পঞ্চতন্ত্রের ১২ টি বাছাই করা গল্প - Online story

Friday, 29 May 2026

পঞ্চতন্ত্রের ১২ টি বাছাই করা গল্প

 


পঞ্চতন্ত্রের বারোটি বাছাই করা গল্প


লোভী শিয়ালের কীর্তি

এক ব্যাধ বাস করত এক বনে। একদিন শিকারের সন্ধানে ঘুরতে ঘুরতে সে গভীর বনে প্রবেশ করল। হঠাৎ সে দেখল একটা বুনো শুয়োর দাঁড়িয়ে রয়েছে।

ব্যাধ ছিল খুব সাহসী। শুয়োর তাকে আক্রমণ করার আগেই সে শুয়োরের দিকে ছুঁড়ল তির। শুয়োরটি তিরবিদ্ধ হয়ে গভীরভাবে আহত হলেও, রেগে গিয়ে ছুটে এসে সে ব্যাধের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুহুর্তের মধ্যেই ব্যাধের পেটটা চিরে শুয়োরটা ব্যাধকে মেরে ফেলল। কিছুক্ষণ পরে আহত শুয়োরটিও ঢলে পড়ল মৃত্যুর কোলে।

এইসময় খাবারের সন্ধানে একটি শিয়াল সেই পথ দিয়ে যাচ্ছিল। শিয়াল ভাবল বহু ভাগ্য করে আজ একসঙ্গে এত সুস্বাদু খাবার পেয়েছি। দিনকয়েকের জন্য নিশ্চিন্ত, বেশ কয়েকদিন আর শিকারে বেরোতে হবে না। এই সব খাবারে আমার অনেকদিন চলে যাবে। শিয়াল সব খাবার শুঁকতে লাগল, ব্যাধের ধনুকের ছিলাটিও বাদ গেল না।

শিয়াল ভাবল- ধনুকের ছিলা দিয়েই তার ভোজ শুরু করবে। বড়ো খাবার দুটোর একটাকে পরের দিন খাওয়া শুরু করবে।

ধনুকের ছিলাতে কামড় বসানোর সঙ্গে সঙ্গেই ছিলাটি গেল ছিঁড়ে। বুঝে ওঠার

আগেই ধনুকের ছুঁচলো আগা শিয়ালের তালু ফুঁড়ে আচমকা মাথার মাঝখান দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। লোভী শিয়ালের যন্ত্রণায় চিৎকার করতে করতে মৃত্যু ঘটল।



পঞ্চতন্ত্রের হিতবচন

১। গোপন কথা গোপন না রাখতে পারলে পরিণাম হয় অত্যন্ত ভয়াবহ।

২। যারা বিচক্ষণ, জ্ঞানী, তারা নিজের বিচার বিবেচনা দিয়ে সর্বদা যাচাই করে কোনটা ঠিক, কোনটা ভুল।

৩। নিজের কথা না ভেবে অন্যের জন্য যারা নিজের জীবন উৎসর্গ করে, তারাই প্রকৃত মানুষ।

৪। অতিলোভের পরিণাম সর্বদাই ভয়াবহ।

৫। বুদ্ধিই বিপদের রক্ষাকবচ।



        ★লম্বকর্ণ ও হাতির দল★

বিশাল এক বন। সেই বনে বাস করত চতুর্দন্ত নামে এক সর্দার হাতি। বনের সকল হাতিরা তাকে খুব সম্মান করত। একবার হল কী হাতিরা পড়ল মহাবিপদে। পরপর কয়েকবছর বৃষ্টি হল না, এর ফলে নদী, ডোবা পুকুর সব শুকিয়ে গেল। জল না পান করতে পেরে হাতিরা ছটফট করতে লাগল।

বাচ্চাদের কষ্ট দেখে অন্যান্য হাতিরা এসে সর্দার হাতিকে বলল, মহারাজ জলকষ্টে বাচ্চাদের প্রায় মৃত্যু হবার অবস্থা। একটা জলাশয় অবিলম্বে খোঁজ করতে হবে যাতে বাচ্চারা জলপান করতে পারে।

চতুর্দন্ত এই কথা শুনে বহুক্ষণ চিন্তা করে বলল, অনেকটা দূরে একটা ঝিল আছে, সারা বছর জলে ভরা থাকে। চলো সবাইকে নিয়ে ওইখানেই যাওয়া যাক।

সেই দিনই সকলে রওনা হয়ে তিন-চারদিন পর সেই ঝিলের  কাছে উপস্থিত হল। ঝিলের টলটলে জল দেখে সকলের প্রাণ গেল জুড়িয়ে। মহানন্দে সব হাতিরা স্নান করে, জল পান করে শরীরের কষ্ট দূর করল।

এরপর সকলে ফিরে গেল বনের দিকে।

ওই ঝিলের চারপাশে মাটির গর্তে ছিল বহু খরগোশের বাস। হাতিদের পায়ের চাপে তাদের গর্তগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়াতে বহু খরগোশ আহত হল, কেউ কেউ প্রাণও হারাল।

হাতিরা খরগোশদের এই বিপদের কথা জানতেও পারল না।

খরগোশরা একসঙ্গে গোল হয়ে বসে আলোচনা করতে লাগল কীভাবে হাতিদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচানো যায়। এই ঝিলের মিষ্টি জল খেতে হাতিরা তো আবার আসবেই। তখন খরগোশদের প্রাণ বাঁচানো কঠিন হবে।

খরগোশদের মধ্যে একজন চতুর খরগোশ ছিল। লম্বকর্ণ নামের এই খরগোশ চুপচাপ বসে ভাবছিল। পূর্ণিমার রাত, চাঁদের আলো ঝিলের জলে পড়ে ঝিলমিল করছে।

হঠাৎ সে বলে উঠল, একটা উপায় পাওয়া গেছে। এই চাঁদই হাতিদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করবে।

