পঞ্চতন্ত্রে কয়েকটি বাছাই করা গল্প
![]() |
দমনক ও সঞ্জীবক
বর্ধমান নামে এক বণিক এক নগরে বাস করত। একবার সে বাণিজ্য করার জন্য মথুরায় যাবে স্থির করল। বর্ধমান তার কয়েকটি বন্ধুকেও সঙ্গী করল।
সঞ্জীবক ও নন্দনক নামে দুটি ষাঁড় ছিল বর্ধমানের। তাদের চেহারা ছিল অত্যন্ত মজবুত ও তারা ঘোড়ার বেগে চলত। মথুরা যাওয়ার সময় ষাঁড় দুটিকে গাড়িতে জুড়ে নিয়ে শুভ দিনে মথুরার উদ্দেশ্যে রওনা হল বর্ধমান।
কয়েকদিনের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল মথুরা শহরের কাছে। একদিন হল কী যমুনা নদীর কাছে জলাজমির কাদায় পা মচকে গেল সঞ্জীবকের। বর্ধমান তাঁর প্রিয় ষাঁড়টির অসুস্থতার জন্য দিনকয়েক যাত্রা পিছিয়ে দিল।
কয়েকদিন পরেও যখন সঞ্জীবক সুস্থ হল না, তখন বর্ধমানের সঙ্গী অন্যান্য বণিকরা বলল, ভাই, আর দেরি করা ঠিক নয়। এবার আমাদের যেতেই হবে। বর্ধমান বুঝল বন্ধুরা ঠিকই বলছে। তাই আর দেরি না করে সঞ্জীবকের জন্য দুজন পাহারাদার ঠিক করে সে বন্ধুদের নিয়ে চলে গেল।
কয়েকদিন পরে পাহারাদাররা বর্ধমানকে খবর দিল যে তার প্রিয় ষাঁড় সঞ্জীবকের মৃত্যু হয়েছে। প্রিয় ষাঁড়ের শোকে আকুল হয়ে উঠল বর্ধমান। যাই হোক কয়েকদিন পর ব্যবসা-বাণিজ্য করে দেশে ফিরে গেল বর্ধমান।
এদিকে হয়েছে কী, পাহারাদাররা চলে যাবার কিছুদিনের মধ্যেই সঞ্জীবক সুস্থ হয়ে উঠল। যমুনার তীরের কচি কচি সবুজ ঘাস খেয়ে মহাশক্তিশালী হয়ে উঠল সঞ্জীবক।
সারাদিন সে মনের সুখে ঘুরে বেড়ায় ও গর্জন করে। যমুনা নদীর কাছেই ছিল এক বন। সেই বনে বাস করত পিঙ্গলক নামে এক সিংহ। সে ছিল পশুদের রাজা। একদিন সে তার দলবল নিয়ে যমুনা নদীতে জল খেতে এসেছে। সঞ্জীবকের মেঘের মতো গর্জন শুনে সে জল না খেয়ে ভয়ে পালিয়ে গেল। পিঙ্গলক মনে করল, নিশ্চয় কোনো ভয়ঙ্কর জন্তু এই বনে আছে। চিন্তিত হয়ে সে অন্যান্য জন্তুদের নিয়ে সভা বসাল।
করটক ও দমনক নামে দুই বুদ্ধিমান শিয়াল বাস করত এই বনে। তারা ছিল এক মন্ত্রীর ছেলে। কোনো এক কারণে পিঙ্গলক তাদের চাকরি থেকে বরখাস্ত করেছিল। তারা সবসময় চেষ্টা করত কীভাবে রাজা পিঙ্গলককে খুশি করে হারানো চাকরি ফিরে পাওয়া যায়।
দমনক একদিন করটককে এসে বলল, ভাই, মহারাজ বোধহয় কোনো কারণে ভয় পেয়েছেন। করটক বলে উঠল, তুমি কী করে জানলে বলো দেখি?
মহারাজের হাবভাবেই বেমালুম টের পাওয়া যাচ্ছে যে তিনি ভয় পেয়েছেন। দেখি এবার বুদ্ধি খাটিয়ে যদি মন্ত্রীর চাকরিটা জোগাড় করতে পারি, বলে উঠল দমনক।
দমনক গেল সিংহরাজ পিঙ্গলকের কাছে। প্রণাম নিন আমার মহারাজ, দমনক বলল।
খুশি হয়ে বলল পিঙ্গলক, এসো দমনক, কী খবর তোমার?
-আমার আবার কী খবর? আপনি তো আমায় ভুলেই গেছেন। তা যাই হোক, যদি অপরাধ না নেন, আপনার সঙ্গে আমার একটু গোপন কথা আছে।
সব জন্তুরা পিঙ্গলকের আদেশে সরে গেল। দমনক বলল, মহারাজ, আপনি যে জল খেতে গিয়ে ফিরে এলেন।
পিঙ্গলক কিছুক্ষণ ভাবল, বুঝতে পারল দমনক নিশ্চয় কিছু বুঝতে পেরেছে। সে হয়তো এই বিপদে সঠিক পরামর্শ দিতে পারবে। পিঙ্গলক বলল, কোনো ভয়ঙ্কর জন্তু এসেছে এই নদীর তীরে, এই বনে আমি আর বাস করছি না।
-সে কী মহারাজ। আপনি হলেন গিয়ে এই বনের রাজা পশুরাজ সিংহ। কী না-কী
জন্তু তার ভয়ে আপনি পালাবেন? দমনক থাকতে তা হতে দেবে না। চিন্তা করবেন
না, আমি গিয়ে সব দেখে আসছি।
দমনকের এই কথা শুনে খুব খুশি হল পিঙ্গলক। পিঙ্গলকের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নদীর তীর ঘেঁষে এগিয়ে চলল দমনক। শুনতে পেল সঞ্জীবকের গর্জন। কাছে গিয়ে দমনক দেখল একটা ষাঁড় শব্দ করছে।
মনে মনে ভাবল দমনক, এই ষাঁড় ব্যাটাকে কাজে লাগিয়ে আমি আমার হারানো চাকরি ফিরে পাব।
পিঙ্গলকের কাছে গিয়ে বলল দমনক, মহারাজ, চিন্তার কোনো কারণ নেই। এই ভয়ঙ্কর জন্তুকে আমি আপনার পায়ের কাছে এনে ফেলব।
খুশি হয়ে বলল পিঙ্গলক, তা যদি তুমি করতে পারো তবে তোমাকেই আমি আমার রাজ্যের মন্ত্রী করব। তোমার কথামতোই চলবে আমার রাজ্য।
দমনক এই কথা শুনে মনের আনন্দে ছুটে গেল ষাঁড়ের কাছে। সঞ্জীবককে বলল সে, এই ষাঁড়, স্পর্ধা তো তোমার কম নয়। এত গর্জন করছ কেন? এই বনের রাজা পশুরাজ সিংহ তোমায় ডেকে পাঠিয়েছেন। খুব রেগে গেছেন তিনি। চলো আমার সঙ্গে।
সঞ্জীবক বলে উঠল— নিশ্চয় যাব ভাই। তোমাদের রাজাকে বলো আমায় ক্ষমা করে দিতে। তিনি যাতে আমার ওপর রেগে না যান, তার ব্যবস্থা করে দিয়ো ভাই।
সে চিন্তা কোরো না ভাই। দমনক বলল, দাঁড়াও আমি মহারাজের সঙ্গে কথা বলে তোমায় নিয়ে যাব।
পিঙ্গলককে গিয়ে বলল সমনক মহারাজ, এই জন্তুটি টি শিবঠাকুরের বাহন ষাঁড়। কৈলাস থেকে এসেছে যমুনার তীরে থাকবে ।
চিন্তিত মুখে বলল পিপলক, তাই বলো, শিবঠাকুরের বাহন, তা তুমি তাকে কী।বললে দমনক ?
