নবম শ্রেণীর ইতিহাস তৃতীয় অধ্যায়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর
![]() |
প্রশ্ন: ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দের ভিয়েনা সম্মেলন সম্পর্কে আলোচনা করো।
উত্তর সংকেত : ভূমিকা – ভিয়েনা সম্মেলনের বৈশিষ্ট্য :
(১) আন্তর্জাতিক সম্মেলন, (২) জাঁকজমক, (৩) বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিবর্গ, (৪) চার প্রধান, (৫) সভাপতি ও মুখ্যসচিব ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ – ভিয়েনা ব্যবস্থায় গৃহীত মূলনীতি – পর্যালোচনা : (১) উদার চুক্তি, (২) শাস্তি রক্ষা, (৩) যুক্তিগ্রাহ্য ব্যবস্থা ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান নেতৃবর্গের পরিচয়।
উত্তর > ভূমিকা : নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত সম্মেলন ভিয়েনা নামে পরিচিত।
ভিয়েনা সম্মেলনের বৈশিষ্ট্য : ভিয়েনা সম্মেলনের বৈশিষ্ট্যগুলি হল—
[১] আন্তর্জাতিক সম্মেলন : এই সম্মেলন হল পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এই সম্মেলনে কেবলমাত্র তুরস্কের
সুলতান এবং পোপ ছাড়া ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ অংশগ্রহণ করে।
[২]জাঁকজমক : বিভিন্ন দেশের রাজা, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ, সেনাপতি, প্রধানমন্ত্রী, সাংবাদিকদের আগমনে এই সম্মেলন হয়ে ওঠে জমজমাট ও জাঁকজমকপূর্ণ।
[৩] বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিবর্গ : এই সম্মেলনে যোগদান করেন প্রথম আলেকজান্ডার, অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলার
প্রিন্স মেটারনিখ, প্রাশিয়ার চ্যান্সেলার কার্ল হার্ডেনবাগ, ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড ক্যাসলরি ও ফ্রান্সের প্রতিনিধি দল।
[৪] চার প্রধান : ভিয়েনা সম্মেলনে অস্ট্রিয়া, প্রাশিয়া, রাশিয়া, ইংল্যান্ড এই চারটি দেশই (শক্তি) ছিল প্রধান। এই চারটি দেশ ও চার দেশের প্রধানদেরই একসঙ্গে বলা হয় বৃহৎ চতুঃশক্তি বা চার প্রধান (Big Four ) ।
[৫] সভাপতি ও মুখ্যসচিব : প্রিন্স মেটারনিখ ছিলেন এই সম্মেলনের সভাপতি। তিনি ছিলেন এই সম্মেলনের মধ্যমণি। সম্মেলনের মুখ্য সচিব ছিলেন অস্ট্রিয়ার ফ্রিডরিখ ভন জেনৎস্।
ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্যসমূহ : ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান উদ্দেশ্যগুলি হল—(১) নেপোলিয়নের পতনের পর পুনর্গঠনের মাধ্যমে রাজকীয় শক্তিগুলিকে সুসংহত করা, (২) উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন ও পুনর্বণ্টন করা,
(৩) ইউরোপে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, (৪) ইউরোপের বিপ্লবী ভাবধারার গতিরোধ করা,
(৫) ফ্রান্স যাতে ভবিষ্যতে আর কোনোদিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে ইউরোপীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে তছনছ/ছিন্নভিন্ন করে দিতে না-পারে সেদিকে লক্ষ রাখা, (৬) রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের মধ্যে হৃদ্যতা বজায় রাখা ।
ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্দেশ্য হিসেবে নানারকম উচ্চ আদর্শের কথা বলা হলেও এর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল (১) বিজয়ী শক্তি কর্তৃক বিভিন্ন দেশের ভূখণ্ড আত্মসাৎ করা এবং (২) পরিবর্তনকে ঠেকিয়ে পুরোনো কাঠামোকে ধরে রাখা। ভিয়েনা ব্যবস্থায় গৃহীত মূলনীতি : ভিয়েনা সম্মেলনে গৃহীত তিনটি প্রধান (মূল) নীতি হল – (১) ন্যায্য অধিকার নীতি (Legitimacy),
(২) ক্ষতিপূরণ নীতি (Compensation) ও
(৩) শক্তিসাম্য নীতি (Balance of power)।
- পর্যালোচনা : ভিয়েনা সম্মেলন নানাদিক থেকে সমালোচিত হলেও এই সম্মেলনের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম, কারণ-
১. উদার চুক্তি : পরাজিত ফ্রান্সের সঙ্গে কখনো প্রতিশোধমূলক ব্যবহার করা হয়নি।
২.শান্তি রক্ষা : সম্মেলনের পরবর্তী ৪০ বছর ইউরোপে শান্তি বজায় থাকার কৃতিত্ব ভিয়েনা সম্মেলনের।
৩. যুক্তিগ্রাহ্য ব্যবস্থা : ঐতিহাসিক ডেভিড টমসনের মতে নানা ত্রুটি সত্ত্বেও সার্বিকভাবে ভিয়েনা সম্মেলন ছিল একটি যুক্তিগ্রাহ্য ও কুটনৈতিক জ্ঞানসম্পন্ন বন্দোবস্ত (a reasonable and statesmanlike arrangement)
প্রশ্নঃ ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান নীতিগুলি উল্লেখ করো।
উত্তর : সংকেত : ভূমিকা – ন্যায্য অধিকার নীতি – ক্ষতিপুরণ নীতি – শক্তিসাম্য নীতি অবসান, (২) শান্তি প্রতিষ্ঠা পর্যালোচনা : (১) অস্থিরতার উপসংহার।
উত্তর> ভূমিকা : ভিয়েনা সম্মেলন ছিল পৃথিবীর প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলন। নেপোলিয়নের চূড়ান্ত পরাজয়ের পর ইউরোপীয় রাষ্ট্রনায়করা-(১) ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থার পুনর্গঠন ও পুনর্বণ্টন, (২) উদ্ভূত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুষ্ঠু সমাধান, (৩) বিপ্লবী ভাবধারার গতিরোধ এবং (৪) ইউরোপে নিরবচ্ছিন্ন শান্তিরক্ষার জন্য ভিয়েনা সম্মেলনের আহ্বান করেছিলেন। এই সম্মেলনে মূলত তিনটি নীতি গৃহীত হয়—
(১) ন্যায্য অধিকার, (২) ক্ষতিপূরণ, (৩) শক্তিসাম্য নীতি।
★ ন্যায্য অধিকার নীতি : ন্যায্য অধিকার নীতি অনুসারে ফরাসি বিপ্লবের আগে যেসব রাজা বা রাজবংশ যেখানে রাজত্ব করতেন সেখানে তাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হয়। এই নীতি অনুযায়ী—(১) ফ্রান্সের সিংহাসনে বুরবো বংশীয় অষ্টাদশ লুইকে বসানো হয়, (২) স্পেন, সিসিলি ও নেপলস্-এ ও বুরবো বংশের অপর শাখা, (৩) হল্যান্ডে অরেঞ্জ বংশ, (৪) মধ্য ইটালিতে পোপের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় এবং (৫) অস্ট্রিয়ায় হ্যাপসবার্গ বংশকে তাঁদের আগের রাজ্য ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
★ক্ষতিপূরণ নীতি : ক্ষতিপূরণ নীতি অনুসারে নেপোলিয়নের সঙ্গে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলি বিভিন্ন অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেয়।
(১) উত্তর ইটালিতে লম্বার্ডি, ভেনোশিয়া এবং পোল্যান্ডের কিছু অংশ সহ নবগঠিত জার্মান কনফেডারেশনের নেতৃত্ব অস্ট্রিয়াকে দেওয়া হয়েছিল।
(২) প্রাশিয়া পায় স্যাক্সনির উত্তরাংশ, পোজেন, থর্ন, ডানজিগ, রাইন অঞ্চল ও ওয়েস্টফেলিয়ার কিছু অংশ।
(৩) রাশিয়া পায় ফিনল্যান্ড, বেসারাবিয়া ও পোল্যান্ডের বৃহৎ অংশ।
(৪) ইংল্যান্ড লাভ করেছিল ভূমধ্যসাগরের মালদ্বীপ, হোলিগোল্যান্ড, মরিশাস ও সিংহল।
★শক্তিসাম্য নীতি : শক্তিসাম্য নীতি অনুসারে—
(১) ফ্রান্সকে বিপ্লব-পূর্ব সীমারেখায় ফিরিয়ে আনা হয়, (২) ফ্রান্সের সেনাবাহিনী ভেঙে দেওয়া হয়, (৩) ফ্রান্সকে সত্তর কোটি ফ্রাঙ্ক ক্ষতিপুরণ দিতে বাধ্য করা হয় এবং (৪) ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য ফ্রান্সের চারদিকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রবেষ্টনী গড়ে তোলা হয়।
এভাবে প্রাশিয়া, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া প্রভৃতি দেশকে এমনভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয় যাতে একটি দেশ অপর একটি দেশের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়ে না-ওঠে। এইভাবেই শক্তিসামা করা হয়।
পর্যালোচনা : ভিয়েনা সম্মেলনের প্রধান নীতিগুলির সাফল্য ছিল এরকম-