সকল খরগোশ তো আনন্দে ডগমগ হয়ে বলল, উপায়টা বলবে ভাই। লম্বকর্ণ বলল, চাঁদ হল রাতের রাজা। সেই চাঁদের কোলে বসে আছে আমাদের রাজা বিজয়দস্ত।

বুদ্ধি দিয়ে ওই নাম দিয়েই বিপদ থেকে মুক্তি পাব আমরা।

যাই গিয়ে হাতি সর্দারকে নিয়ে আসি, লম্বকর্ণ বলে উঠল। লম্বকর্ণ হাতিদের চলার পথ ধরে বনের দিকে চলল।

হঠাৎ লম্বকর্ণ দেখল, ঝিল থেকে খানিকটা দূর একটা জায়গায় হাতিরা বিশ্রাম করছে। লম্বকর্ণ সেখানে গিয়ে একটা উইঢিবির ওপরে দাঁড়িয়ে বলল, আমি হচ্ছি খরগোশের রাজা। নাম আমার বিজয়দত্ত শশক। প্রাণের ভয় থাকে তো শিগগির এই চাঁদ-ঝিলের এলাকা থেকে পালিয়ে যাও। ভগবান চন্দ্র আমায় পাঠিয়েছেন।

লম্বকর্ণ বলল, ঝিলে যাওয়ার পথে তুমি ও তোমার অন্যান্য হাতিরা অনেক খরগোশ মেরে ফেলেছ। খরগোশরা চন্দ্রদেবের প্রজা। ঝিলের দিকে আর কোনোদিন যাবে না।

চন্দ্রদেব খরগোশদের সান্ত্বনা দেবার জন্য ক-দিন ঝিলে বসবাস করছেন। আমাকে তিনি তোমার কাছে পাঠিয়েছেন। চতুর্দন্ত প্রচণ্ড ভয় পেয়ে সেই মুহুর্তেই চন্দ্রদেবের কাছে যেতে চাইল।

লম্বকর্ণ হাতি সর্দারকে নিয়ে চলল ঝিলের দিকে। ঝিলের কাছে পৌঁছে চতুর্দন্তকে দেখাল লম্বকর্ণ, ঝিলের জলে চাঁদের ছায়া পড়েছে। প্রভু এখন ধ্যান করছেন, বলে উঠল লম্বকর্ণ। কোনোরকম শব্দ না করে প্রণাম করে চলে যাও।

চতুর্দন্ত ভয় পেয়ে হাঁটু মুড়ে চন্দ্রদেবকে বারবার প্রণাম করতে লাগল। লম্বকর্ণ ভাবল মহাবিপদ। এই মুহুর্তেই হাতির রাজাকে এখান থেকে সরাতে হবে।

ছোট্ট একটা মাটির ঢেলা জলে ছুঁড়ল লম্বকর্ণ। চাঁদের ছায়া জলে ঢেউ ওঠার জন্য থরথর করে কাঁপতে লাগল।

চাঁদের ছায়া দেখিয়ে লম্বকর্ণ বলল চতুর্দন্তকে, চন্দ্রদেব তোমায় দেখতে পেয়েছেন।

শিগগির এই জায়গা থেকে পালাও। রাগে কাঁপছেন চন্দ্রদেব।

ভয়ে কাপতে কাপতে চতুর্দন্ত ছুটে চলল বনের দিকে। সেই রাত্রেই দলবল নিয়ে হাতিরাজ অন্য বনে চলে গেল।

খরগোশরা এই মহাবিপদ থেকে মুক্তি পেয়ে মহানন্দে দিন কাটাতে লাগল। লম্বকর্ণর বুদ্ধির সকলেই তারিফ করল।


   ★ব্রাহ্মণ ও তিন ধূর্ত★

মিত্রশর্মা নামে এক ব্রাহ্মণ বাস করত এক নগরে। একদিন তিনি পুজোআচ্চা করে যজমান বাড়ি থেকে একটি পাঁঠা নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে হঠাৎ তাঁর দেখা হল তিন ধূর্তের সঙ্গে। এদের নাম হল খুল্লক, চণক ও তিলক। লোক ঠকাতে এদের জুড়ি মেলা ভার। শীতের দিন। হৃষ্টপুষ্ট পাঁঠাটিকে দেখে খুব লোভ হল

তাদের। তিন ধূর্ত ঠিক করল যেভাবেই হোক পাঁঠাটিকে হাতিয়ে মহাভোজ করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে তিনজনে তাদের পরিকল্পনা করে নিল। মিত্রশর্মা চলেছেন পথ দিয়ে । হঠাৎ হাজির হল খুল্লক। দু-হাত জড়ো করে বলল ---

ঠাকুরমশাই, করেন কী আপনি।

ব্রাহ্মণ হয়ে একটা নোংরা

কুকুরকে নিয়ে চলেছেন কাঁধে।

লোকে দেখলে যে নিন্দা করবে।

মেলা ফ্যাচফ্যাচ কোরো না তো- বলে উঠল ব্রাহ্মর। কুকুর হবে কেন? যজমান বাড়ি থেকে পাঁঠা দিয়েছে। তাই নিয়ে চলেছি। রাস্তা ছাড়ো দেরি হয়ে যাচ্ছে।

খুল্লক বলল, ভুল হয়ে গেছে ঠাকুরমশাই। এটা যে পাঁঠা তা ঠিক বুঝতে পারিনি।

কিছুদূর যাবার পর হাজির হল চণক। সে বলে উঠল— আপনি না ব্রাহ্মণ, একটা মরা বাছুরকে নিয়ে চলেছেন কাঁধে করে।

তুমিও দেখছি চোখের মাথা খেয়েছ— বলে উঠলেন ব্রাহ্মণ। এটা মরা বাছুর নয়। একটা জ্যান্ত ছাগল।

এই বলে মিত্রশর্মা চলতে লাগল। মনে মনে কিন্তু তিনি ভাবতে লাগলেন, কী

নিয়ে চলেছি আমি? মরা বাছুর, কুকুর না ছাগল ?