আমি বললাম, আমাদের রাজা পিঙ্গলক মা চণ্ডীর বাহন। চলুন যাতে আপনি আমার প্রভুর সঙ্গে দুই ভাইয়ের মতো থাকতে পারেন, সেই ব্যবস্থা করা হবে। এখন আপনি বলুন মহারাজ আপনার কী ইচ্ছা?
খুশি হয়ে বলল পিঙ্গলক, দমনক তুমি তো খুব বুদ্ধিমান। যাও তাকে গিয়ে বলো, তিনি যেন অবিলম্বে আমার কাছে এসে আমার সঙ্গে থাকেন। সত্যি, তুমিই আমার মন্ত্রী হবার যোগ্য।
আনন্দে ডগমগ হয়ে চলল দমনক। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিয়ে এল সঞ্জীবককে পিঙ্গলকের কাছে। পিঙ্গলক ও সঞ্জীবক উভয়ে উভয়কে আলিঙ্গন করল। পিঙ্গলক বলল সঞ্জীবককে, ভাই এই বনে কেউ তোমার কোনো ক্ষতি করবে না। তবে তুমি আমার কাছে কাছে থাকার চেষ্টা কোরো।
এরপর দমনক আর করটক দু-ভাইকে মন্ত্রী পদ দান করল পিঙ্গলক। নিশ্চিত হয়ে বন্ধুর সঙ্গে গল্পে মেতে উঠল পিঙ্গলক। দুজনের ভাব এমন জমে গেল যে পিঙ্গলক প্রায় শিকারে যায় না। ফলে কাটক দমনকের খাবার জোটে না। অন্যান্য পশুরা খাবার না পেয়ে অন্য বনে পালিয়ে গেল।
মহাবিপদে পড়ল দমনক। ভাই করটককে বলল, দাঁড়াও, পিঙ্গলক ও সঞ্জীবকের বন্ধুত্ব নষ্ট করতে হবে। তা না হলে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।
করটক বলল, তা কী করে সম্ভব?
বুদ্ধি দিয়ে সব সমস্যার সমাধানই সম্ভব, বলে উঠল দমনক। সঞ্জীবক গেছে নদীতে চান করতে, এই সুযোগ। দমনক বলল, মহারাজ একটা কথা বলতে চাই। কাল আমাকে আপনার বন্ধু বলল, এই ব্যাটা পিঙ্গলককে মেরেই আমি রাজা হব। তুমি হবে আমার মন্ত্রী। আপনার বন্ধু কিন্তু আপনার ক্ষতিই চায়। কখনো তা হতে পারে না, বলে উঠল পিঙ্গলক। সঞ্জীবক আমার প্রাণের বন্ধু।
সে কখনো আমার ক্ষতি করবে না। তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে। সে যদি আমায় মারতে চায় মারুক, আমার পক্ষে তার ক্ষতি করা সম্ভব নয়।
দমনক দেখল মহাবিপদ। সে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলল, মহারাজ কোথাকার কে ষাঁড় তার ঠিক নেই। শুধু শুধু কেন বিপদ বাড়াবেন? মেরেই ফেলুন ওই ষাঁড়টাকে,
দেখবেন আপনার মঙ্গল হবে।
কিছুক্ষণ ভেবে বলল পিঙ্গলক, সঞ্জীবক যে আমাকে মারতে চায় তার কোনো প্রমাণ আছে?
দমনক বলল, অবশ্যই আছে। কাল সকালে দেখবেন, নাক ফুলিয়ে ঠোঁট কাঁপিয়ে চোখ লাল করে সে আসবে আপনার কাছে।
এরপর গেল দমনক সঞ্জীবকের কাছে। সঞ্জীবক দমনককে দেখে খুশি হয়ে বলল, এসো ভাই গল্প করি। গল্প করার সময় নেই বন্ধু। একটা কথা ছিল। তাড়াতাড়ি পালিয়ে যাও এই বন থেকে। তোমার বন্ধু পিঙ্গলক তোমাকে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করছে। অন্যান্য জন্তুদের বলছে, বেশ গায়ে গতরে লেগেছে ষাঁড়টা, এই ব্যাটাকে নিয়ে মহাভোজ করা যাবে। সিংহ কখনো ষাঁড়ের বন্ধু হতে পারে না।
সঞ্জীবক এই কথা শুনে বলল— কী বলছ বন্ধু? তোমার কথা বিশ্বাস করা অসম্ভব।
আমি বুঝতে পারছি, আমাদের বন্ধুত্ব দেখে বনের অন্য জন্তুরা হিংসায় জ্বলছে, তারাই মন বিষিয়ে দিয়েছে পিঙ্গলকের।
দমনক বলল, পালিয়ে যাও ভাই এখান থেকে। তাহলেই তুমি প্রাণে বাঁচবে, না হলে তোমাকে মরতে হবে।
আমি পালাব না, বলে উঠল সঞ্জীবক। দরকার হলে আমি যুদ্ধ করব। দমনক এই কথা শুনে ভয় পেয়ে ভাবল, সর্বনাশ, এই সব ঘটলে আমার তো সবই যাবে।
সঞ্জীবক বলল, বিশ্বাস করতেই পারছি না পিঙ্গলক আমায় বধ করতে পারে।
দমনক বলল, বিশ্বাস হবে যখন দেখবে চোখ লাল করে ভুরু কুঁচকে পিঙ্গলক তোমার দিকে তাকিয়ে জিভ চাটছে। এই বলে দমনক বিদায় নিল।
দমনক চলে যাওয়ার পর বন্ধুর কথা ভেবে ভেবে সঞ্জীবক সারারাত কাঁদল। সকালে উঠে ভাবল, যা হবে হোক, বন্ধু পিঙ্গলকের কাছেই যাই।
পিঙ্গলক সঞ্জীবকের জন্যই অপেক্ষা করছিল। সারারাত কাঁদার জন্য সঞ্জীবকের চোখ লাল, নাক ফুলে ফুলে উঠছে। দমনকের কথা মনে পড়ল পিঙ্গলকের। দুঃখে ভাবনায় অর ঠোট জিভ শুকিয়ে গেল। পিঙ্গলককে দেখে সঞ্জীবকের দমনকের কথা মনে পড়ে গেল। কোনো কিছু বোঝার আগেই পিঙ্গলক ঝাঁপিয়ে পড়ল সঞ্জীবকের ওপর। বেশ কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলল। উভয়েই প্রচণ্ড আহত হল। অবশেষে পিঙ্গলকের তীক্ষ্ণ ধারালো নখের আঘাতে মৃত্যু হল সঞ্জীবকের।
