনি আনন্দধ্বনি করিয়া ভ্রাতাদিগের নাম ধরিয়া ডাকিয়া তাহাদের মধ্যে গিয়া পড়িলেন। ভ্রাতারা অনেক দিনের পর ভগিনীকে পাইয়া, সকলে পড়িয়া তাহাকে বক্ষঃস্থলে চাপিয়া ধরিলেন ও আনন্দে কাঁদিতে লাগিলেন। পরে জানা গেল, তাহাদের রাজহংস হইতে হয়, এবং সেই সাগরের অপর পারে যে দেশ আছে, তাহাতেই তাঁহাদিগকে থাকিতে হয়। বৎসরের মধ্যে কেবল দুই তিন দিনের জন্য এ পারে আসিতে পান।
পরদিন প্রাতঃকালে দশটি ভাই আবার রাজহংস হইয়া পরপারে চলিয়া গেল, কিন্তু কনিষ্ঠ ভ্রাতা রাজহংস হইয়াও ভগিনীর নিকট রহিল। ভগিনী সমস্ত দিন তাহার পাখাতে হাত বুলাইয়া, বাহু দ্বারা তাহার গলা আলিঙ্গন করিয়া, তাহাকে বক্ষঃস্থলে চাপিয়া ও শামুক খাওয়াইয়া কাটাইলেন। দিবা শেষে হংসরূপা রাজপুত্রেরা আবার আসিয়া উপস্থিত হইল। সেই রাত্রি তাহাদের এ পারের শেষ রাত্রি। সে রাত্রি প্রভাত হইলেই, তাহাদিগকে আবার এক বৎসরের জন্য পরপারে যাইতে হইবে। সে দিন তাহাদের অপার ভাবনা উপস্থিত, তাহারা ভগিনীকে একেলা ফেলিয়া কিরূপে যায়।
অবশেষে সকলে পরামর্শ করিল যে, বেতের জাল বুনিয়া তাহাতে ভগিনীকেলইয়া, এগার জনে বহিয়া পরপারে লইয়া যাইবে। সমুদ্র মধ্যে একটি পাহাড় আছে, ক্লান্ত হইলে তাহাতে বিশ্রাম করিবে। তদনুসারে সেই দিন সমস্ত রাত্রি জাগিয়া এগার ভাই-এ মিলিয়া বনের বেত সংগ্রহ করিয়া জাল 'বুনিতে লাগিল। রাত্রি দ্বিপ্রহর অতীত হইতে না হইতে গাছের গায়ে সেই জাল বাঁধিয়া ভগিনীকে তাহাতে শয়ন করিয়া থাকিতে বলিল। রাজকুমারী তাহাতে অকাতরে ঘুমাইয়া পড়িলেন।
প্রভাতের সূর্য পূর্বদিকে প্রকাশ হইতে না হইতে এগার ভ্রাতায় সেই জাল ঠোঁটে করিয়া আকাশে উড়িল। নিম্নে অকুল সমুদ্রের নীল জলরাশি, উপরে অনন্ত সুনীল আকাশ, ওদিকে পূর্বাকাশ লোহিত বর্ণে রঞ্জিত করিয়া সূর্য উদয় হইতেছে। এদিকে বেতের জালে শয়ন করিয়া রাজকুমারী ঘুমাইতেছেন। ক্রমে হংসগণ সুনীল আকাশে ছোট ছোট শ্বেতরেখার ন্যায় দেখাইতে লাগিল। তাহারা কত পথ পার হইয়া গেল কে জানে, অনন্ত আকাশে পথনির্ণয় করিবার উপায় নাই। ক্রমে পূর্বদিকে সূর্য মস্তকের উপর উঠিল, এবং মস্তকের সূর্য পশ্চিমে চলিয়া পড়িল। হংসগণ চলিয়াছে—চলিয়াছে, বিরাম নাই। আজ তাহাদের আনন্দের সীমা নাই, ভগিনীকে বহিয়া লইয়া যাইতেছে। দশজনে মুখে করিয়া জাল ধরিয়া চলিয়াছে, আর সর্বকনিষ্ঠ ভ্রাতা আপনার বিস্তৃত পক্ষদ্বয় বিস্তার করিয়া ভগিনীর মুখের উপরে ছাতা ধরিয়া চলিয়াছে। রাজকুমারী জালে শয়ন করিয়া একান্তচিত্তে কিরূপে ভ্রাতাদিগকে শাপমুক্ত করিবে, তাহাই ভাবিতেছেন।