দু-দুটো লোক আমাকে অন্য কথা বলল। তারা কি ভুল দেখেছে।

আরও কিছুদূর যাবার পর ব্রাহ্মণের দেখা হল তিলকের সঙ্গে। ফিচকে হাসি হেসে বলে উঠল সে— দিনকাল যে কী পড়েছে কে জানে। ঠাকুরমশাই, আপনি কিনা একটা গাধার বাচ্চা নিয়ে চলেছেন কাঁধে করে। সকলে তো হাসবে আপনাকে দেখে।

এমনিতেই ছাগলকে নিয়ে আগে দুজন ধূর্তের দু-রকম কথা শুনে ব্রাহ্মণের মাথার ঠিক ছিল না। এই বার মিত্রশর্মা রেগে গিয়ে পাঁঠাকে মাটিতে নামিয়ে হনহন করে হাঁটা দিল বাড়ির দিকে।

এই সুযোগের অপেক্ষায় ছিল তিন ধূর্ত। দৌড়ে এসে পাঁঠাটাকে কোলে তুলে নাচতে নাচতে চলল তিনজনে বাড়ির দিকে। আজ যে পাঁঠার কল্যাণে তাদের মহাভোজ।


পিঁপড়ে আর কেউটে


পিঁপড়ের বিশাল একটি বন ছিল। সেখানে একটি উইঢিবিতে বাস করত অতিদর্প নামে এক কালকেউটে। ভয়ঙ্কর এই সাপ তার গর্ত থেকেই সুযোগ মতো ইঁদুর, ছুঁচো, ব্যাঙ খেত।

ভয়ে কেউ যেত না ওই উইঢিবির পাশ দিয়ে।

বিভিন্ন রকম পোকা, জীবজন্তু খেয়ে মহানন্দে তার দিন কাটছিল। একদিন সে গর্ত থেকে বেরুবার জন্য একটা সরু রাস্তা নিল। রাস্তাটা সরু হওয়ায় বেরুতে তার কষ্ট হচ্ছিল খুব। অনেক কষ্ট করে সে যখন বাইরে এল গোটা শরীর তার ক্ষতবিক্ষত, রক্তও পড়ছে। ক্লান্ত হয়ে পড়ল সে।

মুহুর্তের মধ্যে রক্তের গন্ধ পেয়ে পিঁপড়ের দল তাকে ধরল হেঁকে। পিঁপড়ের কামড়ে অস্থির হয়ে মাটিতে গড়াগড়ি খেতে লাগল অতিদর্প। বহু চেষ্টা করেও সে নিজের শরীর থেকে ছাড়াতে পারল না পিঁপড়েদের।

অতিদর্পের শরীরের চাপে মারাও পড়ল অনেক পিঁপড়ে। রাগে না পালিয়ে অন্যান্য পিঁপড়েরা তার মাংস খুবলে খেতে লাগল। যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে অস্থির হয়ে মড়ার মতো রইল পড়ে অতিদর্প কালকেউটে।

খবর পেয়ে আরও পিঁপড়ের দল হাজির হল। মহানন্দে কামড়াতে লাগল তারা অতিদর্পকে। শক্তিশালী হলেও পিঁপড়েরা সংখ্যায় বেশি হওয়ার জন্য অসহায় হয়ে পড়ল অতিদর্প। পিঁপড়েদের কামড় সহ্য করতে করতে নিথর হয়ে পড়ল অতিদর্প।

পিঁপড়েদের হাতেই মরণ হল শক্তিশালী, অহংকারী কালকেউটের।


  ★কপোত-কপোতী ও ব্যাধ★

এক ভয়ংকর ব্যাধ একটি বনে শিকার করে বেড়াত। বনের পশুপাখিরা তাকে খুব ভয় পেত। ব্যাধের নিষ্ঠুর স্বভাবের জন্য কেউ তাকে পছন্দ করত না।

বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন কেউই তার ছিল না। ব্যাধ সারাদিন একটা

শক্ত লাঠি, পশুপাখি ধরার জাল আর খাঁচা নিয়ে ঘুরে বেড়াত বনে বনে।

একদিন সে একটা পায়রাকে ফাঁদে ফেলে খাঁচায় পুরল। আরও শিকারের জন্য সে ঘুরতে লাগল বনে।

হঠাৎ কালো মেঘ করে শুরু হল প্রবল বৃষ্টি। বন থেকে বেরোবার চেষ্টা করেও

মুষলধারে বৃষ্টি পড়ার জন্য ব্যাধের পক্ষে তা সম্ভব হল না।

ছুটে গিয়ে একটা গাছের তলায় ব্যাধ আশ্রয় নিল। বৃষ্টি চলল সন্ধ্যা পর্যন্ত। বৃষ্টিতে ভিজে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল ব্যাধ। খিদে তেষ্টায় ব্যাধের খুব কষ্ট হতে লাগল।

সে তখন যে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে ছিল, সেই গাছকে উদ্দেশ্য করে বলল, এই গাছে কেউ বাস করলে আমার প্রাণ রক্ষা করো। আমি অত্যন্ত বিপদে পড়েছি। সেই গাছে

বাস করত এক কপোত-কপোতী। দুর্ভাগ্যক্রমে ব্যাধের খাঁচায় বন্দি ছিল কপোতী। কপোত বিলাপ করছিল, হায় হায় আমার প্রিয় কপোতী কোথায় আছে কে জানে। এত বৃষ্টি হল, তুমি কোথায়? কপোতী ছাড়া আমার জীবন অন্ধকার।

খাঁচায় বন্দি কপোতী বলে উঠল, দুঃখ কোরো না, দুর্ভাগ্যক্রমে আজ আমি খাঁচায় বন্দি। ব্যাধের ওপর রাগ কোরো না। ব্যাধ আজ তোমার অতিথি। তাকে সেবার ব্যবস্থা করো। যাতে তার কষ্ট নিবারণ হয় তার চেষ্টা করো।

