অথৈ জলে রাজপুরী রূপকথার গল্প
![]() |
অথৈ জলের রাজপুরী
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
সেই যে দেশের মেয়েদের খুকির মতন ছোট্ট ছোট্ট পা হয়, আর ছেলেরা মাস্টারের দিকে পিছন ফিরে পড়া
বলে, যে দেশের লোকেরা বাঁকা চোখে মিটমিট করে তাকায় আর কাঠি দিয়ে ভাত আর আরশুলার চাটনি খেয়ে সেই কাগজের ফানুশগুলো বানায়, —সেই চীন দেশে চাঙের বাড়ি ছিল।
চাঙের বাপ ছিল দোকানদার। সে তার দোকানে বসে লাল লাল ফানুস
আর রেশমি পাখা বেচত। চাঙ ছোট্ট ছেলেমানুষ, সে তার পুঁথি বগলে করে পাঠশালে পড়তে যেত। সে দেশের অক্ষরগুলো দেখতে জাহাজের মত। চাঙ পাতলা কাগজের উপর সরু তুলি দিয়ে সেইরকম অক্ষরে চমৎকার কবিতা লিখত। তার গুরুমশাইরা সেই কবিতা পড়ে ভারি আশ্চর্য হয়ে যেতেন, তেমন কবিতা আর কেউ কখনো লেখেনি।
দেখতে দেখতে চাঙ বড় হল, তার পাঠশালের পড়া শেষ হয়ে গেল।
তখন চাঙ-এর বাপ বলল, 'লেখাপড়া তো হয়েছে, এখন দোকানে এসে কাজ কর।
চাঙ বলল, 'বাবা, দোকানের কাজ আমার একটুও ভাল লাগে না।
আমাকে বিদেশে যেতে দাও, আমি করে খাব।'
চাঙের বাপ বলল, 'তাও কি হয়?'
চাঙ আর কিছু বলল না, কিন্তু তার মন বড় খারাপ হয়ে গেল। সে
পেটভরে খায় না, হেসে কথা কয় না, আর খালি জিনিস বেচে তার দাম
নিতে ভুলে যায়। কাজেই তার বাপ আর কি করে? সে বলল, 'আচ্ছা
বাবা, তোর যেখানে ভাল লাগে সেখানে যা।'
চাঙ অমনি তিন হাত উঁচু এক লাফ দিলে আর দুহাতে করে তার বাপের পায়ের ধুলো নিল। সেইদিনই সে তার মা-বাপের কাছে বিদায় নিয়ে, তার ছোট্ট পুঁটলিটি কালে করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। তারপর গ্রাম থেকে শহরে, শহর থেকে বন্দরে, এমনি করে সে সমুদ্রের ধারে এসে দেখল যে বড় বড় জাহাজ সব বাঁধা রয়েছে, তারা পাল খাটিয়ে, সমুদ্র পার হয়ে পৃথিবীর নানান জায়গায় যাবে।
চাঙ বলল, “বাঃ! এর একটা জাহাজে চড়ে গেলে কী মজাই হবে।”
তখনই সে একটা জাহাজের মাঝিকে গিয়ে বলল, ‘মাল্লা চাই? আমি মাল্লার কাজ করতে এসেছি।'
সেই জাহাজের মাল্লা হয়ে সে তো সমুদ্রে চলল, কিন্তু সে যেমন মজা
হবে মনে করেছিল তার কিছুই হল না! খানিক দূর গিয়েই সেই জাহাজ ঢেউ খেয়ে দুলতে লাগল। আর তখন চাঙ ভাবল বুঝি তার নাড়িভুঁড়ি সব বমি।হয়ে যাবে। তারপরে যেই সে একটু সামলে নিয়েছে, অমনি এমন ঝড় এল যে, ঝড় যাকে বলে! ঢেউয়ের ঘাড়ে ঢেউ চড়ে পাহাড়ের মতন উঁচু হয়ে এসে সেই জাহাজের উপর ভেঙে পড়তে লাগল। দেখতে দেখতে জাহাজখানি গুঁড়ো হয়ে মাঝি-মাল্লা সব কে কোথায় গেল, চাঙ তার কিছুই বুঝতে পারল না। সে খালি দেখতে পেল যে জাহাজের মাস্তুলটা তার কাছ দিয়ে ভেসে যাচ্ছে। সে প্রাণপণ করে সেটাকে আঁকড়ে ধরে রইল। তারপর ঝড় থেমে গেলে সে দেখল যে মাস্তলটা তাকে নিয়ে ভাসতে ভাসতে এসে ডাঙায় ঠেকেছে। সেইখানেই সে বালির উপর ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুমের ভিতরে কোনখান দিয়ে রাত কেটে গেছে চাঙ তা টের পায়নি।
সকালবেলায় জেগে সে দেখল তার চারধারে মেলাই লোক জড় হয়েছে।
তাদের সকলেরই ভারি মজার চেহারা আর বড্ড জমকালো পোশাক।
তাদের মধ্যে একজন দেখতে খুব সুন্দর, আর তার জামায় আর পাগড়িতে আর ঘোড়ার সাজে খালি হীরা, মোতি আর পান্না ঝলমল করছে। তিনি সেই দেশের রাজার ছেলে। তিনি চাজকে দেখে বললেন, 'আহা, না জানি কত কষ্ট পেয়েছ। তুমি কোথা থেকে আসছ ?"