বন্ধুকে মৃত দেখে বিলাপ করতে লাগল পিঙ্গলক। দমনক এগিয়ে এসে বলল, চোখের জল মুছে ফেলুন মহারাজ। সঞ্জীবক ছিল আপনার গোপন শত্রু। সঠিক সময়ে শত্রু নিধন বুদ্ধিমানের কাজ। দমনকের কথা শুনে, পিঙ্গলক শান্ত হল। কিছুদিনের মধ্যেই সঞ্জীবকের শোক ভুলে গেল পিঙ্গলক। মনের সুখে দমনককে মন্ত্রী করে রাজত্ব করতে লাগল।
■■■■
গোঁজ উপড়ানো বানর
গাছপালা ঘেরা সুন্দর একটি বাগানবাড়িতে মন্দির তৈরির কাজ চলছিল। বহু কারিগর আর ছুতোর মিস্ত্রিরা সারাদিন ধরে সেই কাজে ব্যস্ত থাকত। দুপুরের দিকে কাজ বন্ধ রেখে তারা শহরে যেত খাবার খেতে।
একদিন দুপুরবেলা যথারীতি কারিগররা কাজ বন্ধ রেখে গেছে শহরে খাবার খেতে।
একদল বানর সেই সময় বন-জঙ্গলে ঘুরতে ঘুরতে গাছপালা ঘেরা সেই বাগানবাড়িতে উপস্থিত হল। সুন্দর পরিবেশে মনের আনন্দে তারা বাগানের গাছের ওপর দাপাদাপি করতে লাগল।
একটি কাঠের থামের মধ্যে এক কারিগর একটি কাঠের গোঁজ গুঁজে রেখেছিল। হুটোপুটি করতে করতে একটা বানর এসে সেখানে উপস্থিত হল। থামের ওপর নজর পড়তেই সে তার ওপর লাফিয়ে চড়ে বসল। চেরা মুখটার ওপর বসে সে গোঁজটা ধরে টানাটানি শুরু করল।
এদিকে হয়েছে কী, বহু চেষ্টা করেও সে চেরা কাঠের ফাঁক থেকে গোঁজটাকে নাড়াতে পারল না। রাগে অস্থির হয়ে দু-হাতে গোঁজটাকে শক্ত করে চেপে ধরে জোরে মারল এক টান। গোঁজটা খুলে আসার সঙ্গে সঙ্গে বানর ত্রাহি ত্রাহি রবে শুরু করল চিৎকার।
বানরের লেজ ছিল চেরা থামের ফাঁকে ঢোকানো। গোঁজটা সরে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাঠের ফাঁকে গেল বানরের লেজ আটকে। বহু চেষ্টা করা সত্ত্বেও বানর কিছুতেই পারল না তার লেজ বার করতে। চিৎকার করে হাত-পা ছুঁড়ে বানর আকাশ বাতাস ভরিয়ে দিল। বানরের সকল চেষ্টাই ব্যর্থ হল। চেরা থামের ফাঁকে বানরের রক্তাক্ত লেজ রইল আর্টকে। বানরের সর্বাঙ্গ রক্তে ভরে গিয়ে তার অবস্থা হল মৃতপ্রায়। রাগে দুঃখে সে চোখের জল ফেলতে লাগল।
বিপদের সময় আরো বিপদ ঘনিয়ে আসে
দামামা ও শিয়াল
খিদেয় কাতর হয়ে একদিন একটা শিয়াল বনে বনে ঘুরছিল। হঠাৎ বনের মধ্যে এক জায়গায় সে একটা অদ্ভুত শব্দ শুনতে পেল। এরকম বিকট শব্দ যে জীবনে কোনোদিনও শোনেনি। ভয়ংকর শব্দ শুনে ভয়ে কাঠ হয়ে গেল শিয়াল।
শিয়াল ভাবল— আরে বাবা, এ যে সে শব্দ নয়, নিশ্চয় কোনো ভয়ঙ্কর প্রাণী
এদিক ওদিক আছে। মানে মানে পালিয়ে গেলে প্রাণটা এ যাত্রায় বেঁচে যাবে।
অনেক কিছু ভাবলেও চালাক শিয়াল তখুনি না পালিয়ে ভাবল- যাই তো দেখি, কী সেই প্রাণী যে এরকম অদ্ভুত শব্দ করছে। কোনো কিছু না দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যাওয়ার থেকে সবকিছু দেখেশুনে বিবেচনা করাই বুদ্ধিমানের কাজ। খুব ধীরে ধীরে শব্দের উৎস সন্ধানে শিয়াল শব্দটার দিকে এগিয়ে গেল। বনের যে অঞ্চল থেকে শব্দ আসছিল সেখানে কিছুদিন আগে দুই দল সেনা খুব যুদ্ধ করেছিল। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেই জায়গা ছেড়ে যাওয়ার সময় তারা রেখে গিয়েছিল একটি দামামা। হাওয়ায় গাছের ডালের ঘা লেগে দমাদম শব্দ হচ্ছিল দামামায়। শিয়াল এই মজার ব্যাপারটা দেখে খুব খুশি হয়ে এগিয়ে গেল দামামার দিকে।
মনের আনন্দে দামামায় কয়েক ঘা দিয়ে শিয়াল বাজাল দমাদম দমাদন।
‘দামামা” নামে অদ্ভুত জিনিস সম্পর্কে শিয়ালের কোনো ধারণাই ছিল না। সে ভাবল দামামা নিশ্চয় কোনো অদ্ভুত প্রাণী যা রক্ত মাংস চর্বিতে ভরা। যাই হোক শিয়ালমামার খুব আনন্দ— আজ আমার বিশাল ভোজ হবে। কী মজা, কী মজা বলে শিয়াল নাচতে লাগল। অনেক কষ্ট করে দাঁত দিয়ে শিয়াল ছিঁড়তে শুরু করল দামামার চামড়া। হায় কপাল— কোথায় মাংস, কোথায় চর্বি- দামামার ভেতর তো গড়ের মাঠ মহাভোজ তো হলই না, বেচারা শিয়ালের দুর্ভোগের সীমা রইল না। দামামার শক্ত চামড়া ছিঁড়তে গিয়ে শিয়ালের দাঁত ভেঙে একাকার। শিয়ালের মুখ রক্তাক্ত হল। রাগে দুঃখে জল ঝরতে লাগল শিয়ালের চোখ থেকে। নিজেকে ধিক্কার দিতে দিতে শিয়াল বলল— কী বোকামিই না করলাম। শব্দের পিছনে ছুটে ছুটে নিজের শরীরটাকেই
ক্ষতবিক্ষত করলাম। লাভের মুখ তো দেখলামই না। উল্টে ভাগীদার হলাম কষ্টের।
■■■■■
কেউটে, কাক ও সোনার হার