কপোত এই কথা শুনে অতিথিকে বলল, কীভাবে আমি তোমার সেবা করতে পারি বলো। ব্যাধ কপোত-কপোতীর সব কথা শুনল। কপোতকে সে বলল, আমার শীত দূর করার ব্যবস্থা করো।

কপোত তখন কোথা থেকে একটি জ্বলন্ত কাঠ নিয়ে এল এবং তারপর শুকনো ডাল পাতা ভেঙে ফেলল। আগুন জ্বলে উঠল। খুশি হয়ে ব্যাধ হাত-পা সেঁকতে লাগল।

কপোত ব্যাধকে বলল, তুমি ক্ষুধার্ত। তোমায় দেবার মতো কোনো খাদ্য আমার কাছে নেই। যাই হোক তোমার খাবার ব্যবস্থা করছি। এই বলে জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দিল কপোত কপোতকে আগুনে পুড়তে দেখে ব্যাধের চোখ জলে ভরে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সে কপোতের ঝলসানো শরীরটি আগুনের ভেতর থেকে বের করে নিয়ে এল। দুঃখে শোকে বিলাপ করতে লাগল ব্যাধ, আমার দোষে আজ এই অবস্থা হল কপোতের। সারা জীবন আমি পশুপাখি শিকারই করলাম, নিষ্ঠুর কাজকর্মই আমার সঙ্গী। আর কোনোদিনও কাউকে হত্যা করব না। অপরের সেবাই হবে আমার জীবনের ব্রত।

ব্যাধ সেই মুহুর্তে কপোতীকে খাঁচা থেকে মুক্তি দিল। কপোতের ঝলসানো দেহ দেখে শোকে আকুল হয়ে বলল কপোতী, এই জীবন রাখা বৃথা। প্রাণাধিক প্রিয় কপোতই যখন নেই তখন জীবন রেখে লাভ নেই। এই বলে মুহুর্তের মধ্যে আগুনে ঝাঁপ দিল কপোতী।

আগুনে দগ্ধ কপোত-কপোতীর প্রাণহীন শরীর দুটিকে বের করে মাটির তলায় চাপা দিল ব্যাধ ।

এরপর থেকে আর কোনোদিনও ব্যাধ পশুহত্যা করেনি। অপরের সেবা করেই জীবন কাটতে লাগল ব্যাধের। ব্যাধ বুঝল হত্যা নয় প্রাণরক্ষাই হল সুখের চাবিকাঠি।



  ★রাজপুত্র রাজকন্যা ও দুই সাপ★

দেবশক্তি নামে এক রাজা এক রাজ্যে বাস করতেন। তাঁর একমাত্র পুত্র সুন্দর। নাম অনুযায়ী ছিল তার চেহারা। সোনার বর্ণ ছিল তার। সুন্দর স্বাস্থ্য। সর্ব বিদ্যায় পারদর্শী।

সুখেই দিন কাটছিল রাজার। হঠাৎ হল কী, রাজপুত্রের ষোলো বছর বয়স হওয়ার পর সে দিনে দিনে শুকিয়ে যেতে লাগল।

কত বদ্যি এল। বিভিন্ন রকম ওষুধ ও জড়িবুটি দিল। কোনোই ফল হল না। এল ওঝার দল। বহু ঝাড়ফুঁক করা হল। রাজকুমার সুন্দরের চেহারার কোনো পরিবর্তনই দেখা গেল না। চিন্তায়, ভাবনায় রাজা হয়ে পড়লেন অস্থির।

সুন্দরের নিজের মনেও রইল না বাঁচার আশা। বিরক্ত হয়ে একদিন সে পাড়ি দিল বিদেশে। কয়েকদিন পরে সুন্দর পৌঁছল বলি নামে এক দেশে। ভবঘুরের মতো সুন্দর ঘুরে বেড়াতে লাগল সেই দেশে। রূপবতী ও প্রজ্ঞাবতী নামে রাজার দুই তরুণী কন্যা।

মাতৃহারা মেয়েদের খুব যত্নে মানুষ করেছেন রাজা। রূপে গুণে দু-বোনই যেন লক্ষ্মী ও সরস্বতী।

প্রজ্ঞাবতী ও রূপবতী পরমাসুন্দরী ও সুকণ্ঠের অধিকারী। দু-বোন রোজ সকালে স্নান করে মন্দিরে যায় পুজো দিতে। রূপবতী রাজার কাছে এসে বলে আপনার রাজত্বের জয় হোক।

খুশি হয়ে রাজা তাকে আশীর্বাদ করেন।

প্রজ্ঞাবতী রাজার কপালে এঁকে দেয় প্রসাদী রক্তচন্দনের ফোঁটা। সে বলে, সকলে কর্মফল ভোগ করে। আপনিও আপনার কর্মফল ভোগ করুন।

ছোটো মেয়ের কথা রাজার মোটেই ভালো লাগল না। ওইটুকু মেয়ে বাবাকে আসে কর্মফল নিয়ে জ্ঞান দিতে।

একদিন রাজা বলি রেগে গিয়ে বললেন, বড্ড অহংকার প্রজ্ঞাবতীর। মন্ত্রীকে তিনি আদেশ দিলেন ছোটো মেয়ের সঙ্গে কোনো বিদেশির বিয়ে দিতে। কর্মফল ভোগ করুক।

ওইদিনই ভবঘুরে সুন্দরকে ধরে এনে প্রজ্ঞাবতীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হল।