[ ১] অস্থিরতার অবসান : ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়নের উত্থানের ফলে ইউরোপে যে-রাজনৈতিক অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল, ইউরোপের পুনর্গঠনের মাধ্যমে সেই সমস্যার সাময়িক সমাধান হয়েছিল।
[২] শান্তি প্রতিষ্ঠা : ভিয়েনা কংগ্রেসের নীতিগুলি দীর্ঘদিন ইউরোপে শান্তি বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছিল। প্রায় চল্লিশ বছর ইউরোপে শান্তি বজায় ছিল।
-● উপসংহার : ভিয়েনা সম্মেলন দ্বারা-(১) সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ফ্রান্স, (২) জাতীয়তাবাদ, উদারনীতিবাদ ও গণতান্ত্রিক আদর্শকে প্রতিহত করা হয়, (৩) বিপ্লব ও বিদ্রোহকে দমনের ব্যবস্থা করা হয়। তবুও নিঃসন্দেহে এ কথা বলা যায়, ভিয়েনা সম্মেলনের সিদ্ধান্তগুলি সম্পূর্ণরূপে যুগোপযোগী না-হলেও এটি
ছিল একটি যুক্তিসংগত ও রাষ্ট্রনীতিমূলক ব্যবস্থা।
প্রশ্ন : মেটারনিখ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্যগুলি কী? এই ব্যবস্থার সাফল্য আলোচনা করো।
উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : মেটারনিখ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য :
(১) প্রগতিশীল ভাবধারার ধ্বংসসাধন, (২) আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি ধুলিসাৎ, (৩) ন্যায্য অধিকার নীতি,
(৪) সংস্কার বিরোধিতা, (৫) স্বাধীনতা হরণ, (৬) অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য রক্ষা করা, (৭) শক্তি সমবায়ের ব্যবহার।
দ্বিতীয় অংশ : সাফল্য :
(১) শাস্তি প্রতিষ্ঠা, (২) অস্ট্রিয়ার স্বার্থরক্ষা, (৩) সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি উপসংহার।
উত্তর » প্রথম অংশ: অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলার তথা ইউরোপের বিখ্যাত রাজনীতিবিদ প্রিন্স মেটারনিখ ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত ভাবধারাগুলিকে দমন করতে এবং প্রাক্-বৈপ্লবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তাকেই মেটারনিখ ব্যবস্থা বলা হয়।
মেটারনিখ ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য :
১ প্রগতিশীল ভাবধারার ধ্বংসসাধন: ফরাসি বিপ্লবের ফলে গড়ে ওঠা উদারতন্ত্রী তথা প্রগতিশীল ভাবধারার (উদারতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ) তীব্র বিরোধী ছিলেন তিনি। তিনি মনে
করতেন, ফরাসি বিপ্লবের ফলে তৈরি হওয়া ভাবধারাগুলি সমাজ ও সভ্যতার ধ্বংসসাধনকারী। তাই এই দুষ্ট ক্ষতকে উত্তপ্ত লৌহশলাকা দ্বারা দুর করতে হবে।
>> আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি ধূলিসাৎ : ফরাসি বিপ্লব প্রত্যেক জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি প্রতিষ্ঠা করেছিল। মেটারনিখ বুঝতে পেরেছিলেন, এ দাবি শুধুমাত্র ফ্রান্সের সীমানায় আটকে না-থেকে খুব তাড়াতাড়ি অস্ট্রিয়াকেও গ্রাস করবে এবং অস্ট্রিয়া খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। তাই যে-কোনো মূল্যে তিনি বিপ্লবকে ধ্বংস করতে উদ্যোগী হন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবি উড়িয়ে দেন।
[৩] ন্যায্য অধিকার নীতি : মেটারনিখ ন্যায্য অধিকার নীতি প্রয়োগ করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ফরাসি বিপ্লবের আগের রাজবংশ ও রাজাদের ফিরিয়ে এনে বিপ্লব পূর্ববর্তী ইউরোপ প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেন।
[৪] সংস্কার বিরোধিতা : মেটারনিখ ব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল সংস্কার বিরোধিতা ও কোনো পরিবর্তন না-করা। সেজন্য তিনি বলতেন রাজত্ব করুন কিন্তু কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার করবেন না ।
[৫] স্বাধীনতা হরণ : মেটারনিখ সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাক্স্বাধীনতা হরণ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলির ওপর কঠোর সরকারি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেন, রাজনৈতিক সভাসমিতি নিষিদ্ধ করেন এবং শিক্ষক ও ছাত্রদের ওপর গোয়েন্দাদের নজরদারি বৃদ্ধি করেন।
[৬] অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য রক্ষা করা: ইউরোপের রাজনীতিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য রক্ষা করা ছিল এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এ ছাড়াও তিনি অভিজাততন্ত্র, সামন্ততন্ত্র ও চার্চতন্ত্রকে পূর্ণ সমর্থন জানান।
[৭] শক্তি সমবায়ের ব্যবহার : ইউরোপীয় শক্তিসমবায়কে বিপ্লবপ্রসূত ভাবধারা দমনের কাজে লাগান। ভিয়েনা চুক্তির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষাও করেন।
দ্বিতীয় অংশ :
• সাফল্য : নানাভাবে সমালোচিত হলেও মেটারনিখ ব্যবস্থার সাফল্যকে অস্বীকার করা যায় না, কারণ—
[১] শান্তি প্রতিষ্ঠা : এই ব্যবস্থার ফলে দীর্ঘদিন প্রায় চল্লিশ বছর ইউরোপ থেকে যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর হয়েছিল।
[২] অস্ট্রিয়ার স্বার্থরক্ষা : বহু জাতি অধ্যুষিত অস্ট্রিয়ার সংহতি রক্ষা পেয়েছিল এবং ইউরোপের রাজনীতিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য বৃদ্ধি পেয়েছিল।
[৩] সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি : এইসময় ইউরোপে শান্তি স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা হলে শিল্প, সংস্কৃতি, সাহিত্যের সমৃদ্ধি ও বিকাশ ঘটে।
উপসংহার : ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মেটারনিখ;ছিলেন সমগ্র ইউরোপীয় রাজনীতির মুখ্য নিয়ন্ত্রক। সেই কারণেই এই সময়কালকে বলা হয় মেটারনিখ যুগ।
প্রশ্ন : ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লবে কীভাবে রাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের মধ্যে সংঘাত দেখা দিয়েছিল তা ব্যাখ্যা করো।
উত্তর সংকেত : ভূমিকা রাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সংঘাত : (১) বুরবোঁ রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, (২) পরস্পর- বিরোধী সংঘাত, (৩) অষ্টাদশ লুইয়ের মধ্যপন্থা, (৪) দশম চার্লস-এর পদক্ষেপ, (৫) উদারপন্থীদের সাফল্য, (৬) জুলাই অর্ডিন্যান্স প্যারিস বিদ্রোহ - উপসংহার।
উত্তর > ভূমিকা : ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের জুলাই বিপ্লব ছিল ফ্রান্সের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ভিয়েনা সম্মেলনের ন্যায্য অধিকার নীতি মেনে ফ্রান্সে বুরবোঁ রাজতন্ত্র ফিরে এসেছিল, কিন্তু পুরাতন ব্যবস্থার আর কিছুই ফিরে আসেনি। বুরবোঁ রাজা অষ্টাদশ লুই সিংহাসনে বসে ফরাসি বিপ্লবের কিছু গণতান্ত্রিক আদর্শকে স্বীকৃতি দান করেন। তবুও নানা কারণে রাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সংঘাত তীব্র হয়ে উঠে।
- রাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের সংঘাত : জুলাই বিপ্লবের উল্লেখযোগ্য কারণগুলি বিশ্লেষণ করলে রাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের মধ্যে সংঘাতের যে-দিকগুলি ফুটে ওঠে তা হল—
[১] বুরবোঁ রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা : বুরবোঁ বংশের রাজা অষ্টাদশ লুইয়ের সিংহাসন লাভের সঙ্গে সঙ্গে নির্বাসিত রাজতান্ত্রিকরা পুনরায় দেশে ফিরে আসে এবং স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে তাদের হূত সম্পত্তি ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার করে। এই ঘটনা ফরাসি জনগণের মনে বিক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