এক বনের মধ্যে বিশাল একটা বটগাছে বাসা বেঁধেছিল এক কাক পরিবার। গাছে তলায় এক সরু লম্বা কোটরে থাকত এক কেউটে সাপ। ওই কেউটে সাপটা প্রতিবারই কাকের ডিম ফেটে ছানা বেরোলেই খেয়ে ফেলত। মা-কাক মনের দুঃখে চোখের জল ফেলত। বাবা-কাকও রাগে দুঃখে সাপকে শাস্তি দেবার কথা ভাবত। তারা বুঝে উঠতে পারত না কীভাবে তারা সাপকে শাস্তি দেবে।
এই কাক দুটোর খুব বন্ধুত্ব ছিল এক শিয়ালের সঙ্গে। এই বিপদের দিনে তারা ভাবল যে তাদের শিয়াল বন্ধু অবশ্যই তাদের একটা উপায় বলে দেবে। দুজনে মিলে উড়ে গেল শিয়ালের কাছে।
শিয়াল অনেকক্ষণ চিন্তা করে বলল, শোনো ভাই, সাপকে জব্দ করার জন্য আমি একটা ফন্দি এঁটেছি। আগামীকাল সকালে রাজবাড়ির মেয়েরা যাবে নদীতে স্নান করতে।
তারা নদীর তীরে কাপড় চোপড় গয়নাগাঁটি রেখে স্নান করতে নামবে। ওই সময় তুমি হার অথবা অন্য যে-কোনো মূল্যবান জিনিস তুলে নিয়ে কেউটের কোটরে এনে ফেলে দেবে। এরপর দেখবে কেউটে কীভাবে জব্দ হয়।
শিয়ালের পরামর্শ মতো রাজবাড়ির মেয়েরা যখন নদীর তীরে কাপড় চোপড় ও গয়নাগাঁটি রেখে স্নান করতে নদীতে গেল, তখন কাক এসে সেখানে উপস্থিত হল। সেখান থেকে একটি সোনার হার তুলে নিয়ে কাক উড়ে পালিয়ে গেল। রাজবাড়ির প্রহরীরা কাককে অনুসরণ করে লাঠি হাতে ছুটে চলল। কাকটি হার নিয়ে কেউটের গর্তে দিল ফেলে।
বটগাছের কোটরের সামনে গিয়ে প্রহরীরা লাঠি নিয়ে হারটি খুঁজতে লাগল। কেউটে রেগে গিয়ে ফণা তুলে বেরিয়ে আসতেই প্রহরীরা লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সাপটিকে মেরে ফেলল। তারপর তারা মনের আনন্দে সোনার হারটি নিয়ে রাজবাড়ির দিকে রওনা হল। কাক দুটো কেউটের মৃত্যুতে খুবই আনন্দিত হল এবং বন্ধু শিয়ালের কাছে চিরকৃতজ্ঞ রইল।
■■■■■
বক ও কাঁকড়া
এক বিশাল বনের মধ্যে ছিল। একটা বড়ো জলাশয়। জলাশয়টি গভীর হওয়ার জন্য দু-চার বছর বৃষ্টি না হলেও জলাশয়ের জল শুকোত না। বিভিন্ন মাছ, শামুক, কাঁকড়া, ঝিনুকের বাস ছিল এই জলাশয়ে। জলাশয়টির তীরে ছিল ছোটো বড়ো নানান মাপের বিভিন্ন গাছ। এই সব গাছে বাস করত বহু বক। হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে থাকত এই সব বক। সুযোগ পেলেই মাছ, ব্যাঙ, শামুক খেয়ে ফেলত বকেরা। জলাশয়ের কোনো প্রাণীরও নিস্তার ছিল না বকেদের হাত থেকে।
এক বুড়ো বক ছিল বকেদের এই দলে। শরীরে ক্ষমতা না থাকার জন্য খাবার জোগাড় করার ক্ষমতা ছিল না তার। অথচ খাবার না পেলে তো মরতে হবে। অনেক চিন্তা করে সে বার করল এক মতলব।
বুড়ো বকটি একদিন জলাশয়ের ধারে বসে কাঁদতে লাগল। এক কাঁকড়া বককে এভাবে।দেখে বলল, বকমামা কাঁদো কেন? তুমি কি খাবার জোগাড় করতে পারোনি?
না না আহার আমি ত্যাগ করেছি। এই জীবনে আর মাছ খাব না। এই আমার ব্রত।
কাঁকড়া বলে উঠল-সে কী মামা হঠাৎ এই ব্রতের কারণ কী?
বুড়ো বক বলল, বারো বছর এই এলাকায় জল হবে না, ফলে শুকিয়ে কাঠ হবে সব নদীনালা জলাশয়।
ভয়ে কাঁকড়া বলল, সে কী মামা, তাহলে তো আমাদের মারা পড়তে হবে। এই ভয়ংকর খবর তুমি কীভাবে জানলে মামা?
দৈববাণী শুনেছি আমি— বক বলে উঠল। এতদিন আমি তোমাদের সঙ্গে কাটিয়েছি। জলের অভাবে বেঘোরে প্রাণ যাবে তোমাদের, এ কথা ভেবেই আমার এত কষ্ট। কাঁকড়া গিয়ে সব জলচর, প্রাণীদের এই খবর দিতেই সকলে ছুটে এল বকের কাছে।
বককে বলল, মামা, তুমি অনেক অভিজ্ঞ। আমাদের বাঁচার একটা উপায় বলো। বেশ দূরে একটা গভীর জলাশয় আছে। তোমরা সেখানে গেলে সকলেই প্রাণে বাঁচবে। পরামর্শ দিল বক।
হতাশ মাছেরা বলল, আমাদের তো ডানা নেই, কীভাবে যাব আমরা।
আমি তোমাদের পিঠে করে জলাশয়ে নিয়ে যাব। এক একদিন একজন করে যাবে আমার পিঠে চড়ে।
মহানন্দে নেচে উঠল সকলে। বক একটা করে মাছ নিয়ে যায়। পাথরের ওপর আছড়ে মেরে খেয়ে ফেলে। এইভাবেই মহাসুখে কাটতে লাগল বকের দিন।
কাঁকড়া একদিন এসে বলল, মামা – তুমি সকলকেই নিয়ে গেলে, পড়ে রইলাম আমি। কবে আমাকে নিয়ে যাবে ওই জলাশয়ে?
মাছ খেয়ে খেয়ে বকের অরুচি ধরে গিয়েছিল। খুশি হয়ে তাই সে বলল, সত্যিই তো ভারি অন্যায়। আজ অবশ্যই নিয়ে যাব তোমাকে।
বকের পিঠে চড়ে কাঁকড়া তার যাত্রা শুরু করল। কিছুদূর গিয়েই কাঁকড়া দেখল, বড়ো একটা পাথরের গায়ে মাছের কাঁটা ও লাল দাগ। ভয়ে কাঠ হয়ে কাঁকড়া বলল,জলাশয় আর কতদূরে মামা?