পরের দিন প্রজ্ঞাবতী তার স্বামীকে নিয়ে দেশ ছেড়ে রওনা দিল। তিনদিন পর সুন্দর ও প্রজ্ঞাবতী হাজির হল অন্য দেশে। ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় ক্লান্ত হয়ে এক দিঘির পাড়ে বটের ছায়ায় বিশ্রাম করতে লাগল তারা। খাবার আনতে গেল প্রজ্ঞাবতী, তার স্বামী সুন্দরকে রেখে। সুন্দর কিছুক্ষণের মধ্যেই পড়ল ঘুমিয়ে। এইসময় কাছেই একট উইঢিবির সাপ বলে উঠল রাজপুত্র সুন্দরের দিকে তাকিয়ে যেখানে তার মুখে একটা সাপ বলে উঠল রাজপুত্র সুন্দরের দিকে তাকিয়ে যেখানে তার মুখে একটা সাপ ফোঁস ফোঁস করছিল- 'লজ্জা করে না, রাজপুত্তুরের শরীরে বাসা বেঁধে তাকে শুকিয়ে ফেলছিস। তোর মরণ কিসে আমি জানি। পুরোনো টক আমানির মধ্যে সরষে ফুটিয়ে রাজপুত্তুরকে খাওয়ালেই তুই অকা।'

রাজপুত্তুরের মুখের সাপ বলল উইটিবির সাপকে, 'তুই তো দুই কলসি মোহরের ওপর বাসা করে আছিস। ঢিবির গর্তে খানিকটা তেল বা জল ঢেলে দিলেই তোর মৃত্যু।'

এরমধ্যেই রাজকন্যা ফিরে এসেছে। সে আড়াল থেকে সব ঘটনা দেখল। সাপ দুটো অদৃশ্য হতেই সে খড়কুটো জ্বালিয়ে এক মালসা তেল গরম করল।

স্বামীর ঘুম ভাঙিয়ে সব কিছু বলল প্রজ্ঞাবতী। এরপর গেরস্থর বাড়ি থেকে নিয়ে এল আমানি ভাত আর সরষে।

সাপের কথামতো ফোটানো, সরষে মেশানো আমানি ভাত খাওয়াতেই সুন্দরের অবসাদ ভাব কেটে গিয়ে শরীর হল চনমনে। আবা আগের মতো হয়ে উঠল সুন্দর।

এরপর তারা ফোটানো তেল উইঢিবির সাপের গর্তে ঢালল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ফোঁসফোঁস শব্দ করতে করতে মৃত্যু হল সাপের।

কিছুদিন সেখানে থেকে উইঢিবি খুঁড়ে সমস্ত মোহর বার করে প্রজ্ঞাবতী ও সুন্দর রওনা হল সুন্দরের রাজ্যের উদ্দেশ্যে।



  ★ কেউটে ও ব্যাঙ★

এক বনে বাস করত একটি ভয়ংকর কেউটে। বয়স হয়ে যাওয়ার জন্য শিকার ধরে খাওয়ার বল নেই তার শরীরে। ঠিকমতো না খাওয়ার জন্য শরীরও দুর্বল। আগের মতো ব্যাঙ্ক ধরেও খেতে পারে না কেউটে।

একদিন হঠাৎ কেউটের দেখা হল ব্যান্ডেদের রাজার সঙ্গে। মনের

দুঃখে সে ব্যাঙ মহারাজকে বলল,

পাপ তো অনেক করেছি জীবনে,

তার তো কোনো ক্ষমা নেই। শেষ

কিছুদিন পুণ্যের কাজ করে পাপ

কিছুটা মুছে যেতে চাই।' ব্যাঙের সঙ্গে সাপের চিরকালের শত্রুতা। এই সব সত্ত্বেও ব্যাঙ মহারাজ কেউটেকে বলল, বলো, তোমার কী অভিলাষ ?

অত্যন্ত খুশি হয়ে বলল কেউটে, আমার সারাজীবনের পাপকর্মের কথা বলেছিলাম এক মুনিকে। তিনি আমায় বলেছেন যে তোমার বাকি জীবনটা যদি ব্যাঙ মহারাজকে মাথায় নিয়ে ঘুরতে পারো তবেই তোমার পাপ মুছে যাবে।

ব্যাঙ মহারাজ তো ভারি খুশি। সাপের মাথায় চড়ে দিব্যি ঘোরা যাবে আর কেউটের ইচ্ছাও পুরণ হবে।

ব্যাঙ মহারাজকে সাপের মাথায় ঘুরতে দেখে অন্যান্য সাপেরা রেগে অগ্নিশর্মা। যে ব্যাঙ কিনা সাপের খাদ্য, সেই ব্যাঙকে মাথায় নিয়ে ঘোরা- এ আবার কেমন ব্যাপার। অন্যান্য সাপেরা কেউটেকে বলল।

'আছে আছে— একটা বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই এই কাজ করছি আমি', বলল কেউটে।

সারাদিন ব্যাঙ মহারাজকে নিয়ে ঘুরে সন্ধ্যায় ক্লান্ত কেউটে বলল, কিছু একটা উপায় বলুন, ক্ষুধায় তৃষ্ণায় আমি মরে যাচ্ছি।'

ব্যাঙ রাজা ভাবল, সত্যিই তো, বেচারির কত কষ্ট, সারাদিন তো আমায় মাথায় করে ঘুরে বেড়ায়, কিছুই খায় না, এমনি করে তো কেউটের মৃত্যু হবে।

কেউটেকে ব্যাঙ মহারাজ ছোটো ছোটো ব্যাঙদের ধরে খাবার অনুমতি দিল।

এরপর থেকে মনের আনন্দে কেউটে

ছোটো ব্যাঙদের ধরে খেতে লাগল। ছোটো ব্যাঙেরা শেষ হলে কেউটের শিকার হল বড়ো ব্যাঙেরা। অবশেষে ব্যাঙ মহারাজও হল কেউটের শিকার। নিজের মূর্খতায় প্রাণ গেল ব্যাঙ মহারাজের।


পঞ্চতন্ত্রের হিতবচন

১। লোভ থাকা ভালো কিন্তু অতিলোভের ফল হয় মারাত্মক।

২। হয়কে নয় এবং নয়কে হয় করে যারা, তাদের কাছে থাকা উচিত নয়।

৩। একজনকে ত্যাগ করেও যদি পরিবার বা বংশের স্বার্থ রক্ষা পায় তবে তা করাই

যুক্তিসম্মত।

৪। অশুভ চিন্তা মহাপাপ। এই চিন্তার বশে মানুষ শত্রুকে বন্ধু করে, বন্ধুকে হত্যা পর্যন্ত করতে দ্বিধা করে না।