[২] পরস্পরবিরোধী সংঘাত : ফরাসি জনসাধারণ দেখে যে, তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ও আদর্শ রক্ষিত হচ্ছে না। ফলে দেশ আবার উগ্র রাজতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী এই দুই দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে জুলাই বিপ্লব ছিল এই দুই দলের পরস্পরবিরোধী আদর্শগত সংঘাতের চরম প্রকাশ।
[৩] অষ্টাদশ লুইয়ের মধ্যপন্থা : সিংহাসন লাভ করে সম্রাট অষ্টাদশ লুই প্রথমে কিছুটা উদারনীতির সঙ্গে একটা মধ্যপন্থা অনুসরণ করে চলতে চেষ্টা করেন। কিন্তু ১৮২০ খ্রিস্টাব্দের পর অষ্টাদশ লুই স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন।
[৪] দশম চার্লস-এর পদক্ষেপ : ১৮২৪ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট অষ্টাদশ লুইয়ের মৃত্যুর পর দশম চার্লস সিংহাসনে বসলে ফ্রান্সে চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি পুনরায় আত্মপ্রকাশ করে। দশম চার্লসের প্রথম দুই মন্ত্রীদ্বয় ভিলল এবং মার্টিনাক প্রতিক্রিয়াশীল নীতি অনুসরণ করেছিলেন।
[৫] উদারপন্থীদের সাফল্য : দশম চার্লস কর্তৃক প্রবর্তিত প্রতিক্রিয়াশীল আইনের ফলে উদারপন্থীরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং আইনসভার নির্বাচনে তারা সাফল্য অর্জন করে। উদারপন্থীদের প্রভাব বৃদ্ধিতে ভয় পেয়ে পরবর্তী মন্ত্রী মার্টিনাককে সরিয়ে দশম চার্লস যাজক ও অভিজাত সম্প্রদায়ের সমর্থক প্রিন্স পলিগন্যাক নামে এক প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তিকে মন্ত্রীপদে নিযুক্ত করেন এবং উদারনৈতিক শাসনব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ পরিবর্তিত করে স্বৈরাচারী শাসন স্থাপনের ষড়যন্ত্র করতে থাকেন ৷
[৬] জুলাই অর্ডিন্যান্স : ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট দূর করা এবং উদারপন্থীদের সমস্ত বিরোধিতা স্তব্ধ করা, জনসাধারণের স্বার্থ ও অধিকার খর্ব করার উদ্দেশ্যে পলিগন্যাক চারটি অর্ডিন্যান্স বা জরুরি আইন জারি করেন (২৫ জুলাই, ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দ)। এই আদেশগুলি হল- (১) প্রতিনিধিসভা ভেঙে দেওয়া, (২) ভোটদাতাদের সংখ্যা হ্রাস করা, (৩) সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা এবং (৪) জাতীয় সভার নতুন নির্বাচনের আদেশ দেওয়া।
◆প্যারিস বিদ্রোহ : জুলাই অর্ডিন্যান্স জারি হওয়ার পরের দিনই প্যারিসে বিদ্রোহ শুরু হয় (১৮৩০ খ্রিস্টাব্দের ২৬ জুলাই)। উদারপন্থী নেতা অ্যাডলফ থিয়ার্সের নেতৃত্বে তিনদিনের মধ্যেই বিদ্রোহীরা জয়যুক্ত হয় এবং দশম চার্লসকে সিংহাসনচ্যুত করে। প্রগতিশীল বলে পরিচিত অর্লিয়েন্সের ডিউক লুই ফিলিপ ফ্রান্সের সিংহাসনে বসেন।
◆উপসংহার : জুলাই বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সে রাজতন্ত্রের পতন হয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় প্রজাতন্ত্র। অচিরেই বিপ্লবের ঢেউ ফ্রান্সের সীমানা অতিক্রম করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে জাতীয়তাবাদ ও উদারতন্ত্রের বিকাশ ঘটায় ।
প্রশ্ন: ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের গুরুত্ব কী ছিল? এই বিপ্লবকে কী বিশ্ববিপ্লবের সমতুল্য বিপ্লব বলা যায়?
উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের গুরুত্ব : (১) রাজতন্ত্রের অবসান ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা,
(২) সর্বজনীন ভোটাধিকার নীতি, (৩) এককক্ষযুক্ত আইনসভা, (৪) জনসাধারণের প্রাধান্য স্থাপন, (৫) ফ্রান্সে দাসপ্রথার উচ্ছেদ, (৬) সামরিক বাহিনীর দ্বার উন্মুক্ত, (৭) সমাজতন্ত্র স্থাপনের চেষ্টা।
দ্বিতীয় অংশ : (১) ইউরোপেই সীমাবদ্ধ, (২) বিপ্লবের ব্যর্থতা, (৩) ভিন্নতা-মূল্যায়ন।
উত্তর>> প্রথম অংশ : ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দে এই জুলাই রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ শুরু হয় যা ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে পরিচিত।
◆ ফ্রান্সে ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের গুরুত্ব : ফ্রান্সের ইতিহাসে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব ছিল এক তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা, কারণ ফ্রান্সের ইতিহাসে এই বিপ্লবের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী-
[১] রাজতন্ত্রের অবসান ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা : এই বিপ্লবের মাধ্যমে ফ্রান্সে জুলাই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং প্রজাতন্ত্রী নেতা লা মার্টিনের নেতৃত্বে এই অস্থায়ী প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।
[2] সর্বজনীন ভোটাধিকার নীতি : এই বিপ্লবের কুশীলবদের (থিয়ার্স, লা মার্টিন প্রমুখ) অন্যতম দাবি ছিল ভোটাধিকার সম্প্রসারণ এবং এ কারণে এই বিপ্লবের পরসর্বজনীন ভোটাধিকার স্বীকৃত হয়।
[৩] এককক্ষযুক্ত আইনসভা : অস্থায়ী সরকার প্রজাতান্ত্রিক ফ্রান্সের গঠনতন্ত্র তৈরি করে এবং প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে নির্বাচিত ৭৫০ জন সদস্যের এককক্ষযুক্ত একটি আইনসভা ও জনগণের ভোটে নির্বাচিত চার বছরের জন্য একজন রাষ্ট্রপতির ব্যবস্থা করে।
[৪] জনসাধারণের প্রাধান্য স্থাপন : এই বিপ্লবের ফলে প্রথম মধ্যবিত্ত শ্রেণির প্রাধান্যের স্থলে প্রতিষ্ঠিত হয় জনসাধারণের রাজনৈতিক অধিকার ও সমতা; পাশাপাশি আর্থসামাজিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটেছিল।
[৫] ফ্রান্সে দাসপ্রথার উচ্ছেদ : ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর ফ্রান্সের প্রজাতান্ত্রিক সরকার দাসপ্রথার উচ্ছেদসাধন করে। এভাবে প্রায় ৫ লক্ষ দাসকে স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করার সুযোগ এনে দেয়।
[৬] সামরিক বাহিনীর দ্বার উন্মুক্ত : ফরাসি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের গৃহীত ব্যবস্থার ফলে জাতীয় সামরিক বাহিনীতে যে-কোনো লোক যোগদান করতে পারবে বলে স্বীকৃত হয়।
[৭] সমাজতন্ত্র স্থাপনের চেষ্টা : সকলের জন্য আর্থিক আয়ের ব্যবস্থা করা, মজুরশ্রেণির স্বার্থরক্ষা এবং প্রজাতন্ত্রকে সুদৃঢ় ভিত্তিতে স্থাপন করা, এইগুলি প্রজাতান্ত্রিক সরকারের মূল উদ্দেশ্য বলে ঘোষিত হয়েছিল। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সমাজতন্ত্রবাদ বা অর্থনৈতিক ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা স্থাপনের চেষ্টা সেসময় ফ্রান্সেই প্রথম দেখা যায়।
দ্বিতীয় অংশ : ঐতিহাসিক এরিক হবস্বম ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবকে বিশ্ববিপ্লবের সমতুল্য' বলে অভিহিত করেছেন। এই বিপ্লব ইউরোপের ভিয়েনা বন্দোবস্ত ও মেটারনিখতন্ত্রের পতন ঘটায়। এই বিপ্লবের ফলে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অস্ট্রিয়া, ইটালি, হাঙ্গেরি, জার্মানি, সুইজারল্যান্ড, মিলান, রোম, বোহেমিয়ায় একের পর এক বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয়। এভাবে এই বিপ্লব ইউরোপের অন্তত ১৫টি দেশে
ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু ঐতিহাসিক এরিক হবম-এর এই বক্তব্য পুরোপুরি সমর্থনযোগ্য নয়, কারণ—
[১] ইউরোপেই সীমাবদ্ধ : ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ইউরোপেই সীমাবদ্ধ ছিল; এই বিপ্লবের প্রভাবে ইউরোপের বাইরে অন্য দেশে বিপ্লব সংঘটিত হয়নি।
[২] বিপ্লবের ব্যর্থতা : ইউরোপের ১৫টি দেশে এই বিপ্লব ছড়িয়ে পড়লেও খুব কম দেশেই তা সফল হয়েছিল। রাজতান্ত্রিক দেশগুলির দমনপীড়নে শেষপর্যন্ত বিপ্লব সফল হয়নি।
[৩] ভিন্নতা : কোনো সুনির্দিষ্ট কারণে ইউরোপে সব জায়গায় ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের বিপ্লব পরিব্যাপ্ত হয়নি, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে এই বিপ্লবের প্রকৃতি ও গভীরতা ছিল আলাদা ধরনের।
◆ মূল্যায়ন : ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের ব্যর্থতা সত্ত্বেও এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, এই বিপ্লব ইউরোপের সামাজিক কাঠামোর পরিবর্তন এনেছিল। ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে মহান ফরাসি বিপ্লব যার সুচনা করেছিল ফেব্রুয়ারি বিপ্লব তাকে পরিণত করেছিল। তাই একে বিশ্ববিপ্লব বললেও অত্যুক্তি হবে না।
প্রশ্ন: ইটালির ঐক্য আন্দোলনে ক্যাভুরের নীতি ও ভূমিকা আলোচনা করো।
উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : ক্যাভুরের উদ্দেশ্য ও নীতি : (১) নেতৃত্বদান, (২) অস্ট্রিয়া বিরোধিতা, (৩) বিদেশি সাহায্য।
দ্বিতীয় অংশ : প্রথম পর্যায় : (১) ক্রিমিয়ার যুদ্ধ,
(২) প্লমবিয়ার্সের সন্ধি, (৩) অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ, (৪) মধ্য-ইটালির সংযুক্তিসাধন – দ্বিতীয় পর্যায় - মূল্যায়ন
উত্তর>> প্রথম অংশ : ইটালির ঐক্যসাধনে ক্যাভুরের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। ঐতিহাসিকরা তাঁর ভূমিকার গুরুত্ব চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেছেন যে, আধুনিক ইটালির স্রষ্টা ছিলেন ক্যাভুর (Cavour was the maker of modern Italy)।
◆ ক্যাভুরের উদ্দেশ্য ও নীতি : ক্যাভুর ছিলেন— প্রথমত, দেশপ্রেমিক এবং দ্বিতীয়ত, নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের প্রতি আস্থাশীল। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ইটালির স্বাধীনতা অর্জন করে সমগ্র ইটালিকে ঐক্যবদ্ধ করা। এই উদ্দেশ্যকে বাস্তবে রূপায়িত করার জন্য তিনি বাস্তববাদী নীতি গ্রহণ করেছিলেন, যথা—
[১] নেতৃত্বদান : তিনি পরিষ্কার বুঝেছিলেন যে, ইটালির স্বাধীনতা ও ঐক্য-আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ করতে হবে পিডমন্ট-সার্ডিনিয়াকে। তিনি আরও বুঝেছিলেন যে, এই নেতৃত্ব গ্রহণ করার জন্য তাঁর রাজ্যকে সমস্ত দিক দিয়ে উপযুক্ত করে তুলতে হবে। তাই তিনি শাসনতান্ত্রিক অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করেন।
[২] অস্ট্রিয়া বিরোধিতা : ইটালির ঐক্য ও স্বাধীনতার প্রধান শত্রু ছিল অস্ট্রিয়া; সুতরাং অস্ট্রিয়াকে ইটালি থেকে তাড়িয়ে ইটালির ঐক্য প্রতিষ্ঠার নীতি নেন।
[৩] বিদেশি সাহায্য : একক শক্তিতে ইটালি থেকে বিদেশি শক্তিকে তাড়ানো সম্ভব নয় বলে ইটালির পক্ষে বিদেশি রাষ্ট্রের সাহায্য ও সমর্থন আদায়ের পাশাপাশি ইটালির সমস্যাকে আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত করতে উদ্যোগী হন। তিনি ইটালিকে ঐক্যবদ্ধ করে সেখানে নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষপাতী ছিলেন।
দ্বিতীয় অংশ : ইটালির ঐক্য আন্দোলনের ক্ষেত্রে ক্যাভুরের ভূমিকা ছিল-
প্রথম পর্যায় : ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে পিডমন্ট সার্ডিনিয়ার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে ক্যাভুর তাঁর নীতিকে প্রয়োগ করার সুযোগ লাভ করেন ও যে-পদক্ষেপ গ্রহণ করেন তা হল-
[১] ক্রিমিয়ার যুদ্ধ : ক্রিমিয়ার যুদ্ধে যোগদান করে ক্যাভু প্যারিসের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে (১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দ) যোগদান করার সুযোগ পান এবং ওই বৈঠকে সার্থকভাবেই ইটালির সমস্যাকে উপস্থাপিত করেন। তিনি ইংল্যান্ডের ও ফ্রান্সের সহানুভূতি লাভ করতে সমর্থ হন।
[২] প্লমবিয়ার্সের সন্ধি : ফরাসিরাজ তৃতীয় নেপোলিয়নের সঙ্গে এমবিয়ার্সের চুক্তি সম্পাদন (১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দ) করে তিনি সম্ভাব্য অস্ট্রিয়া-বিরোধী যুদ্ধে তাঁর সহযোগিতা লাভের ব্যবস্থা করেন। এই সহযোগিতার জন্য তিনি নেপোলিয়নকে স্যাভয় ও নিস দান করবার প্রতিশ্রুতি দেন।
[৩] অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ : তিনি অস্ট্রিয়াকে নানাভাবে উত্তেজিত করে যুদ্ধে নামতে বাধ্য করেন এবং যুদ্ধে
একের-পর-এক জয়লাভ করতে থাকেন।
নিজের স্বার্থ বিবেচনা করে তৃতীয় নেপোলিয়ন যদি মাঝপথে এককভাবে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে ভিল্লাফ্রাঙ্কার সন্ধির মাধ্যমে যুদ্ধ মিটিয়ে না-ফেলতেন, তাহলে ইটালির ঐক্যসাধন এইসময় অনেক দূর এগিয়ে যেত। ভিল্লাফ্রাঙ্কার সন্ধি দ্বারা পিডমন্ট-সার্ডিনিয়া মাত্র লোম্বার্ডি লাভ করেছিল এবং এ কারণেই ক্যাভুর বিরক্ত হয়ে রাজা ইমান্যুয়েলকে ওই সন্ধি উপেক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তবে ক্যাভুরের পরামর্শ না-মেনে রাজা বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে ওই সন্ধি গ্রহণ করলে ক্যাভুর অসন্তুষ্ট হয়ে পদত্যাগ করেন।
[8] মধ্য-ইটালির সংযুক্তিসাধন :
কয়েক মাসের মধ্যেই ক্যাভুর তাঁর ভুল সংশোধন করে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন (১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ) এবং কিছুদিনের মধ্যেই মধ্য-ইটালির মডেনা, পার্মা, টাস্কানি ও রোমানার জনগণ পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার সঙ্গে সংযুক্তির আন্দোলন শক্তিশালী করে তুললে ও ক্যাভুর তৃতীয় নেপোলিয়নকে স্যাভয় ও নিস ছেড়ে দিয়ে এ রাজ্যগুলি পিডমন্ট-সার্ডিনিয়ার সঙ্গে যুক্ত করে নেন। ফলে ইটালির ঐক্যসাধন অনেকটা স্পষ্ট রূপ নিয়েছিল।
★ দ্বিতীয় পর্যায় : গ্যারিবল্ডির সিসিলি ও নেপলস্ অভিযান এবং তা দখলকে ক্যাভুর কূটনৈতিক কারণে প্রকাশ্যে সমর্থন করতে না পারলেও, গোপনে নানাভাবে সাহায্য করেছিলেন। বিভিন্ন কারণে গ্যারিবল্ডি সিসিলি ও নেপলস্-এর দায়িত্ব রাজা ইমান্যুয়েলের হাতে ছেড়ে দেন এবং এরপর বিপুল গণভোটে নেপলস্, সিসিলি, উমব্রিয়া ও মার্চে (marche) পিডমন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়। শুধুমাত্র রোম ও ভেনেশিয়া ছাড়া সমস্ত ইটালিকে ক্যাভুর ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হন।
◆মূল্যায়ন : সুতরাং দেখা যায় যে, ইটালির ঐক্যসাধনের মূলে ক্যাভুরের ভূমিকা ছিল সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য। ক্যাভুরের নেতৃত্ব, নীতি ও কর্মপন্থায় ইটালির ঐক্য সম্ভব হয়েছিল এবং তিনি এক্ষেত্রে ম্যাৎসিনি ও গ্যারিবল্ডির ভূমিকার মধ্যে সমন্বয়সাধন করেছিলেন। বস্তুতপক্ষে ম্যাৎসিনি, ক্যাভুর ও গ্যারিবল্ডি ছিলেন ইটালির ঐক্যসাধনের তিন মূর্তি। ম্যাৎসিনি ছিলেন ঐক্য আন্দোলনের হৃদয়, ক্যাভুর ছিলেন মস্তিষ্ক আর গ্যারিবল্ডি ছিলেন বাহু।
প্রশ্ন : রক্ত ও লৌহ নীতি বলতে কী বোঝ?