কাঁকড়াকেও পাথরের কাছে নিয়ে গেল বক। বলল, দাঁড়া ব্যাটা, জলাশয়ে যাবি, চিন্তা করিস না। আমিই জলাশয়, তোকে সেখানে পাঠানোর ব্যবস্থা করছি খুব শিগগির।
বুদ্ধিমান কাঁকড়া বকের শয়তানি বুদ্ধি বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গেই তার ধারালো দাঁড়া দিয়ে বকের সরু গলা ধরল চেপে। মুহুর্তের মধ্যেই মারা গেল বক।
■■■■■
সিংহ ও খরগোশ
বিশাল এক বন। সেই বনে বাস ছিল বিভিন্ন পশুর। এক শক্তিশালী সিংহ বাস করত সেই বনে। সকল পশুরা
তাকে খুব ভয় পেত। সিংহের গায়ের জোর অন্যান্য পশুদের থেকে বেশি থাকায় যাকেই সে সামনে পেত তাকেই হত্যা করে নিজের খিদে মেটাত। সিংহ হয়ে উঠল পশুদের রাজা। সিংহের হাত থেকে বাঁচবার জন্য বনের সকল পশুরা আয়োজন করল এক সভার। অনেক আলাপ আলোচনার পর শিয়াল বলল, এক কাজ করা যাক। সিংহরাজকে আর শিকার করতে বনে আসতে হবে না। আমরা রোজ এক একজন তার গুহায় যাব, তিনি আমাদের মেরে খাবেন। শিয়ালের কথায় খুশি হয়ে তা মেনে নিল সকলে। সিংহকে এই কথা বলতে সে তো খুব খুশি। কষ্ট করে আর যেতে হবে না বনে। গুহাতে বসেই রোজ মহাভোজ হবে। প্রতিদিন একটা করে পশু হয় সিংহের শিকার। মহানন্দে কাটছে সিংহের দিন।
একদিন এল ছোটো একটি খরগোশের পালা। তার বুড়ো বাবা-মা ছেলের মৃত্যুর চিন্তায় হয়ে পড়ল শোকাহত। খরগোশ তাদের বলল, ভয় পেয়ো না তোমরা। আজ। আমি সিংহের পেটে যাব না। আজ সিংহেরই হবে মৃত্যুদিন।
পঞ্চতন্ত্রের মন্ত্রবাবা-মাকে সান্ত্বনা দিলেও মনে মনে সে খুবই ভয় পেল। তার থেকে বড়ো বড়ো পশুরাও সিংহের শিকার হয়েছে, সে তো কোন ছার। এদিক-ওদিক তাকিয়ে চলত চলতে হঠাৎ পথের পাশে সে দেখল একটা কুয়ো। কুয়োর ভেতর তাকাতেই সে দেখতে পেল নিজের ছায়া। সিংহকে বধ করার জন্য মাথায় এল তার একটা দুষ্টু মতলব।
ছুটে এল খরগোশ পশুরাজের কাছে।
কী রে এত দেরি কেন খরগোশ? গর্জন করে উঠল সিংহ। আমি তো আপনার কাছেই আসছিলাম। হঠাৎ কী হল জানেন, অন্য একটা সিংহ আমার পথ আটকে দিল।
কী— অন্য সিংহ? এত স্পর্ধা কার, দাঁড়া তো দেখি।
জানি না পশুরাজ। আমি যখন বললাম আমি এই বনের রাজার কাছে যাচ্ছি, সে বলল, কী? আমিই এই বনের রাজা। আহার করতে হয় আমিই তোকে করব, আর কেউ নয়।
চল তো দেখি, কার এত সাহস, বলে কী না সে এই বনের রাজা। দাঁড়া, ব্যাটাকে বধ করে আসি।
মনের আনন্দে লাফিয়ে লাফিয়ে চলল খরগোশ কুয়োর দিকে। কুয়োর কাছে এসে বলল খরগোশ — উকি দিয়ে দেখুন, ওই সিংহটাকে দেখতে পাবেন।
কুয়োর জলে সিংহের নিজের ছায়া পড়ল। পশুরাজ রাগে গর্জন করতে লাগল।
ছায়ার সিংহটিকেও মনে হল গর্জন করছে। রাগে গজগজ করতে করতে জলে ঝাঁপ দিল পশুরাজ অপর সিংহটিকে বধ করতে। পশুরাজ বুঝতে পারল না কুয়োর জলে যে সিংহকে দেখছেন সেটি আর কেউ নয়— তারই নিজের ছায়া। জলে ঝাঁপ দেবার সঙ্গে সঙ্গেই মারা গেল পশুরাজ সিংহ।
প্রাণে বেঁচে গেল খরগোশ। অন্য সকল পশুদের খবর দিতে তারা ফেলল স্বস্তির নিশ্বাস। বুদ্ধির জোরে সামান্য একটা খরগোশ হারিয়ে দিল পশুরাজ সিংহকে।
■■■■
উকুন ও ছারপোকা
মন্দবিসপিনী নামে একটি উকুন বাস
কত রাজার তুলতুলে নরম, আরামদায়ক বিছানার চাদরের নীচে। রাজার মধুর মতো মিষ্টি রক্ত পান করে করে বেশ সুখেই তার দিন কাটছিল। একদিন সেখানে হঠাৎ হাজির হল একটা ছারপোকা। ছারপোকাকে দেখে রেগে অগ্নিশর্মা হয়ে উকুন বলল, বাঁচাতে চাও তো পালাও। এই বিছানা স্বয়ং রাজার। একবার তোমায় দেখলে এখুনি
তোমার মৃত্যু ঘটবে।
অগ্নিমুখ নামের ছারপোকাটি বলল, ভরদুপুরে অতিথিকে এভাবে তাড়িয়ে দিয়ো না। জোলো রক্ত, তেতো রক্ত অনেক রকমেরই রক্ত পান করেছি। তুমি যদি অনুমতি দাও রাজার গায়ের আঠার মতো ঘন আর মধুর মতো মিষ্টি রক্ত পান করে জীবন সার্থক করি।
মন্দবিসর্পিনী ছারপোকার কথায় খুশি হয়ে বলল, তুমি আমার অতিথি, দু-একদিন থাকো আমার সঙ্গে। রাজামশাই ঘুমিয়ে পড়লে আমি ধীরে ধীরে রাজার রক্ত পান করি। তাড়াহুড়ো না করে ধীরে ধীরে রাজার রক্ত পান কোরো, না হলে নির্ঘাৎ বিপদ হবে।
অগ্নিমুখ বলল, কোনো চিন্তা করো না, আমি তোমার নির্দেশ মতোই সব কাজ করব। রাজামশাই রাত্তিরে এসে বিছানায় শুতেই অগ্নিমুখ অস্থির হয়ে উঠল। উকুনের সব উপদেশ বেমালুম ভুলে গিয়ে রাজার হাতের ওপর দিল এক কামড়। যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠে রাজা সব দাসদাসীদের ডাক দিলেন। রাজা বললেন, দেখো তো বিছানায় পিঁপড়ে বা ছারপোকা আছে। কুট করে কামড়ে আমায় জ্বালিয়ে দিয়েছে।
ব্যতিব্যস্ত হয়ে দাসদাসীরা বিছানার চাদর উলটে ফেলল। অগ্নিমুখ কামড় দিয়েই পালং-এর খাঁজের মধ্যে লুকিয়েছিল। মন্দবিসর্পিনী চাদরের ভাঁজে থাকায় সহজেই ধরা পড়ল। রাজার দুই খাস চাকর আঙুলের মাঝে টিপে তার মৃত্যু ঘটাল।
■■■■■
নীলবর্ণ শিয়ালের কীর্তি
গ্রাম থেকে দূরে এক বনে বাস করত এক শিয়াল। একদিন রাতে খাবারের খোঁজে ঘুরতে ঘুরতে সে হাজির হল একটা গ্রামে। গ্রামের মধ্যে কুকুরের দল শিয়ালকে দেখতে পেয়ে তাকে তাড়া করল।