৫। বন থেকে জানোয়ার তুলে আনা যায়, জানোয়ারের মন থেকে বন তুলে ফেলা যায় না।


  ★★ কুমির ও বানর★★

এক সময়ে একটি বনের কাছে নদীর ধারে এক জাম গাছে একটা বানর বসবাস করত। সেই গাছে সুগোল নিটোল রসালো টসটসে রাশি রাশি মিষ্টি জাম হত। বানরটি মনের আনন্দে জাম খেত।

এক কুমির থাকত নদীতে। কুমিরের সঙ্গে বানরের খুব বন্ধুত্ব। কুমিরটি রোজ বানরের কাছে আসত মিঠে জাম খেতে। সারাদিন ধরে গল্প করে, জাম খেয়ে সন্ধের সময় কুমির ফিরে যেত বাড়িতে। বাড়ি ফেরার সময় কুমির তা বউয়ের জন্য জাম নিয়ে যেত। এইভাবে দিন যায়। একদিন কুমির বেরোবার সময় তার বউ তাকে ডেকে বলল,

আচ্ছা, রোজ রোজ এই এত চমৎকার ফল কোথা থেকে আনো বলো তো?

কুমির বলল, নদীর ধারে জামগাছে এক বানর থাকে। সে-ই আমাকে জাম দেয়।

আর তোমার জন্যও জাম উপহার পাঠায়।

কুমিরের বউ ছিল খুব লোভী ও শয়তান। সে ভাবল, জামফল যদি এত মিষ্টি হয় তবে দিন-রাত জাম খেয়ে খেয়ে বানরের কলেজটা পুরোপুরি অমৃত হয়ে গেছে।

সে ঠিক করল যেভাবেই হোক বানরের কলজে খেতে হবে।

কুমির বউ একদিন খুব অসুস্থ হবার ভান করল। অসুস্থ বউকে দেখে কুমিরের খুব দুঃখ হল। সে বউকে জিজ্ঞাসা করল, তোমার কষ্ট কী করলে সারবে বলো, তুমি

যা বলবে আমি তাই শুনব।

কুমির বউ বলল, ওই বানরের কলজে আমার চাই। নইলে আমি মরব।

কুমিরের হল উভয় সংকট - বন্ধুর কলজে না আনলে স্ত্রীকে হারাতে হবে, আবার স্ত্রীর প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে বন্ধুকে চিরতরে হারাতে হবে।

পরের দিন কুমির গেল বানরের কাছে। বানরকে কুমির বলল, 'দেখো বন্ধু, তুমি রোজ আমাকে এত যত্ন করো। আমার বউ বলেছে, রোজ রোজ বন্ধুর বাড়ি থেকে খেয়ে আসো, একদিন তাকে নেমন্তন্ন করতে পাবরো না?

আমার বাড়ি আজ তোমাকে নিয়ে যাবা জন্য আমার বউ অনেক করে বলেছে। আজ তোমাকে আমার বাড়ি যেতেই হবে।'

বানর খুব খুশি হয়ে বলল, যেতে তো খুবই ইচ্ছে করছে কিন্তু তুমি থাকো জলের তলায়। আমি তো সাঁতার জানি না, যেতে গেলে তো ডুবে যাব।

কুমির বলল, চিন্তা কোরো না বন্ধু, আমি তোমাকে পিঠে করে নিয়ে যাব।

একলাফে বানর উঠে বসল বন্ধুর পিঠের ওপর। কুমির মাঝ নদীতে পৌঁছে ভাবল, বানর তো আর পালাতে পারবে না। সত্য কথাটা বানরকে বলেই ফেলি। কুমির বানরকে বলল, 'তোমাকে কেন আমার বাড়ি নিয়ে যাচ্ছি বলো তো?”

বানর বলল, 'কেন, নেমন্তন্ন খেতে।'

কুমির বলল, আমার বউয়ের অনেকদিনের সাধ তোমার কলজে খেতে। তাই তোমাকে মতলব করে নিয়ে চলেছি।

বানর ভয় পেয়ে গেলেও সাহস করে বলল, 'বউদি কলজে খেতে চেয়েছেন সে তো খুব আনন্দের কথা। কিন্তু ভাই কলজেটা যে আমি জামগাছের একটা কোটরের মধ্যে রেখে এসেছি। রওনা হবার আগে যদি তুমি আমাকে কলজের কথা বলতে তাহলে তখনি তোমাকে ওটা দিয়ে দিতাম।'


কুমির বলল, “তাহলে তো আমাদের আবার ফিরে গিয়ে তোমার কলজেটা আনতে হবে।

বানর বলল, 'সেই ভালো।'

বানরের কথা শুনে আগের চেয়েও তাড়াতাড়ি সাঁতরে কুমির বানরকে নিয়ে জামগাছের নিচে উপস্থিত হল।

তীরে এসে পৌঁছতেই একলাফে বানর গাছের একটা উঁচু ডালে উঠে বসল। নীচের দিকে তাকিয়ে বলল, দুষ্টু বিশ্বাসঘাতক। তুই এটুকুও জানিস না কলজে থাকে বুকের ভেতরে, বাইরে থাকে না।

গাছের গর্তে রাখব কেমন করে?