বিসমার্ক কীভাবে এই নীতির সাহায্যে জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন?
উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : রক্ত ও লৌহ নীতি।
দ্বিতীয় অংশ : বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্য : (১) ডেনমার্কের সঙ্গে যুদ্ধ, (২) স্যাডোয়ার যুদ্ধ, (৩) সেডানের যুদ্ধ ,উপসংহার।
উত্তর » প্রথম অংশ : জার্মানিতে জাতীয়তাবাদী ঐক্য আন্দোলনের ব্যর্থতা থেকে কয়েকটি বিষয় প্রমাণিত হয়—
(১) নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে জার্মানির ঐক্যসাধন সম্ভব নয় এবং (২) প্রাশিয়ার নেতৃত্বেই জার্মানির ঐক্য সম্ভব।
তাই প্রাশিয়ায় রাজা প্রথম উইলিয়াম অটোভন বিসমার্ককে প্রধানমন্ত্রীর পদে নিযুক্ত করেন (১৮৬২ খ্রিস্টাব্দ)।
◆রক্ত ও লৌহ নীতি : প্রধানমন্ত্রী বিসমার্কের উদ্দেশ্য ও নীতি ছিল খুব জোরালো। তিনি ছিলেন রাজতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং প্রাশিয়ার রাজতন্ত্রের অধীনে তিনি সমগ্র জার্মানিকে ঐক্যবদ্ধ করার পক্ষপাতী। সামরিক বাহিনীর ব্যয়বরাদ্দের প্রশ্নে রাজার সঙ্গে প্রাশিয়ার সংসদের বিরোধ দেখা দেয়। এ প্রসঙ্গে বিসমার্ক প্রাশিয়ার সংসদের অর্থ সংক্রান্ত কমিটিতে বলেছিলেন—বক্তৃতা
বা সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত নয়, বরং
একমাত্র সামরিক শক্তি বা রক্ত ও লৌহ নীতি' (Policy of Blood and Iron)-র দ্বারাই সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব।
বিসমার্কের এই নীতি রক্ত ও লৌহ নীতি নামে পরিচিত। প্রাশিয়ার প্রতিনিধিসভার সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে উপেক্ষা করেই তিনি সামরিক প্রস্তুতি চালান এবং পরপর তিনটি যুদ্ধের মাধ্যমে জার্মানির ঐক্য
সম্পন্ন করেন।
দ্বিতীয় অংশ :
বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্য : বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্যকরণ ছিল তিন অঙ্কের নাটকের
মতো। রুদ্ধশ্বাসে পর পর তিনটি যুদ্ধের মাধ্যমে দ্রুততালে এই কাজ সম্পন্ন করেন যেমন-
[১] ডেনমার্কের সঙ্গে যুদ্ধ : বিসমার্কের নেতৃত্বে জার্মানির ঐক্যের প্রথম পদক্ষেপ ছিল ডেনমার্কের সঙ্গে প্রাশিয়ার যুদ্ধ।
ডেনমার্কের দক্ষিণে শ্লেজউইগ ও হলস্টেইন নামে দুটি ডাচি জার্মানির রাজ্যসীমার মধ্যে অবস্থিত হলেও তা ডেনমার্কের অধীনে ছিল। এই দুটি প্রদেশ দখলের জন্য বিসমার্ক অস্ট্রিয়ার সঙ্গে মিলিত হয়ে ডেনমার্ক এর বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করে তাকে অনায়াসে পরাজিত করে। এরপর ভিয়েনার সদি অনুসারে স্থির হয় যে, স্লেজউইগ পাবে প্রাশিয়া আর হলস্টেইনের ওপর কর্তৃত্ব
থাকবে অস্ট্রিয়ার।
[২] স্যাডোয়ার যুদ্ধ : ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে অস্ট্রিয়া গ্রেজউইগ- হলস্টেইনের প্রশ্নটি কনফেডারেশনের ডায়েটের নিকট উপস্থিত করলে তা গ্যাস্টিনের চুক্তির বিরোধী এই অভিযোগে প্রাশিয়া হলস্টেইনে সেনা পাঠায়। এর প্রতিবাদে অস্ট্রিয়ার নেতৃত্বে ডায়েট প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধঘোষণা করে। মাত্র ছয় সপ্তাহকাল এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়েছিল। ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে স্যাডোয়ার যুদ্ধে (Battle of Sadowa) অস্ট্রিয়া চূড়ান্তভাবে পরাজিত হয়। এর ফলে জার্মানির ওপর অস্ট্রিয়ার কর্তৃত্ব নষ্ট হয় এবং প্রাশিয়ার কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়।
[৩] সেডানের যুদ্ধ : স্যাডোয়ার যুদ্ধের ফলে জার্মানির ঐক্য আংশিকভাবে সম্পন্ন হয়েছিল। বিসমার্ক বুঝেছিলেন যে, জার্মান জাতির সম্পূর্ণ ঐক্যের পথে ফ্রান্সই প্রধান বাধা। তাই ফ্রান্সকে বিচ্ছিন্ন করে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে বিসমার্ক যুদ্ধের অজুহাত খুঁজতে থাকেন। শীঘ্রই স্পেনের সিংহাসন নিয়ে ফ্রান্স ও প্রাশিয়ার মধ্যে এক বিবাদ উপস্থিত হয়। এই বিবাদের সূত্র ধরেই এমস টেলিগ্রামকে কেন্দ্র করে বিসমার্ক এমন অবস্থা সৃষ্টি করেন যে, ফ্রান্স নিজেই প্রাশিয়ার বিরুদ্ধে
যুদ্ধঘোষণা করে। ইউরোপীয় শক্তিগুলি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ফ্রান্স সহজেই প্রাশিয়ার কাছে পরাজিত হতে থাকে। অবশেষে ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দে সেডানের যুদ্ধে ফ্রান্স (১ সেপ্টেম্বর, ১৮৭০ খ্রিস্টাব্দ) সম্পূর্ণ পরাজিত হয়। ফ্রান্স ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে অপমানজনক শর্তে ফ্রাঙ্কফোর্টের সন্ধি মেনে নিতে বাধ্য হয়। এই সন্ধি অনুযায়ী ফ্রান্স দক্ষিণ জার্মানিতে মেট্জ দুর্গ ও আলসাস-লোরেন অঞ্চল জার্মানিকে হস্তান্তর করলে জার্মানির ঐক্য সম্পূর্ণ হয়।
◆ উপসংহার : এভাবে বিসমার্ক যুদ্ধ ও কুটনীতির সাহায্যে জার্মানির ঐক্য সম্পন্ন করেন। প্রাশিয়ারাজ উইলিয়াম জার্মানির সম্রাট এবং বিসমার্ক জার্মানির প্রধানমন্ত্রী হন।
প্রশ্ন: ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল বর্ণনা করো।
উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ :
(১) ধর্মীয় কারণ, (২) বিপরীতমুখী স্বার্থ, (৩) ইংল্যান্ডের স্বার্থ, (৪) ফ্রান্সের উদ্দেশ্য প্রত্যক্ষ কারণ।
দ্বিতীয় অংশ : ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ফলাফল : (১) প্রত্যক্ষ ফলাফল, (২) পরোক্ষ ফলাফল।
উত্তর> প্রথম অংশ : উনিশ শতকে বলকান অঞ্চল ইউরোপের রাজনীতিতে অশান্ত ঘূর্ণি সৃষ্টি করেছিল এবং ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ছিল এই সংকটজনক পরিস্থিতির পরিণতি।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধের কারণ : মূলত ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কারণে এই যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল।
[১] ধর্মীয় কারণ : প্যালেস্টাইনের জেরুজালেমের গ্রোটো গির্জার কর্তৃত্ব ও পবিত্র স্থানের রক্ষণাবেক্ষণের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গ্রিক ও লাতিন-ক্যাথোলিক ধর্মযাজকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব গড়ে উঠেছিল। গ্রিক খ্রিস্টানদের পক্ষ নেয় রাশিয়া এবং ক্যাথোলিক খ্রিস্টানদের পক্ষ নেয় ফ্রান্স। এভাবে ধর্মীয় প্রশ্নের সঙ্গে বৃহৎ শক্তিধর দেশের বিবাদ যুক্ত হয়ে পড়েছিল। রাশিয়া গ্রিক ধর্মযাজকদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলে তুরস্ক আপত্তি জানায় এবং রাশিয়া যুদ্ধের পথে এগোয়।
[২] বিপরীতমুখী স্বার্থ : সমুদ্রপথে স্থায়ী পথ লাভের জন্য তুরস্কের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে রাশিয়া তুরস্ককে দখল করতে উদ্যোগী হয়। অন্যদিকে ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়ন রাশিয়াকে পরাজিত করে স্বদেশে জনপ্রিয়তা প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। এই পরস্পরবিরোধী সংঘাতে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়ে।
[৩] ইংল্যান্ডের স্বার্থ : রাজনৈতিক, সামরিক ও বাণিজ্যিক কারণে ইংল্যান্ড তুরস্ক সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল এবং এই অঞ্চলে রাশিয়াকে ইংল্যান্ড নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিল।
[৪] ফ্রান্সের উদ্দেশ্য : ফ্রান্স ইউরোপীয় রাজনীতিতে নিজের হারানো মর্যাদাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডের পক্ষে অংশগ্রহণ করেছিল।
প্রত্যক্ষ কারণ : রাশিয়া মোলডাভিয়া ও ওয়ালাচিয়া প্রদেশ দুটি দখল করলে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া প্রভৃতি দেশ ভিয়েনাতে মিলিত হয় এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব (ভিয়েনা নোট) গ্রহণ করে। রাশিয়া এই প্রস্তাব অগ্রাহ্য করলে তুরস্কের পক্ষে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স যোগদান করে এবং ক্রিমিয়ার যুদ্ধ শুরু হয়।
দ্বিতীয় অংশ :
ক্রিমিয়ার যুদ্ধের ফলাফল :
প্রত্যক্ষ ফলাফল : প্রত্যক্ষ ফলাফলের দিক দিয়ে মনে হতে পারে যে, ক্রিমিয়ার যুদ্ধ ছিল একটি নিষ্ফল ও অবাঞ্ছিত যুদ্ধ। ঐতিহাসিকরা এই যুদ্ধকে অনাবশ্যক ও অযৌক্তিক যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ এই যুদ্ধের মাধ্যমে বলকান সমস্যার প্রকৃত সমাধান হয়নি।
পরোক্ষ ফলাফল : পরোক্ষ ফলাফলের গুরুত্ব বিচার করলে ক্রিমিয়ার যুদ্ধকে মোটেই অপ্রয়োজনীয় ও অযৌক্তিক যুদ্ধ বলা চলে না। এই যুদ্ধের ফলেই—(১) বলকান অঞ্চলে রাশিয়ার আগ্রাসন বাধাপ্রাপ্ত হয়।
(২) যুদ্ধের ফলেই তুরস্কের আধুনিকীকরণ সম্ভব হয়।
(৩) এই যুদ্ধের পর বলকান জাতীয়তাবাদ ক্রমশ প্রবল হয়ে ওঠে এবং ইউরোপের দেশগুলির হস্তক্ষেপের ফলে সংকট ঘনীভূত হয়।
(৪) ইটালি ও জার্মানির ঐক্যসাধন এবং বলকান অঞ্চলে জাতীয়তাবাদের অগ্রগতি সব কিছুই ক্রিমিয়ার যুদ্ধ দ্বারা বিশেষ প্রভাবিত হয়েছিল।
(৫) ঐতিহাসিক ডেভিড টমসন মনে করেন, ক্রিমিয়ার যুদ্ধের অপ্রত্যাশিত ফলাফল ছিল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
(৬) বলকান অঞ্চলে তুরস্ক সাম্রাজ্যকে টিকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করা হলেও বলকান অঞ্চলে তুরস্কের কুশাসন সেখানে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
পরিণতি : ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পরিণতি ছিল ভয়াবহ। প্রায় ছয় লক্ষেরও বেশি সেনার জীবনহানি ঘটে। এ ছাড়া বহু সেনা আহত হন। এই সময়ে ফ্লোরেন্স নাইটিঙ্গেল নার্স যুদ্ধক্ষেত্রে নিজ উদ্যোগে সেবা ও ত্রাণ কার্যের দায়িত্ব নেন। এই মহান ব্রত পালনের জন্য তিনি আলোকদীপ হাতে মহিলা' (Lady with the Lamp) নামে পরিচিত হন। ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে নাইটিঙ্গেল-এর আদর্শের ভিত্তিতে জেনেভা কনভেনশনে আন্তর্জাতিক রেড ক্রুশ স্থাপিত হয়।
প্রশ্ন : রাশিয়ার ভূমিদাসপ্রথার অবসানের কারণগুলি আলোচনা করো। দ্বিতীয় আলেকজান্ডারকে মুক্তিদাতা জার বলা হয় কেন ?