প্রাণের তাগিদে ছুটতে ছুটতে শিয়াল ঢুকে পড়ল এক বাড়িতে। বাড়িটা ছিল এক ধোপার। উঠোনে এক গামলা ভরতি নীল রং গোলা ছিল। শিয়াল দৌড়ে এসে পড়ল সেই গামলার মধ্যে। মুহূর্তের মধ্যে তার শরীরের রং হয়ে গেল নীল। নীল বর্ণ শিয়াল বনে ফিরে এলে কেউই তাকে চিনতে পারল না। জঙ্গলের পশুরা এরকম অদ্ভুত জীব কখনো দেখেনি। ভয়ে তারা পালাতে লাগল। শিয়াল ছিল মহাচালাক। সে মাথা খাটিয়ে বুদ্ধি বার করল। অন্যান্য জন্তুদের বলল, ভয় পেয়ো না। ঈশ্বর আমাকে তোমাদের রাজা হিসাবে পাঠিয়েছেন। তোমরা আমার আদেশ পালন করবে। আমি তোমাদের রক্ষা করব।
বনের পশুরা তাকে বিশ্বাস করে রাজা হিসাবে মেনে নিল। প্রণাম করে তারা বলল, আদেশ করুন কী করতে হবে। শিয়াল বলল, রাজাকে তোমরা সেবা করবে, সব রকম ভালো খাবার জোগাড় করে দেবে। বনের সব পশুরা শিয়ালকে রাজার মতো মান্য করে দেখে শিয়ালের আর অহংকার ধরে না। নিজেদের জাত ভাইদের সে অবহেলায় দূরে সরিয়ে রাখল।
একদিন সন্ধ্যাবেলা আকাশে চাঁদ উঠেছে। চারদিক জোছনায় ভেসে যাচ্ছে। মনের আনন্দে বনের শিয়ালরা একসঙ্গে ডেকে উঠল- হুকা হয়। নীলবর্ণ শিয়ালটি তার
জাতভাইদের ডাক শুনে আনন্দে নিজেকে সামলাতে না পেরে সঙ্গীদের সঙ্গে মাথা তুলে ডাকতে আরম্ভ করল। নীলবর্ণ শিয়ালের গলার স্বর শোনামাত্রই সকল পশুরা তাকে চিনে ফেলল। তারা বুঝল সামান্য একটা শিয়াল এতদিন তাদের বোকা বানিয়েছে।
রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সব পশুরা শিয়ালের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যে তাকে মেরে ফেলল।
জন্মগত স্বভাব বদলে ফেলা কঠিন
■■■■■
তিতির ও সমুদ্র
একজোড়া তিতির পাখি বাস করত সমুদ্রের ধারে গাছের নীচু ডালে। তিতির বউ একদিন তিতিরকে বলল, চলো, নিরিবিলি জায়গায় একটা বাসা বানাই। কারণ জিজ্ঞাসা করতে তিতির-বউ খবর দিল সে ডিম পাড়তে চলেছে।
তিতির বউকে বলল, চিন্তা কোরো না। সমুদ্রের এপাশেই বাসা বাঁধব আমরা।
তিতির-বউ বলল, না না, এখানে সব ডিম সমুদ্রের ঢেউ এসে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
বউকে নিশ্চিত করে তিতির বলল, 'আমার বাচ্চাদের ক্ষতি করার ক্ষমতা নেই সমুদ্রের ?”
সমুদ্র এইসব কথা শুনে ভাবল, ভারি আস্পর্ধা তো ছোটো পাখিটার। এমন শিক্ষা দেব পাখিটাকে যে সারাজীবন মনে রাখবে। তিতির আর তার বউ গাছের নীচু ডালে বাসা তৈরি করে ডিম পাড়ল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল কবে ডিম ফুটবে।
কয়েকদিন কেটে যাবার পর বউকে বলল তিতির, দু-একদিনের মধ্যে ফুটবে ডিম। চলো আজ একটু ঘুরে আসি আর বাচ্চাদের জন্য খাবার জোগাড় করে আনি। দুজনে বেরিয়ে যাবার পরই সমুদ্রের জল এসে ভাসিয়ে দিল তীর। তিতিরের
ডিমগুলোও চুরি করে নিয়ে গেল সমুদ্র। ফিরে এসে ভাঙাচোরা বাসা দেখে তিতির-বউ পাগলে মতো কাঁদতে লাগল। দেখলে তো, তোমার জন্যই আজ আমার ডিমগুলোর এই অবস্থা, বলে উঠল তিতির-বউ।
চিন্তা কোরো না, ফিরিয়ে আনব তোমার ডিমগুলোকে, বলে ওঠে তিতির। সমুদ্রের জল আমি ছেঁচে ফেলে সমুদ্রকে শুকিয়ে ফেলব।
তিতির-বউ বলল, তোমার একার পক্ষে এই কাজ সম্ভব নয়। সকল বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে করতে হবে এই কাজ।
মাছরাঙা, বক এইসব বন্ধুবান্ধবদের তিতির সমুদ্রকে শুষে ফেলার কথা বলাতে তারা পরামর্শ দিল গরুড়ের কাছে যেতে। গরুড় সব কথা শুনে অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন, চলো, সমুদ্রকে শুষব। অবিলম্বেই তিতিরের ডিম তিতিরের কাছে ফিরে আসা দরকার। গরুড়ের কাছ থেকে নারায়ণ সব শুনলেন। নারায়ণের বিশ্রাম স্থান সমুদ্র হলেও সমুদ্রের এই অন্যায় কাজের জন্য নারায়ণ অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হলেন। নারায়ণ গরুড়কে বললেন যে সমুদ্রের কাছ থেকে তিনি তিতিরের ডিম ফিরিয়ে আনবেন। নারায়ণ সমুদ্রের কাছে পৌঁছে তাঁর ধনুকে জুড়লেন অগ্নিবাণ। তিনি সমুদ্রকে
বললেন, তোর এত আস্পর্ধা। তুই তিতিরের ডিম চুরি করিস। দে ফিরিয়ে তিতিরের ডিম, না হলে মুহুর্তের মধ্যে তোকে ডাঙা করে ফেলব। ভয়ে সমুদ্র তিতিরের সব ডিম দিল ফিরিয়ে। মনের আনন্দে তিতির তার বউ-এর হাতে ফিরিয়ে দিল সব ডিমগুলি।
■■■■
কচ্ছপ ও রাজহাঁস
এক সরোবরে একটা কচ্ছপ ও দুটো রাজহাঁস বাস করত। তিনজনের মধ্যে ছিল খুব বন্ধুত্ব। মনের আনন্দে তারা সময় কাটাত। সেই দেশে একবার অনেকদিন বৃষ্টি না হওয়ার জন্য নদী, সরোবর সব শুকিয়ে যেতে লাগল। পাখিরা বাঁচার আশায় নিরাপদ জায়গায় উড়ে চলে যেতে লাগল।। রাজহাঁস দুটো বিপদের কথা চিন্তা করে নিরাপদ জায়গায় উড়ে যাবার কথা চিন্তা করল। তারা যখন তাদের বন্ধু কচ্ছপের কাছে বিদায় নিতে গেল, তখন কচ্ছপ বলল, 'আমাকেও তোমরা তোমাদের সঙ্গে নিয়ে চলো।'
রাজহাঁসেরা বলল, কীভাবে তুমি আমাদের সাথে যাবে? তুমি তো ভাই আমাদের মতো উড়তে পারো না।
কচ্ছপ বলল, 'এটা তো খুবই সহজ কাজ। একটা লাঠি তোমরা এনে দাও। সেই লাঠির মাঝখানটা দাঁত দিয়ে আমি কামড়ে ধরব। আর তোমরা ঠোঁট দিয়ে লাঠির দুদিক ধরে থাকবে এবং আমি তোমাদের সঙ্গে উড়ে যাব।'
রাজহাঁসরা কাচ্ছপের এই প্রস্তাবে রাজি হল কিন্তু কচ্ছপকে সাবধান করল- 'দেখো ভাই, উড়ে যাবার সময় তুমি ভুলেও মুখ খুলবে না। মুখ খুললেই তুমি লাঠি থেকে মাটিতে পড়ে সঙ্গে সঙ্গেই মারা যাবে।'