চাঙ বলল, 'আমার বাড়ি চীন দেশে, ঝড়ে জাহাজ ডুবে এখানে এসে
পড়েছি।'
যেই এই কথা বলা, অমনি রাজার ছেলে কী খুশি যে হলেন আর চাঙকে কত যে যত্ন করতে লাগলেন কী বলব। সে দেশের লোকে আর কখনো চীন দেশের লোক দেখেনি। তারা খালি শুনেছে যে চীনেরা বড়ই
বুদ্ধিমান। রাজপুত্র মনে করলেন, “উঃ! কী আশ্চর্য! এটা জ্যান্ত চীনে মানুষ আমাদের দেশে এসেছে, একে নিয়ে গিয়ে বাবাকে না দেখালেই নয়।
তারা তখনই চাঙকে একটা চমৎকার ঘোড়ায় চড়িয়ে নিলে। চাঙ তাতে বসে বসে ভাবছে, ‘এইবারে বেশ মজা হবে।' অমনি ঘোড়া ওকে নিয়ে ঝুপ করে সমুদ্রের ভিতরে ডুবে গেল। তাকে ভাল করে মাগো' বলবার ও
সময় দিল না। কিন্তু কী আশ্চর্য! জলে ডুবে কোথায় সে দম আটকে মারা
যাবে, না, তার বদল দেখলে যে সে যারপরনাই আরামে আর সকলের
সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে চলেছে। জল তাদের পথ ছেড়ে দিয়ে সরে দাঁড়িয়েছে।
সমুদ্রতলায় এমন সুন্দর দেশ আছে, চাঙ তার কিছুই জানত না। সে মনে
করত তার চীন দেশই সকলের চেয়ে সুন্দর, কিন্তু এখন দেখল যে এদেশের
কাছে সে দেশ কিছুই নয়। আর সেই দেশের যে রাজবাড়ি, তা দেখে তো সে কথাই কইতে পারল না। রামধনুর রঙ দিয়ে, ঝিনুকের ঝিকিমিকি দিয়ে সে বাড়ি তয়ের করেছে। সেই বাড়িতে সমুদ্রের রাজা থাকেন। তিনি বুড়ো
মানুষ। তাঁর দাড়ি গোঁফ দুধের মতন সাদা আর রেশমের মত ফুরফুরে।
এমন সুন্দর মানুষ আর কেউ কখনো দেখেনি। চাঙ বড্ড থতমত খেয়ে
গিয়েছিল, তার বুকের ভিতরে যেন ঢেঁকি ধড়াস ধড়াস করছিল, কিন্তু
রাজামশাইকে দেখে তার ভয় চলে গেল। রাজামশাই তাকে দেখে ভারি
খুশি হলেন আর বললেন, 'আমি শুনেছি তোমাদের দেশের লোক ভারি
বুদ্ধিমান, আর তারা চমৎকার কবিতা লিখতে পারে। আচ্ছা, আমার এই
বাড়িটার কথা দিয়ে একটা কবিতা লেখ তো।'
চাঙের মত কবিতা তো আর কেউ লিখতে পারত না, কাজেই সে
তখনই কাগজ কলম নিয়ে বসে মত এক কবিতা লিখে ফেলল। তেমন
সুন্দর কবিতা আগে সে নিজেও কখনো লেখেনি। রাজামশাই সেই কবিতা পড়ে এতই খুশি হলেন যে তিনি ঘাড় নেড়ে, সুর করে বারবার করে সেটা পড়তেই লাগলেন। চাওকে তিনি বাড়ি, ঘর, হাতি, ঘোড়া, লোকজন, জমিদারি কত কিছুই দিলেন, তাতেও তার মন উঠল না, শেষে নিজের মেয়েটির সঙ্গে তার বিয়ে দিলেন। সেই মেয়েটি দেখতে যেমন সুন্দরী, তেমনি লক্ষ্মী, তেমনি তার বুদ্ধি। তারপর বছরের পর বছর চাঙের সুখে কেটে গেছে। তাদের যারপরনাই সুন্দর দুটি খোকা হয়েছে। চাঙের মতন সুখী লোক আর নাই, খালি একটি কারণে তার মনে বড় দুঃখ। যতই
দিনের পর দিন যাচ্ছে, ততই তার মন তার বাপ-মাকে দেখবার জন্য
পাগল হচ্ছে। তাদের কথা ভেবে তার চোখের জল পড়ে। শেষে সে
একদিন রাজার মেয়েকে বলল, 'চল না একবার আমাদের দেশে যাই।
আমার মাকে বাবাকে বড় দেখতে ইচ্ছে করছে।'
রাজার মেয়ে বলল, 'হায়! আমরা কী করে যাব? এ দেশের বাইরে
গেলেই যে আমরা মরে যাই!'