উত্তর সংকেত : প্রথম অংশ : ভূমিদাসপ্রথার অবসানের কারণ : (১) অদক্ষতা, (২) ভূস্বামীদের অনিচ্ছা,
(৩) কৃষিক্ষেত্রে ব্যর্থতা, (৪) কর্তৃত্ব হ্রাস, (৫) ভূমিদাসদের ক্ষোভ, (৬) ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয়, (৭) বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব, (৮) দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের ভূমিকা। দ্বিতীয় অংশ :পর্যালোচনা।
উত্তর» প্রথম অংশ : ভূমিদাস প্রথা ছিল রাশিয়ার একটি সুপ্রাচীন অমানবিক প্রথা। এই প্রথার সঙ্গে রাশিয়ার আর্থসামাজিক ব্যবস্থা অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত ছিল। ভূমিদাসদের জীবন—(১) অবর্ণনীয় দুঃখদুর্দশায় পরিপূর্ণ ছিল, (২) তারা জমিদারদের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল এবং (৩) তাদের বিক্রি করা, বন্ধক রাখা, ভাড়া খাটানোর অধিকার জমিদারদের ছিল। রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দে এক আদেশ জারি করে কয়েক যুগ ধরে চলে আসা ভূমিদাসদে দাসত্ব থেকে মুক্তি দিয়ে ভূমিদাসপ্রথার অবসান করেন। এইজন্য তাঁকে মুক্তিদাতা জার বলা হয়।
ভূমিদাসপ্রথার অবসানের কারণ :
[১] অদক্ষতা : উনিশ শতকে রাশিয়ার ধীরে ধীরে শিল্পায়ন শুরু হলে ভূমিদাসদের দিয়ে আগের মতো অর্থনৈতিক প্রয়োজন সিদ্ধ হচ্ছিল না। শিল্পের জন্য অদক্ষ ভূমিদাস অপেক্ষা দক্ষ বেতনভুক শ্রমিক অনেক বেশি প্রয়োজন হয়ে পড়ে।
[২] ভূস্বামীদের অনিচ্ছা : মুদ্রার অর্থনীতি ও বাজারের জন্য প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভূমিদাসদের শ্রমের নিম্নমান স্পষ্ট হয়ে উঠে। ছোটোখাটো ভূস্বামীদের পক্ষে ভূমিদাসদের ভরণপোষণ কঠিন হয়ে পড়লে ভূমিদাসদের ব্যাপারে তাদের অনিচ্ছা প্রকট হয়ে উঠে।
[৩] কৃষিক্ষেত্রে ব্যর্থতা : সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার বিজ্ঞানসম্মত কৃষিপ্রযুক্তি অদক্ষ ভূমিদাসদের পক্ষে প্রয়োগ করা অসম্ভব হয়ে পড়লে তাদেরও প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়।
[৪] কর্তৃত্ব হ্রাস : ক্রিমিয়ার যুদ্ধের পর ভূমিদাসদের ওপর অভিজাত ও জমিদারদের কর্তৃত্ব হ্রাস পায়।
[৫] ভূমিদাসদের ক্ষোভ : জারের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে কৃষকরা উদারনৈতিক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিল। প্রথম নিকোলাসের আমলে চারশোটি কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল যা ভূমিদাসপ্রথার উচ্ছেদকে ত্বরান্বিত করেছিল।
[৬] ক্রিমিয়ার যুদ্ধে পরাজয় : ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রাশিয়ার পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল ভূমিদাসদের নিয়ে গড়ে ওঠা রাশিয়ার সেনাদল। এদের অদক্ষতা, নির্বুদ্ধিতা রাশিয়ায় এদের অপ্রয়োজনীয় করে তোলে।
[৭] বুদ্ধিজীবীদের প্রভাব : রাশিয়ার বহু কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ভূমিদাসপ্রথার অবসানের উদ্দেশ্য কলম
ধরেন। পুসকিন, টলস্টয়, গোগোল, তুর্গেনিভ প্রমুখ ছিলেন এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
[৮] দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের ভূমিকা : উদারনৈতিক শাসক জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার উপলব্ধি করেছিলেন যে, ভূমিদাসপ্রথা যুগোপযোগী নয়, তাই এর উচ্ছেদ করা প্রয়োজন। রাশিয়ায় এভাবেই রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভূমিদাসপ্রথার উচ্ছেদ ঘটে।
● দ্বিতীয় অংশ :
রাশিয়ার ইতিহাসে জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারক ‘মুক্তিদাতা জার' বলা হয়। জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার
অভিজাতদের বাধা তুচ্ছ করে দ্বিতীয় আলেকজান্ডার ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১৯ ফেব্রুয়ারি অমানবিক ভূমিদাসপ্রথা বিলোপ করে ভূমিদাসদের দাসত্বের শৃঙ্খল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তাই তাঁক ‘মুক্তিদাতা জার' বলা হয়।
মুক্তির ঘোষণাপত্রে বলা হয়-
(১) ভূমিদাসপ্রথার অবসান হবে,
(২) ভূমিদাসরা মুক্ত হয়ে স্বাধীন নাগরিকদের মর্যাদা পাবে,
(৩) ভূমিদাসরা পূর্বের প্রভুর যে-জমি চাষ করত তার অর্ধেক তাকে দেওয়া হবে এবং (৪) জমিদাররা ক্ষতিপূরণ পাবে।
◆পর্যালোচনা : ভূমিদাসপ্রথার উচ্ছেদের ফলে প্রথমত, ভূমিদাসরা স্বাধীন নাগরিকের মর্যাদা লাভ করে এবং ভূমিদাসদের বেচাকেনা, ভাড়া খাটানো বন্ধ হয়। দ্বিতীয়ত, কৃষি-শিল্প-বাণিজ্যের অগ্রগতি ঘটে রাশিয়া আধুনিকীকরণের দিকে এগিয়ে যায়। তবে ভূমিদাস উচ্ছেদের ঘটনা ত্রুটিমুক্ত ছিল না, কারণ
(১) ভূমিদাসপ্রথা উচ্ছেদ আইন অনুসারে জমির ওপর কৃষকদের অধিকার স্বীকৃত হয়নি, (২) মুক্তিলাভের পর ভূমিদাসরা জমিদারদের পরিবর্তে 'মির'-এর নিয়ন্ত্রণাধীন হয়ে পড়ে, (৩) অনেকের মতে, ভূমিদাস মুক্তির ঘোষণাপত্র ছিল “নিষ্ঠুর পরিহাস’। তবুও দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের শুভ প্রচেষ্টার
কথা ইতিহাস মনে রেখে তাঁকে মুক্তিদাতা জার হিসেবে স্মরণীয় করে রেখেছে।
প্রশ্ন : ভিয়েনা সম্মেলনের কার্যাবলির একটি সমালোচনামূলক মূল্যায়ন করো।