বেলা অবসান প্রায় অথচ সেই সমুদ্র-মধ্যবর্ত্তী পর্বতটি তখনও দেখা যায় না। হংসরূপী রাজপুত্রদের মনে বড়ই ভয় হইল। সূর্যাস্ত হইলেই তাহারা মানুষ মানুষ হইয়া যাইবে, ও সমুদ্র জলে পতিত হইয়া সকলে ডুবিয়া মরিবে। আজ ভগিনীর ভার বহিতে হইতেছে বলিয়া, তাহারা অন্যান্য দিনের ন্যায় দ্রুত যাইতে পারিতেছে না। ভগিনীরও মন ভয়ের সঞ্চার হইয়াছে। হায়! হায়! আমার জন্য বুঝি ভ্রাতাদের প্রাণ যায়। ও দিকে দেখিতে দেখিতে আকাশে মেঘের সঞ্চার হইল। কৃষ্ণবর্ণ মেঘ নীল পরদার ন্যায় পশ্চিম গগন ছাইয়া ফেলিল, চিকিমিকি বিজলী খেলাইতে লাগিল, মেঘের আকার দেখিয়া বোধ হইতে লাগিল যে, অবিলম্বে শিলাবৃষ্টি হইবে।
হংসগণ মেঘ দেখিয়া প্রাণের দায়ে যথাসাধ্য দ্রুতবেগে উড়িতে আরম্ভ করিল। অবশেষে সন্ধ্যাকালে তাহারা সমুদ্র মধ্যস্থিত সেই পাহাড়ের উপরে নামিল। সে পাহাড়ের শৃঙ্গে এতই অল্প স্থান যে, কোন প্রকারে বার জনে হাত ধরাধরি করিয়া দাঁড়াইয়া থাকা যায়। সেইভাবে দাঁড়াইয়া সমস্ত রাত্রি তাহারা ঈশ্বরের গুণগান করিয়া ও তাঁহার চরণে প্রার্থনা করিয়া কাটাইল।
পরদিন প্রাতে তাহারা আবার ভগিনীর জাল ঠোঁটে করিয়া লইয়া আকাশে উড়িল, এবং সেই দিন দিবা শেষে অপরপারে এক পাহাড়ের উপরে গিয়া নামিল। সেই পাহাড়ে একটি গুহা ছিল। রাজপুত্রগণ ভগিনীকে সেই গুহাটি দেখাইয়া দিয়া বলিল—তুমি এই গুহাতে বাস করিবে। রাজকুমারী সেই গুহাতে রাত্রি যাপন করিতে গিয়া ঈশ্বর-চরণে পড়িয়া কাঁদিতে লাগিলেন- “হে ঈশ্বর! আমার ভ্রাতাদিগকে এই যাদু হইতে উদ্ধার করিবার উপায় বলিয়া দাও।” অনেকক্ষণ পড়িয়া কাঁদিতে কাঁদিতে নিদ্রা আসিল। নিদ্রাতে স্বপ্নে দেখিলেন যে, একজন দিব্যমূর্তিধারিণী স্ত্রীলোক তাহার নিকটে দাঁড়াইয়া বলিতেছেন—“তোমার ভ্রাতাদিগকে যাদু মুক্ত করিবার উপায় বলিয়া দিতেছি । এই যে বিচুটি দেখিতেছ, এই বিচুটি প্রায় শ্মশানে জন্মিয়া থাকে। শ্মশান হইতে বিছুটি গাছ তুলিয়া হাত ও পা দিয়া তাহা পিষিতে হইবে,পিষলে তাহা হইতে এক প্রকার সুতা বাহির হইবে, সেই সুতা দিয়া তোমার ভ্রাতাদের জন্য জামা প্রস্তুত করিবে। সেই জামা প্রস্তুত হইলে, তাহাদের শরীরে তাহা ফেলিয়া দিলে, তাহারা তৎক্ষণাৎ মানুষ হইয়া যাইবে, আর রাজহংস থাকিবে না। কিন্তু সাবধান, যতদিন জামা বোনা কাৰ্য্যে নিযুক্ত থাকিবে, ততদিন একটি কথা কহিতে পারিবে না। যদি একটিও কথা কও তাহা হইলে তোমার ভ্রাতাদিগের প্রাণ যাইবে।” এই বলিয়া তিনি রাজকুমারীর হাতে যেন কয়েকটা বিচুটিগাছ দিলেন। সেই বিচুটির জ্বালাতে