কুমির নিজের বোকামি বুঝতে পেরে বলল, 'আমি তোমার সঙ্গে ঠাট্টা করছিলাম।

চলো ভাই, আর দেরি কোরো না। তোমার বউদি রাগ করবে।'

বানর বলল, যাও তোমার নিষ্ঠুর বউয়ের কাছে ফিরে যাও। তোমার মতো মূর্খ স্বামী এই পৃথিবীতে নেই। মনের দুঃখে কুমির ফিরে গেল।




    ★★সিংহ ও শিয়াল★★

এক সিংহ ও সিংহি তাদের ছোটো দুটি শাবককে নিয়ে এক বনে বাস করত। সিংহ রোজ ভোর না হতেই বের হত শিকারে। হরিণ, খরগোশ ও বিভিন্ন জন্তু শিকার করে ফিরত সিংহ। সিংহিকে সে তার শিকার দিত এনে। দুটি বাচ্চাকে নিয়ে পরম আনন্দে সেই সব তারা খেত।

সিংহ একদিন বনে ঘুরে ঘুরে কোনো শিকার না পেয়ে হতাশ হয়ে বাড়ি ফেরার পথে দেখল একটি  শিয়ালছানা পড়ে আছে।

শিয়ালছানাটিকে না মেরে মুখে করে তাকে এনে দিল সিংহির কাছে। সিংহ বলল, এই শিশু শিয়ালটাকে মারতে

ইচ্ছা করল না। কী করবে একে নিয়ে বলো।

ওমা, এই বাচ্চা শিয়ালটাকে কি মারা যায়। ও আমার সিংহছানাদের সঙ্গেই মানুষ হবে। সিংহি বলে উঠল।

সেইদিন থেকেই শিয়ালছানাটি সিংহের বাচ্চাদের সঙ্গে মানুষ হতে লাগল।

বেশ কিছুদিন যাবার পর সকলেই বেশ বড়ো হয়ে উঠল। তিনজনে একদিন বনে বেড়াতে বেরিয়েছে। হঠাৎ এক বড়ো হাতি দেখে সিংহ ছানারা স্বভাবশত গর্জন করে উঠল।

শিয়ালছানা বিশাল হাতি দেখে ভয়ে কাঠ। সে সিংহভাইদের বলল, ওরে ওই বিশাল জন্তুটাকে তাড়া করিস না। নির্ঘাৎ মারা পড়বি। বাড়ি চল শিগগির।

শিয়ালছানা এই কথা বলে প্রাণপণে লাগাল দৌড়। খিলখিল করে হাসতে হাসতে সিংহছানারা বাড়ি চলে এল। বাবা মায়ের কাছে তারা শিয়ালদাদার ভয় পাওয়ার কথা বলতে লাগল।

শিয়ালছানার খুব অপমান লাগল। সে তা সিংহি মাকে বলল, বলো তো, ওরা

আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছে কেন? গায়ের জোরে, সাহসে আমি কি আমার ভাইদের চেয়ে কম ?

সিংহি বলল, না-না সবই তোমার আছে। একটা কথা কি জানো, তুমি যে বংশে জন্মেছ সেখানে কেউ কখনো হাতি মারেনি।

কী বলছ তুমি মা— আমি তোমার ছেলে নই? তুমি তো আমার মা, না কি?

শিয়ালছানা বলে উঠল।

সিংহি বলল, তুমি আমার কাছে মানুষ হয়েছ ঠিকই, কিন্তু তোমার জন্ম শিয়ালের ঘরে। আমার সিংহছানারা বড়ো হচ্ছে। একদিন যখন তারা তোমার আসল পরিচয় জানতে পারবে, তখন তারা তোমাকে মেরে খেয়ে ফেলবে। তুমি যখন জেনেই গেছ তুমি কে, চলে যাও নিজের লোকেদের কাছে।

কিছুক্ষণ অবাক হয়ে থেকে পরে নিজের প্রাণ বাঁচানোর জন্য শিয়াল বনে চলে গেল দৌড়ে।



   ★বাঘরূপী গাধা★

শুদ্ধপট নামে এক ধোপা এক গ্রামে বাস করত। তার ছিল একটা গাধা। এই গাধাটাকে দিয়ে ধোপা হাড়ভাঙা খাটুনি খাটাত। ভারী ভারী মোট বওয়াত এই গাধাটাকে দিয়ে কিন্তু কিপটে ধোপা পেটভরে খেতে দিত না গাধাটাকে।

খিদেয় ছটফট করতে করতে সন্ধ্যাবেলায় পেটভরে খাবার খাওয়ার জন্য গাধা আশপাশের খেতে ফসল খেতে ঢুকত।

বেশির ভাগ দিনই তার কপালে

জুটত প্রতিবেশীদের ঠ্যাঙা খাওয়া।

গাধাটা না খাওয়ার জন্য দিন।

দিন দুর্বল হয়ে পড়ছিল। শুদ্ধপটও পড়ল মহাবিপদে।

ভালো করে গাধাটা কাজ না।

করলে ধোপার কাজের দফারফা।

একদিন জঙ্গলে কাঠ আনতে

গিয়ে শুদ্ধপট দেখল একটা বাঘ মরে পড়ে আছে। কিপটে ধোপার মাথায় একটা বুদ্ধি এল— এই বাঘের চামড়া ছাড়িয়ে গাধাকে পরিয়ে দিলে সকলে আমার গাধাকে বাঘ মনে করবে। আর চাষিদের খেতে মজা

করে গাধা ফসল খেতে পারবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। বাঘের চামড়া বাড়িতে নিয়ে এসে তা দিয়ে গাধাকে সে মুড়ে দিল। এরপর থেকে সন্ধ্যাবেলা রোজ মনের আনন্দে গাধা চাষিদের খেতে ফসল খায়। বাঘ মনে করে কেউ গাধার কাছ ঘেঁষে না। ফসল খেয়ে মনের আনন্দে গাধা

বাড়ি ফেরে।

চাষিরা পড়ল মহাবিপদে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটা বাঘ এসে তাদের ফসল খেয়ে যায় আর তারা বোকার মতন তা দেখে। এইবারে ওই বাঘটার কিছু ব্যবস্থা না করলে অনাহারে মরতে হবে।

বাঘটাকে মারার জন্য তৈরি হতে লাগল চাষিরা।

গাধা মনের আনন্দে শুদ্ধপটের ভারী ভারী মোট বয় আর সন্ধে হলেই চাষিদের খেত উজাড় করে পেট ভরায়।