উত্তর> ভূমিকা : নেপোলিয়নের পতনের পর বিজয় দেশগুলি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেন যা ভিয়েনা সম্মেলন নামে পরিচিত।
উদ্দেশ্য : এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিল—(১) ইউরোপের তীব্র অস্থিরতা দূর করে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি প্রতিষ্ঠা করা,
(২) ইউরোপের পুনর্গঠন ও পুনর্বণ্টন করা। সম্মেলনের নেতারা ন্যায়, সততা প্রভৃতি উচ্চ আদর্শের কথা প্রকাশ্যে বললেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল—(১) বিপ্লব (ফরাসি) প্রসূত ভাবধারা দমন করা এবং (২) ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চল নিজেদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া।
নীতিসমূহ : নিজেদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে এবং শক্তিসাম্যের দিকে লক্ষ রেখে এই সম্মেলনে মূলত তিনটি নীতি অনুসরণ করা হয়; সেগুলি হল – (১) ন্যায্য অধিকার নীতি, (২) ক্ষতিপূরণ নীতি ও (৩) শক্তিসাম্য নীতি।
কার্যাবলি : ন্যায় অধিকার নীতি অনুসারে ফরাসি বিপ্লবের আগেকার বিভিন্ন রাজা বা রাজবংশকে তাঁদের নিজের দেশে পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা হয়। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, প্রাশিয়া প্রভৃতি দেশ কিছু কিছু ভূখণ্ড নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়ে
ক্ষতিপূরণ করে। ফ্রান্সকে প্রতিরোধের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে শক্তির সমতা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
★ ভিয়েনা-সম্মেলনের সমালোচনা : আধুনিক ইউরোপের কূটনীতির ইতিহাসে ভিয়েনা কংগ্রেস একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হলেও সম্মেলনের কাজকর্ম নানাভাবে সমালোচিত হয়েছিল
[১] প্রকৃত সম্মেলন নয় : ভিয়েনা সম্মেলনে ইউরোপের প্রায় প্রতিটি দেশ অংশগ্রহণ করলেও ইংল্যান্ড, রাশিয়া, প্রাশিয়া অস্ট্রিয়া ও ফ্রান্স এই পাঁচটি শক্তি মুখ্য ভূমিকা গ্রহণ করে। সব সিদ্ধান্ত আগে থেকেই গোপন বৈঠক করে ঠিক করে রাখা হত। ফলে যোগদানকারী অন্যান্য দেশগুলির কোনো ভূমিকাই ছিল না। স্বাভাবিক কারণেই এই সম্মেলনকে প্রকৃত সম্মেলন বলা যায় না।
[২] নীতি প্রয়োগের ত্রুটি : ভিয়েনা কংগ্রেসের নেতারা যে-তিনটি নীতি (ন্যায্য অধিকার, ক্ষতিপূরণ, শক্তিসাম্য) প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন তা বাস্তব ক্ষেত্রে সব জায়গায় সমানভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়নি, অর্থাৎ নিজেদের তৈরি করা নীতি নিজেরাই মেনে চলেননি। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় ইটালির ভেনিসে আগের মতো প্রজাতন্ত্র ফেরানো হয়নি।
৩. গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ধ্বংসসাধন : ফরাসি বিপ্লব ইউরোপের দেশগুলিতে যে-জাতীয়তাবাদের জোয়ার এনেছিল, ভিয়েনা চুক্তি প্রণেতারা তা অবজ্ঞা করেছিল লক্ষ লক্ষ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপেক্ষা করে গণতন্ত্র, উদারতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদের ধ্বংসসাধন করেছিল। উদাহরণ হিসেবে জার্মানি ও ইটালির কথা বলা যায়।
৪ নিমর্মতা : ভিয়েনা সম্মেলনের উদ্যোক্তারা নতুন নতুন ভূখণ্ড লাভের জন্য এতটাই লালায়িত ছিল তারা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তিগুলির সম্পত্তি অধিকার করতে একটুও পিছুপা হয়নি।
৫ নিজেদের স্বার্থরক্ষা : সম্মেলনের কর্মকর্তারা নিজেদের স্বার্থরক্ষা করা এবং গোপন চুক্তি কার্যকরী করাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছিল।
৬. প্রতিক্রিয়াশীল : ভিয়েনা সম্মেলনের কর্ণধাররা সকলেই ছিলেন রাজতন্ত্র ও স্বেচ্ছাচারে বিশ্বাসী ও প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিদ। ন্যায্য অধিকার নীতি প্রয়োগের মাধ্যমে তাঁরা ইউরোপে ফরাসি বিপ্লবের পূর্বের অবস্থাকেই ফিরিয়ে আনেন।
৭ অযৌক্তিক : ভিয়েনা-কংগ্রেস পোল্যান্ডবাসীর আকাঙ্ক্ষা পূরণ না-করে পোল্যান্ড ব্যবচ্ছেদ এবং জাতি ধর্ম ঐতিহাসিক বিবর্তন উপেক্ষা করে বেলজিয়ামকে হল্যান্ডের অধীনে স্থাপন—এই দুই ব্যবস্থাই ছিল অযৌক্তিক।
৮ অস্থায়িত্ব : ভিয়েনা সম্মেলনে যেসব চুক্তি ও ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছিল তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
৯ সম্পদ ভাগ করে নেওয়া : ভিয়েনা সম্মেলনের নেতারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেদের মধ্যে বিজিতদের সম্পদ ভাগ করে নিয়েছিলেন।
১০ কালের গতির বিরুদ্ধাচরণ : ভিয়েনা সম্মেলনের প্রতিনিধিরা বিপ্লবপ্রসূত নব আদর্শ ও পুরাতনতন্তের সমন্বয়সাধন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে তাঁরা যুগধর্মকে সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছিলেন।
■ উপসংহার : ভিয়েনা চুক্তির বিপক্ষে যুক্তিগুলি স্বীকার করেও বলা যায়, এই চুক্তি দ্বারা ইউরোপে বহুদিন শাস্তি
ও স্থিতি স্থাপিত হয়। ইউরোপে অন্তত ৪০ বছর শান্তি আসে।
প্রশ্ন: মেটারনিখ ব্যবস্থার পরিচয় দাও। মেটারনিখ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণ কী ছিল?