তাঁহার ঘুম ভাঙিয়া গেল। নিদ্রাভঙ্গে দেখেন, বাস্তবিক তাঁহার নিকটে কতকগুলি বিচুটি গাছ পড়িয়া রহিয়াছে। তখন তিনি ঈশ্বরকে অগণ্য ধন্যবাদ করিয়া, তাহা কুড়াইয়া লইয়া হস্ত ও পদের দ্বারা পিষিয়া সূতা বাহির করিলেন। কিন্তু সে বিচুটি এমন যে তাঁহার হাতে ও পারে বড় বড় ফোসকা পড়িল। তিনি তথাপি ছাড়িলেন না। সমস্ত দিন জামা বুনিতে লাগিলেন। সন্ধ্যাকালে ভ্রাতারা আবার আসিয়া উপস্থিত। দেখিল, ভগিনীর মুখে কথা নাই, কে তাহাকে বোবা করিয়া দিয়াছে। প্রথমে তাহাদের মনে বড় ভয় হইয়াছিল, কিন্তু রাজকুমারী ইঙ্গিত ইশারাতে তাহাদিগকে নিজের প্রতিজ্ঞার কথা বুঝাইয়া দিলেন, তখন তাহারা নিশ্চিন্ত হইল। পরদিন ভ্রাতারা চলিয়া গেলে রাজকুমারী একলা বসিয়া জামা বুনিতেছেন, এমন সময় শিকারীদের বংশীর ধ্বনি ও কুকুরের ডাক শুনিতে পাইলেন।
শুনিয়া প্রাণ চমকিয়া উঠিল। দেখিতে দেখিতে শিকারীগণ সেই গুহার সমীপে আসিয়া উপস্থিত। সেই শিকারী দলের নেতা সেই দেশের রাজা।
তিনি আসিয়া রাজকুমারীর সমক্ষে দাঁড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, আপনি কে? এই নির্জন গিরিগুহাতে কেমন করিয়া আসিলেন?” রাজকুমারী নিরুত্তর। রাজা বলিলেন—“চলুন আপনাকে আমার রাজধানীতে লইয়া
যাই, এই স্থান স্ত্রীলোকের থাকিবার উপযুক্ত স্থান নহে।” এই বলিয়া দাড়িগোঁফের ফাঁকে-ফাঁকে রূপের ছটা। তার খাকি রং-এর আধময়লা কুর্তা-পেন্টেলুন তার দেহের দিব্যকান্তি গোপন করতে পারছে না।
লোকটা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, 'উটটা কোথায় রেখেছ বল না। উট না হলে উটের খেলা দেখাব কী করে? আহা, আমার অমন শেখান পড়ান উট গো।'
মধুমালতীর হৃদয়খানা খাঁচায় বন্ধ পাখির মতো ডানা ঝাপটাতে লাগল ।
ক্ষীণ কণ্ঠে সে বললে, 'অমন উট উট কর না বলছি। উট দেখলে আমি ভয়ে মুচ্ছো যাব।'
লোকটা ঘরের ভেতর একটু সেঁদিয়ে বললে, 'বাঃ বেড়ে গন্ধ বেরুচ্ছে তো! এইখানে এই টুলটাতে একটু বসি?'
মধুমালতী ভালো করে কথা না শুনেই বললে, ‘খুঁ’! কিন্তু খবরদার তিতির পাখির ভাগ চেয়ো না। তুমি তিতির পাখি খেয়ে ফেললে পরীদিদি কী খাবেন? আর পরীদিদি খেতে না পেলে রেগেমেগে রাজকুমারীদিদিদের আর আমাকে এককথায় গিরগিটি বানিয়ে দেবেন। তখন আমাদের বিয়েও হবে না, শাড়ি-গয়নাও পরা হবে না।'
লোকটা বলল, 'কেন বিয়ে হবে না? তোমার মতো যে রাঁধে তার একশ বার বিয়ে হবে। পরীদিদি এসব খাবেন না। দুরকম পরী হয়। এক নম্বর পরীরা মধু খায় আর দুনম্বর পরীরা গন্ধকের ধোঁয়া খায়, তিতির পাখির মাংস পরীরা খায় না!'