কচ্ছপ বলল, না না তোমরা চিন্তা কোরো না। আমি কখনো এই ধরনের বোকামি করব না। আমি একদম চুপচাপ থাকব। পরের দিন সকালে রাজহাঁস দুটি তাদের বন্ধু কচ্ছপকে নিয়ে উড়ে চলল মাঠের ওপর দিয়ে। রাজহাঁসেরা লাঠির দুপাশ ধরেছিল আর কচ্ছপ সেই লাঠির মাঝখানটা দাঁত দিয়ে শক্ত করে কামড়ে ধরল। অনেক মাঠ ও পাহাড় পেরিয়ে তারা যাচ্ছিল শহরের ওপর দিয়ে উড়ে। শহরের লোকেরা এরকম অবাক দৃশ্য কখনো দেখেনি। তারা চিৎকার করে বলল, 'কী অদ্ভূত ব্যাপার! একটা কচ্ছপকে লাঠির মাঝখানে নিয়ে দুটো পাখি উড়ে যাচ্ছে। ভারি মজার ব্যাপার তাই না।' কচ্ছপকটাকে পেলে মাংস করে খাওয়া যায়। শহুরে লোকেদের চেঁচামেচি শুনে কচ্ছপের খুব রাগ হল। খানিকক্ষণ রাগ চেপে রইলেও বার বার এক কথা শুনে রেগে গিয়ে সে বলল, 'বোকাদের দল, ছাই খা তোরা।' কথা শেষ হওয়ার আগেই কচ্ছপটি লাঠি থেকে খসে মাটিতে পড়ে গেল এবং অবশেষে মারা গেল।
■■■■■
হাতি ও চড়ুইনি
এক বনের মধ্যে একটা গাছে বাসা বেঁধে বাস করত একজোড়া চড়ুই পাখি। বেশ সুখেই দিন কাটছিল তাদের। একদিন চড়ুই গিন্নি কয়েকটি ডিম পাড়ল। মনের আনন্দে তারা বাচ্চা হবার আশায় দিন গুণছিল।
হঠাৎ একদিন ঘটল একটি দুর্ঘটনা। একটি বুনো হাতি গরমে অস্থির হয়ে বনবাদাড় দাপিয়ে ছুটে যাচ্ছিল। চড়ুই চড়ুইনির বাসার তলা দিয়ে যাবার সময় সব ডালপালা ভেঙে ফেলল হাতি তার শুঁড় দিয়ে। সঙ্গে সঙ্গেই ডিমগুলো পড়ে গেল বাসা থেকে এবং ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।.
পাগলের মতো কেঁদে উঠল চড়ুইনি। এই সময় ছুটে এল তাদের প্রাণের বন্ধু
কাঠঠোকরা। বন্ধুকে সান্ত্বনা দিল কাঠঠোকরা— 'ভেঙে পড়ো না, শোক সামলাও।
চড়ুইনি বলল, ‘আমার সন্তানদের মৃত্যু আমি ভুলতে পারছি না।' যেভাবেই হোক এই শয়তান হাতিটাকে শাস্তি দিতে হবে, তবেই মনের শান্তি হবে।
কাঠঠোকরা তাকে বলল, তার এক মাছি বন্ধুর কথা। বীণারব নামে এই বন্ধুই বিপদের দিনে তাকে সাহায্য করবে। বীণারবকে চড়ুইনির এই বিপদের কথা বলাতে হাতিকে মারার জন্য সে তাঁদের ব্যাঙ বন্ধু মেঘনাদের সাহায্য নেওয়ার কথা বলে।
ব্যাঙের কাছে যাবার পর সকলে মিলে আলাপ আলোচনা করে হাতিকে মারার একটা উপায় বের করল।
ঠিক করা হল, হাতি যখন বিশ্রাম করবে, মাছি গিয়ে তখন গান করে ঘুম পাড়াবে।
কাঠঠোকরা তখন তার লম্বা ঠোঁট বিধিয়ে হাতির চোখ অন্ধ করে দেবে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে হাতি জলের কাছে যেতে চাইবে। ব্যাঙ তখন তার দলবল নিয়ে কাছেই কোনো গর্তের ধারে থাকবে বসে। জলাশয় ভেবে সেদিকে ছুটতে গিয়ে গর্তে পড়ে মৃত্যু হবে হাতির।
পরিকল্পনা অনুযায়ী পরের দিন হাতির বিশ্রামের সময় মাছি গান শুনিয়ে তাকে আরামে চোখ বুজতে দিল। কাঠঠোকরা গিয়ে ওই সময় দিল তার চোখ অন্ধ করে।
যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে জলাশয়ের খোঁজে যাবার সময় যে গর্তের কাছে ব্যাঙ ও তার দলবল বসেছিল সেখানেই গড়িয়ে পড়ে মারা গেল হাতি।
সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতায় হাতির মৃত্যুতে সন্তানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে পেরে খুশি হল চড়ুই ও চড়ুইনি।
চড়ুইনি ও বানর
এক বনে একটি আমগাছের ডালে মনের সুখে একজোড়া চড়ুই বসবাস করত।
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হল। চড়ুই-চড়ুইনি সেই প্রচন্ড দুর্যোগে কোথাও না বেরিয়ে নিজেদের বাসাতেই রয়ে গেল।
সেই বনেই বাস করত একটি বানর। এই দুর্যোগের দিনে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভিজে বানরের অবস্থা হল কাহিল। ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে সে এসে সেই আমগাছের তলায় হাজির হল। বানরকে ঠকঠক করে কাঁপতে দেখে দয়াপরবশ হয়ে চড়ুইনি বলল, ভাই জলে ভিজে তোমার ভারি কষ্ট হচ্ছে। আমরা কেমন বাসা বেঁধে সুখে আছি। তোমার তো মানুষের মতো হাত পা আছে। একটা বাসা বাঁধলে জলে ভিজে এত কষ্ট পেতে হয় না। তুমি বেশ আমাদের মতো সুখে থাকতে পারো।
চড়ুইনির কথা শুনে রেগে আগুন হয়ে বানর বলল, কী— যত বড়ো মুখ নয় তত
বড়ো কথা। তোর তো সাহস কম নয়। সামান্য একটা পাখি হয়ে তুই আমায় জ্ঞান দান করছিস। আমার সুখশান্তি নিয়ে তোকে চিন্তা করতে হবে না।
চড়ুইনি বলল, রাগ কোরো না ভাই, তোমার দুঃখে আমার প্রাণ ফেটে যাচ্ছে।
একটা বাসা থাকলে এই বৃষ্টিতে তোমায় আর ভিজতে হত না। মনের আনন্দে তুমি দিব্যি আমাদের মতো নিজের বাসায় আরাম করতে।
রেগে গিয়ে বানর দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলল, দাঁড়া, তুই বড্ড বেড়েছিল।
আজ তোকে আমি এমন শিক্ষা দেব যে তুই সারা জীবন মনে রাখবি। বানর এক লাফে গাছে উঠে চড়ুইয়ে বাসা মাটিতে আছড়ে ভেঙে ফেলল।
চড়ুই-চড়ুইনি সময়মতো বাসা থেকে উড়ে যাওয়ার জন্য মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা পেল।
বেজি ও বক
বিশাল এক বন। সেই বনের মধ্যে এক বটগাছে বাস করত একদল বক। সেই গাছেরই কোটরে বাস করত এক বিষধর কালকেউটে। ভারি দুষ্টু ছিল এই সাপ। বকের ছানাদের সে খেয়ে ফেলত।
এক বক একবার শোকে কাতর হয়ে পুকুর পাড়ে বসে বিলাপ করছে। তার সবগুলি ছানাকেই কেউটে খেয়ে নিয়েছে।
ওই পুকুরের এক কাঁকড়া বকের এই কাতর অবস্থা দেখে বলল, কী বকভাই কাঁদো কেন ?