উত্তর প্রথম অংশ : অস্ট্রিয়ার প্রধানমন্ত্রী প্রিন্স মেটারনিখ ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত ভাবধারাগুলিকে দমন করতে এবং প্রাক্-বৈপ্লবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনতে যেসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তাকেই মেটারনিখ ব্যবস্থা বলা হয়।
মেটারনিখ ব্যবস্থার উদ্দেশ্য : এই ব্যবস্থার উদ্দেশ্যগুলি হল –(১) ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত প্রগতিশীল ভাবনাগুলিকে (উদারতন্ত্র, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ) ধ্বংস করা, (২) ইউরোপের রাজনীতিতে অস্ট্রিয়ার প্রাধান্য অক্ষুণ্ণ রাখা, (৩) ভিয়েনা চুক্তির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষা করা, (৪) শক্তিসমবায়কে ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত ভাবধারাগুলিকে দমন করতে কাজে লাগানো ।
ডেভিড টমসনের মতে, মেটারনিখ ব্যবস্থা ছিল অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যকে রক্ষা করার এক মাস্টার প্ল্যান' হল-
মেটারনিখ ব্যবস্থা : মেটারনিখ ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকগুলি
১ রক্ষণশীলতা : মেটারনিখ ছিলেন রক্ষণশীল। তাঁর মতে, পুরাতনতন্ত্রই হল সম্পদ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রকৃত ভিত্তি। এজন্য তিনি প্রাক-ফরাসি বিপ্লবযুগের বংশানুক্রমিক রাজতন্ত্র, যাজকতন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, গির্জাতন্ত্রের পুনঃস্থাপনের জন্ নানারকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
২ দমননীতি নির্বিচার দমননীতি অনুসরণ করে অস্ট্রিয়ার জাতীয়তাবাদী কার্যকলাপকে কঠোর হাতে দমন করেন।
পাশাপাশি ইতালি ও জার্মানির জাতীয়তাবাদকে দমন করতেও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।
[৩] বিভাজন ও শাসন নীতি ; অস্ট্রিয়া সাম্রাজ্যে জাতিগত ও অন্যান্য সুযোগ গ্রহণ করে তিনি বিভাজন ও শাসননীতি প্রয়োগ করেন।
[৪] বিপ্লবী আন্দোলন দমন: ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মেটারনিখ ব্যবস্থা ইউরোপে আন্তর্জাতিক পুলিশের কাজ করে। মেটারনিখ ইউরোপে বিপ্লবের সম্ভাবনা দূর করার জন্য ইউরোপীয় শক্তিসমবায়ের সাহায্য নেন। দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে বিপ্লবী আন্দোলন দমন করার জন্য সামরিক সাহায্য
প্রেরণ করেছিলেন।
সাফল্য : ১৮১৫ থেকে ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মেটারনিখ পদ্ধতি যে ইউরোপে সাফল্য লাভ করেছিল সে বিষয়ে সন্দেহ নেই—(১) মেটারনিখ পদ্ধতি ইউরোপ থেকে যুদ্ধের সম্ভাবনা দূর করেছিল। (২) ইউরোপে প্রায় চল্লিশ বছর শান্তিরক্ষার চেষ্টা করে মেটারনিখ যুগের দাবিকে পূরণ করেছিলেন। (৩) বহুজাতি অধ্যুষিত অস্ট্রিয়ার সংহতি রক্ষিত হয়েছিল। (৪) এই সঙ্গে ইউরোপের আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি ঘটে।
দ্বিতীয় অংশ :
ব্যর্থতার কারণ : মেটারনিখ ব্যবস্থার ব্যর্থতার কারণগুলি
হল-
১ দূরদর্শিতার অভাব : মেটারনিখের নীতি ছিল প্রতিক্রিয়াশীল, সংকীর্ণ, সুবিধাবাদী ও অদূরদর্শী। এ কারণেই তিনি দমনপীড়ন নীতির মাধ্যমে তার ব্যবস্থাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পারেননি।
২ আন্দোলন দমন : ফরাসি বিপ্লবপ্রসূত নানা ভাবনা বিভিন্ন দেশের গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে তিনি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে দমন করতে সচেষ্ট হয়েছিলেন।
৩. যুগবিরোধী : ফরাসি বিপ্লব যে-নতুন যুগের সূচনা করেছে তা মেটারনিখ বুঝতে পারেননি। তিনি যুগধর্মকে উপেক্ষা করে পিছিয়ে-পড়া পুরোনো নীতিগুলিই আঁকড়ে ধরে রাখেন।
৪ প্রগতিবিরোধী : তাঁর সংস্কারবিরোধী নীতির দ্বারা ইউরোপের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রগতির স্রোত রুখে দিয়ে কূটনীতিক হিসেবে তিনি সফল হলেও রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ব্যর্থ হন ।
৫ সংস্কার বিমুখতা : মেটারনিখ ব্যবস্থার অন্যতম লক্ষ্য ছিল কোনো সংস্কার বা পরিবর্তন না করেই শাসন চালানো বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখা। তাঁর এই অতিরিক্ত রক্ষণশীলতা ও সংস্কারবিমুখতা ছিল তাঁর ব্যবস্থা ধ্বংসের অন্যতম কারণ।
৬ ফেব্রুয়ারি বিপ্লব : ১৮৪৮ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব ও অস্ট্রিয়া ও জার্মানিতে মেটারনিখ ব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
৭ অসহযোগিতা : মেটারনিখ ব্যবস্থাকে ইউরোপের সমস্ত দেশ চোখ বন্ধ করে মেনে নেয়নি। কারণ, ইংল্যান্ড ১৮২২ খ্রিস্টাব্দে, রাশিয়া ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দে এবং ফ্রান্স ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে এই নীতি থেকে সরে যায়।
উপসংহার : মেটারনিখের ব্যর্থতা সত্ত্বেও এ কথা অনস্বীকার্য যে, যতদিন মেটারনিখের হাতে ক্ষমতা ছিল, ততদিন ইউরোপে শান্তি বজায় ছিল। ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের আঘাতে তিনি অস্ট্রিয়া ছেড়ে ইংল্যান্ডে পালিয়ে যান। তাঁর ব্যর্থতা সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, হয় অনেক আগে এই পৃথিবীতে এসেছি, নয় অনেক পরে এসেছি।