বলে তিতিরের একটা ঠ্যাং ছিঁড়ে তক্ষুনি সেটাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলল।
মধুমালতী আপত্তি জানাতে গেলে তাকে বাধা দিয়ে বললো, 'জান, আমি দেখতে এইরকম কিন্তু আমার জীবনে একটা বড় দুঃখ আছে।’
শুনে মধুমালতীর মনটাও হাহাকার করে উঠল। তিতিরের কথা সে ভুলে গেল।
লোকটা আবার বলল, 'বাইরে দেখছ কেমন কোট-পেন্টেলুন পরে দিব্যি উটই খুঁজে বেড়াচ্ছি, কিন্তু বুকের ভেতরটা শূন্য খাঁ-খাঁ করছে।'
মধুমালতীর চোখদুটিতে কালো দিঘির জলের মতো জল ছাপিয়ে এল।
লোকটি বলল, ‘পৃথিবীতে কে সত্যিকারের সুখী বলতে পার? যার রূপ-গুণ-ধন-দৌলত আছে, সে নয়। যার প্রেম-ভলবাসা, স্বাস্থ্য-শান্তি আছে,
মধুমালতী পশ্চাতে থাকিয়া দেখিলেন রাণী শ্মশানে বেড়াইতেছেন। রাণী যে পিশাচী তাহাতে আর সন্দেহ রহিল না। অবশেষে স্থির হইল যে, রাণীকে চিতানলে
দগ্ধ করা হইবে। রাণীকে রাজভবন হইতে আনিয়া কারাগারে রাখা হইল।
রাণীর মুখে কথা নাই, কারাগারে বসিয়া, দিনরাত বিছুটির জামা বুনিতেছেন।
ওদিকে তাঁহার কনিষ্ঠ ভ্রাতা কেমন করিয়া সংবাদ পাইয়া কারাগারের জানালার ধারে আসিয়া ঝটপট করিতেছে। শহরের লোক বলাবলি করিতেছে— “এ কি! রাজপুরোহিত আগেই বলেছিলেন, এ মেরো মানুষ
নয়, ভাগ্যে শীঘ্র ধরা পড়েছে তা না হলে রাজার কি সর্বনাশই করত।”
এইরূপ নানা জল্পনা চলিয়াছে। শেষে রাণীর মৃত্যুর দিন জির হইল।
ঘাতকগণ আসিয়া কয়েদী লইবার গাড়ীতে করিয়া রাণীকে লইয়া চলিল।
গাড়ীতে বাসায়ও রাণী জামা বুনিতেছেন—এগারটি জামা বার শেষ হইয়াছে, কেবল একটি জামার একখানা হাত বাকি আছে। কি আশ্চর্য! রাণীর গাড়ি যখন শ্মশানে যাইতেছে, চারিদিকে লোকে লোকারণ্য, তখন হঠাৎ এগারটি স্বর্ণমুকুটধারী রাজহংস উড়িয়া আসিয়া সেই গাড়ীর উপরে বসিল, ও পাখা দিয়া রাণীকে ঢাকিয়া উচ্চৈঃস্বরে ডাকিতে লাগিল। লোকে দেখিয়াঅবাক হইল। একি কাণ্ড! রাণী অমনি এগারটি জামা তাহাদের শরীরে ফেলিয়া দিলেন। তৎক্ষণাৎ এগারটি হংস এগার জন মানুষ হইয়া গেল।
কেবল একজনের একখানি হাতপাখা থাকিয়া গেল। রাণী মুখ বুলিয়া কথা কহিলেন, বলিলেন, –আমি নির্দোষ! আমার ভ্রাতাদিগকে উদ্ধার করিবার জন্যই মৌন ব্রত লইয়াছিলাম।” এই কথাগুলি বলিয়াই মনের আবেগে রাণী অচেতন হইয়া পড়িলেন। রাণীর মৃত্যু হইল ভাবিয়া, রাজা শোক করিতে লাগিলেন। ওদিকে তাঁহাকে দগ্ধ করিবার জন্য যে চিতা সাজান হইয়াছিল, দেখিতে দেখিতে সেই চিতার কাষ্ঠগুলি গজাইয়া উঠিল, ও
প্রত্যেকটি হইতে রাশি রাশি গোলাপ ফুটিয়া উঠিল। তাহার একটি শুভ্রবর্ণ ও অতি সুন্দর। রাজা সেই সর্বোৎকৃষ্ট সাদা ফুলটি তুলিয়া আনিয়া “এ ফুল
তোমারই উপযুক্ত” বলিয়া রাণীর বক্ষঃস্থলে রাখিলেন। কি আশ্চর্য, অমনি রাণী চক্ষু মেলিয়া চাহিলেন। শেষে মহা সমারোহে রাণীকে আবার রাজভবনেল ইয়া যাওয়া হইল।