একদিন রাতে চাঁদ উঠেছে আকাশে। গাধা তো মনের সুখে কচি কচি ধানের চারা চিবুচ্ছে। হঠাৎ দূরে শোনা গেল এক সুকন্ঠী গাধার ডাক। জাতভাইদের গলা শুনে মনের আনন্দে গাধাও বিকট আওয়াজ করে উঠল।

চাষিরা বাঘ মারার জন্য কাছেই অপেক্ষা করছিল লাঠি সড়কি নিয়ে। বাঘের গলায় গাধার আওয়াজ শুনেই সব হই হই করে ছুটে এল।

কাছে এসে অবাক হয়ে বলল, আরে বাঘের চামড়া জড়ানো এটা একটা গাধা! এতদিন আমাদের বোকা বানিয়েছে।

— মার বেটাকে। এই বলে সকলে মিলে পিটিয়ে গাধার দফা রফা করল।



   ★ মুনি ও তার মেয়ে ★

নদীর তীরে ছিল একটি বিশাল বটবৃক্ষ। এক মুনি সেখানে রোজ ধ্যান করতেন। একদিন ধ্যান শেষ করে উঠতে যাবার সময়ে হঠাৎই মুনি দেখলেন একটি ছোট্ট ইঁদুর পড়ে আছে।

দেবতার দান ভেবে পরম স্নেহে মুনি তুলে নিলেন ইঁদুরটিকে। তিনি তাঁর ক্ষমতার বলে ইঁদুরটিকে পরিণত করলেন একটি মেয়েতে। কোনো ছেলেমেয়ে না থাকায় ভাবলেন একেই তিনি পালন করবেন মেয়ের মতো।

বাড়ি ফিরে মুনিপত্নীকে ছোটো মেয়েটির কথা বলতেই মহানন্দে হাত বাড়ালেন তিনি মেয়ের দিকে। দাও আমার আদরের সোনাকে আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে মানুষ করব এই মেয়েকে।

মুনিপত্নী ও মুনির আদরে বড়ো হতে লাগল মেয়েটি। মেয়ে বড়ো হতেই বলে উঠলেন মুনিপত্নী— ‘এবার পাত্রের খোঁজ করো। আমার পরমাসুন্দরী মেয়ের জন্য সন্ধান করো একটি যোগ্য পাত্রের।'

আরে ওর তো বিয়ের বয়সই হয়নি। সংসার ধর্ম একটু ভালো করে বুঝে নিক, তারপর না হয় ওর বিয়ের কথা চিন্তা করা যাবে। এত তাড়াহুড়ো করার কোনো দরকার নেই। মুনি স্ত্রীকে বললেন।

স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে মুনি বেরোলেন পাত্রের খোঁজে। ফিরে এসে বললেন মেয়েকে যে সূর্যের সঙ্গে তিনি তার বিয়ে দিতে চান।

সূর্য খুব তেজি ও কঠোর প্রকৃতির। সূর্যের তাপ ও আলো সহ্য করা আমার পক্ষে কঠিন— এই পাত্র আমার পছন্দ নয়, মেয়ে জানাল। আরও বড়ো পাত্র পছন্দ করুন।

সূর্যের কাছে মুনি জানতে পারলেন তার থেকেও বড়ো মেঘ। একমাত্র মেঘের কালো ছায়াই পারে সূর্যকে ঢেকে দিতে।

"তুমি কি স্বামী হিসাবে মেঘকে বরণ করতে চাও?' মুনি বললেন।

কখনো না। ওই কালো বরণ মেঘ কখনো আমার স্বামী হতে পারে না, মেয়ে বলে উঠল।

মেঘ মুনিকে বলল, আমার চেয়েও বড়ো বায়ু। সেই আমাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় এবং টুকরো টুকরো

করে ফেলে। বায়ুর তো মতিগতির ঠিক নেই। বায়ুকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আপনি আমার জন্য আরও পাত্র দেখুন মেয়ে বলে উঠল।

হতচকিত হয়ে মুনি ছুটলেন বায়ুর কাছে। বায়ুর কাছে জানতে পারলেন তার থেকেও শক্তিশালী পর্বত। বায়ুর গতি ও গতিপথ দুইই পর্বত পারে বদলে দিতে।

ওই অচল অনড় পর্বতকে পাত্র হিসাবে একেবারেই পছন্দ নয় আমার- বলে উঠল মুনির মেয়ে।

পর্বতের থেকেও বড়ো পাত্র আমার পছন্দ। পবর্তকে জিজ্ঞেস করতে সে বলল, 'আমার থেকেও বড়ো ইঁদুর। ইঁদুরই একমাত্র পারে আমাকে খুঁড়ে খুঁড়ে গর্ত করতে।'

মুনি এসে মেয়েকে এই কথা বলাতে সে খুব খুশি হয়ে পাত্র হিসাবে ইঁদুরকেই করল পছন্দ। মুনির মেয়ে আবার পরিণত হল ইঁদুরে।



পঞ্চতন্ত্রের হিতবচন

১। ক্রোধ মানুষের পরম শত্রু। রাগের মাথায় কোনো কিছু সঠিকভাবে বিবেচনা না করে কোনো কাজ করা অনুচিত।

২। বিপদ জেনেও যারা সময়মতো সঠিক পদক্ষেপ নেয় না তারাই প্রকৃত মূর্খ।

৩। বিদ্যা অর্জন করলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সাধারণ বুদ্ধিও মানুষক প্রবল বিপদ থেকে রক্ষা করে।

৪। সামান্য ধন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকাই শ্রেয়। অতি লোভের পরিণাম সর্বদাই দুঃখদায়ক।

৫। প্রকৃত বুদ্ধিমান বিপদেও মাথা ঠান্ডা রাখে। বুদ্ধিই তার সব সমস্যার সমাধান করে দেয়।