চাঙ বলল, 'তাই তো, তাহলে আর কী করে হয়?”
রাজার মেয়ে বলল, 'আমরা নাই বা গেলাম, তুমি তোমার মা-বাপকে
দেখে এস। কিন্তু দেখো; যেন এক বছরের বেশি দেরি করো না, তাহলে
কিন্তু আমি কাঁদতে কাঁদতে মরেই যাব।”
তারপর রাজার মেয়ে এক থলে মণি-মুক্তো আর একখানি ছোট আরশি
এনে চাঙকে দিয়ে বলল, 'এই থলেটি আমার শ্বশুর-শাশুড়িকে দিও, আর
এই আরশিখানি তোমার কাছে যত্ন করে রেখো। দেশে গিয়ে তোমার
যখনই ইচ্ছা হবে তখনই এই আরশির ভিতরে আমাকে দেখতে পাবে।'
তখন সুন্দর একটি গাড়ি সেজে এল, সেই গাড়িতে করে রাজার মেয়ে
চাঙকে সমুদ্রের ধারে পৌঁছিয়ে দিয়ে গেল। সেখানে চীন দেশের অনেক
জাহাজ ছিল, চাও তার একটাতে চড়ে দেশে এল।
কিন্তু হায় হায়। দেশে এসে চাও দেখল যে তাদের সে বাড়িতে আর
তার বাপ-মা নেই। দোকানটি আগুনে পুড়ে গিয়েছে আর তার সঙ্গে
তাদের আর যা কিছু ছিল সব গিয়েছে, একটা ঘটি-বাটিও বাঁচে নাই। তার বাবা-মা এখন একটা পচা গলিতে একটা কুঁড়েঘরে থাকে, ভিক্ষা করে খায়, অনেকদিনই তাও পায় না।
অনেক কষ্টে চাঙ তাদের খুঁজে বার করল। তারাও মনে করেছে চাও আর
নাই, আর তাই ভেবে এতদিন ধরে চোখের জল ফেলেছে। এর মধ্যে যখন চাঙ এসে তাদের প্রণাম করল, তখন তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মনে হল যেন তাদের আর দুঃখই নাই। চাঙ ও তখন হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। বা হোক, সে কোনমতে একটু শান্ত হয়েই ছুটে গিয়ে বাজার থেকে ভাল ভাল খাবার কিনে নিয়ে এল। বাজারে যতদূর ভাল খাবার পাওয়া যায়, তাই দিয়ে মা-বাপকে বেশ করে খাইয়ে তারপর সে সেই রাজার মেয়ের দেওয়া মণি- মুক্তোর থলিটি নিয়ে তাদের জন্যে বাড়ি খুঁজতে বেরোল।
সে সব মণির এক একটি দিয়ে সাতটি রাজাকে কিনে ফেলা যায়। তার
মা-বাপ যেমন কষ্টে ছিল, দেখতে দেখতে তাদের তেমনি সুখ হয়ে গেল।
তারা যখন শুনল যে এত ধনের সবই সেই সমুদ্রের রাজার মেয়ে তাদের
দিয়েছে, তখন দিনরাত খালি হাত তুলে তাকে আশীর্বাদ করতে লাগল।
তার পর থেকে দিন খুব সুখেই যায়, চাঙ বাবা মায়ের সেবা করে, আর
রোজই সেই আরশিটি দিয়ে দেখে রাজার মেয়ে ভাল আছে কি না। দিনকতক তার মুখখানি বেশ হাসি-হাসি দেখা গেল, তার পর থেকে মনে হল যেন তার চোখ দুটি ছলছল করছে। তা দেখে চাঙের মনে ভারি কষ্ট হল, সে আর দেশে চুপ করে বসে থাকতে পারল না। তার পরদিন সে বাপ-মাকে বলল,
‘আমার যাবার সময় হয়েছে, তোমরা খুশি হয়ে আমাকে যেতে দাও।'
তারাও অনেক আশীর্বাদ করে বিদায় দিল।
তারপর তাদের ওখান থেকে চাঙ সমুদ্রের ধারে এসে জাহাজ ভাড়া
করতে গেল। জাহাজের মাঝি জিজ্ঞেস করল, 'কোথায় যাবে ?
তখন তো চাঙের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল! যেখানে যাবে সে
জায়গার নাম তো সে জানে না! সে জাহাজ ডুবে সেখানে গিয়ে পড়েছিল,
কিন্তু কোনদিন তার নাম শোনেনি, কাউকে জিজ্ঞেসও করেনি। সে খালি
জানত সেটা একটা দ্বীপ। কাজেই সে আর কি করে!
সে মাঝিকে বলল, 'তোমরা যত দ্বীপের কথা জান, সেই সব দ্বীপ
আমাকে দেখিয়ে আনবে।'
মাঝি কত দ্বীপে জাহাজ নিয়ে গেল, কিন্তু তার একটাকেও চাও তার
সেই দ্বীপ বলে চিনতে পারল না। এদিকে বছর প্রায় ফুরিয়ে আসছে।
রাজার মেয়ের চোখ-দুটি দিয়ে ঝর-ঝর করে জল ঝরছে।
চাঙ বলল, 'হায় হায়। এখন উপায়?
বলতে না বলতেই চাও চমকে উঠল। সে শুনল, যেন জলের ভিতর
থেকে কে তাকে ডাকছে, 'বাবা! বাবা!'
সে চেয়ে দেখল যে তারই নিজের ছেলে দুটি তাদের ছোট্ট ছোট্ট হাত
দু'খানি দিয়ে ডাকছে, আর সেই জলের ভিতর থেকে তাকে চুমো খাচ্ছে।
তারা বলল, “বাবা আমাদের পিছু-পিছু তোমাদের জাহাজ চালিয়ে নিয়ে
এস, তোমাকে নিয়ে যাবার জন্য মা আমাদের পাঠিয়েছেন।'
এই কথা বলে সেই খোকা দুটি ঢেউয়ের সঙ্গে খেলা করতে করতে
মাছের মতন ছুটে জাহাজের আগে আগে চলল, আর মাঝি-মাল্লারা
পালের উপর পাল তুলে দিয়ে সবাই মিলে প্রাণপণে, ‘হেঁইয়ো’ করে দাঁড়
টেনে তাদের সঙ্গে সঙ্গে যেতে লাগল।
আর একটু পরেই চাঙ লাফিয়ে উঠে বলল, 'আরে থাম থাম! এই যে
আমার সেই দ্বীপা
বলেই চাঙ ঝনাৎ ঝনাৎ করে তাদের এক থলির জায়গায় তিন থলি টাকা বকশিশ দিয়ে ছুটে গিয়ে সেই দ্বীপে নামল। মাঝি-মাল্লারা খুশি হয়ে
তাকে সেলাম করতে করতে জাহাজ ভাসিয়ে চলে গেল, আর তখনই তার
ছেলে দুটি হাসতে হাসতে ছুটে এসে তার কোলে লাফিয়ে উঠল।
রাজার মেয়ে তো এর কতদিন আগে থাকতেই গাড়ি নিয়ে সেখানে
এসে ভাবছিল, চাঙ কেন আসছে না। চাঙকে দেখে সে কত খুশি হল কী
বলব! তারপর তারা গিয়ে রাজার বাড়িতে পৌঁছাল। দেশের লোক আর
রাজা নিজেও কম খুশি হলেন না। চাঙও অবিশ্যি খুবই খুশি হল। সে
কিছুই বলল না বটে, কিন্তু কবিতা লিখল হাজার দুই তিন।
শেষ---