আর বোলো না। ওই বটগাছের কোটরে যে কেউটে বাস করে সে আমাদের ছানাগুলোকে খেয়ে ফেলে। বক বলে উঠল, কী করে যে শয়তানটাকে মারা যায় বুঝতে পারছি না।
চালাক কাঁকড়া ভাবল, এমন বুদ্ধি দেব ব্যাটা কেউটেও মরবে আর বকের বংশও ধ্বংস হবে। এই বকগুলো আমাদের প্রায় খেয়ে ফেলে। ব্যাটারা আমাদের জাত শত্রু।
কাকড়া বলল, কালকেউটে থাকলে তোমাদের বংশ বলে কিছুই থাকবে না। তোমাদের বট গাছের তলায় এক গর্তে একটি বেজির বাস। এক কাজ করো। মাছের টুকরো বেজির গর্তের থেকে সাপের কোটর পর্যন্ত ছড়িয়ে দাও। বেজি মাছের গন্ধে গন্ধে গাছে উঠে বদমাইশ সাপটাকে মেরে ফেলবে।
কাঁকড়ার বুদ্ধিমতো বক বাসায় ফিরে সেই কাজ করল। গর্তের ভেতর থেকে মাছের।গন্ধ পেয়ে বেরিয়ে এল বেজি। মাছের মাংস খেতে খেতে গাছে উঠল বেজি।
কেউটে সাপটাকে টুকরো টুকরো করে বেজি তো মারলই, এরপর গাছে যত বক ছিল খেয়ে একে একে সবাইকে বধ করে ফেলল। কেউটের হাত থেকে বক ছানাদের রক্ষা তো হলই না, কাঁকড়ার কু-বুদ্ধি শুনে বকেদের নিজেদেরও প্রাণনাশ ঘটল।
■■□■■
জীর্ণধন ও দাঁড়িপাল্লা
জীর্ণধন নামে এক বণিক বাস করত এক নগরে। একবার সে ঠিক করল বিদেশে যাবে বাণিজ্য করতে।
বিদেশ যাবার আগে তাঁর পূর্বপুরুষের সম্পত্তি একটি ভারী লোহার দাঁড়িপাল্লা গচ্ছিত রেখে গেল সে এক শ্রেষ্ঠী বন্ধুর বাড়িতে।
প্রচুর অর্থ উপার্জন করে দেশে ফিরল জীর্ণধন। বন্ধুর কাছে সে দু-একদিন পর তার দাঁড়িপাল্লা চাইতে গেল।
শ্রেষ্ঠী উত্তর দিল, সে দাঁড়িপাল্লা নেই, ইঁদুরে খেয়ে ফেলেছে। বিস্ময়ে হতবাক জীর্ণধন বুঝল শ্রেষ্ঠী তার দাঁড়িপাল্লা চুরি করেছে। সে ঠিক করল শ্রেষ্ঠী বন্ধুকে উচিত শিক্ষা দেবে।
নদীতে স্নান করতে যাবে জীর্ণধন। শ্রেষ্ঠী বন্ধুকে বলল, ছেলেকে একটু পাঠাও না ভাই আমার সঙ্গে, চানের জিনিসপত্তর বয়ে দেবে। শ্রেষ্ঠীর ছেলে গেল জীর্ণধনের সঙ্গে।।এই সুযোগে শ্রেষ্ঠীর ছেলেকে লুকিয়ে রাখল জীর্ণধন।
জীর্ণধন এসে বলল, নদীতে স্নান করছিলাম। নদীর পাড় থেকে তোমার ছেলেকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল বাজপাখি।
শ্রেষ্ঠী বলল, আমার ছেলেকে বাজপাখি কখনও ছোঁ মেরে নিতে পারে না।
জীর্ণধন উত্তর দিল, ইঁদুর যদি লোহার দাঁড়িপাল্লা খেতে পারে, তাহলে বাজপাখিও ছোঁ মেরে ছেলেকে তুলে নিয়ে যেতে পারে।
দুজনে গেল নগরের বিচারকের কাছে। বিচারক সব শুনে বললেন, সত্যি কথা বললে দুজনেই নিজের নিজের জিনিস ফেরত পাবে।
কোনো উপায় না দেখে শ্রেষ্ঠী জীর্ণধনকে ফিরিয়ে দিল তার লোহার দাঁড়িপাল্লা।
জীর্ণধনও শ্রেষ্ঠীকে তার আদরের পুত্রকে ফিরিয়ে দিল।
■■■■
মূর্খ বানরের কীর্তি
এক রাজার ছিল একটি পোষা বাঁদর। রাজা তাঁর এই প্রিয় বাঁদরটিকে খুব আদর করতেন। প্রতি মুহুর্তেই প্রিয় এই বাঁদরটির প্রতি ঝরে পড়ত তার ভালোবাসার বৃষ্টি।
রাজার যত্নে, আদরে ও ভালোভালো খাবার খেয়ে মনের আনন্দেই দিন কাটছিল বানরের। বনের পশু হলেও রাজার কাছে শিক্ষা পেয়ে বানর মানুষের মতো অনেক কাজ করত।
রাজার সবসময়ের সঙ্গী ছিল রাজার প্রিয় বানর। ছোটোখাটো বহু কাজ রাজার প্রয়োজনমতো বানর করে দিত। রাজা ও বানর উভয়েই একে অপরের সঙ্গ উপভোগ করতেন।
গ্রীষ্মের দুপুর। রাজা খাটে শুয়ে
দিবানিদ্রা উপভোগ করছেন। খাটের পাশে রাজার প্রিয় সঙ্গী বানর। পাখা দিয়ে হাওয়া করে সে রাজাকে আরাম দিচ্ছে।
এমন সময় হয় এক কাণ্ড। হঠাৎ কোথা থেকে একটা মাছি এসে বসল। রাজার বুকের ওপর।
বানর তো রেগে লাল - কী রাজার
বুকের ওপরে মাছি! এই বলে বানর
পাখার হাওয়া দিয়ে তাড়াল মাছিকে। কিছুক্ষণ পর আবার রাজার বুকের ওপর এসে বসল মাছি। বানর বারবার মাছি তাড়ায় আর মাছি এমন বেয়াদব, বার বার এসে বসে রাজার বুকের ওপর।
রেগে লাল হয়ে বানর ভাবল- 'আজ মাছির দফারফা করব।' ছোট্ট একটা মাছি, তার এত সাহস। রাজার বুকের ওপর এসে বসে। এই বলে মাছিটাকে মেরে শেষ করে দেওয়ার জন্য রাজার তরোয়াল তুলে নিল বানর।
ঘুমন্ত রাজা এই সব কিছুই জানেন না। তরোয়াল নিয়ে ঘুমন্ত রাজার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রইল মূর্খ বানর। মাছি এসে বসল রাজার গলার ওপর। আর যায় কোথা, বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে বানর দিল তরোয়ালের কোপ বসিয়ে।
মাছি তো মুহুর্তের মধ্যে পালাল উড়ে। ধারালো তরোয়ালের আঘাতে রাজার মুগু হল ধড় থেকে বিচ্ছিন্ন। প্রিয় বানরের বোকামির জন্য ঘটল রাজার অকালমৃত্যু।
হাতি ও ইঁদুরের কথা
অনেকদিন আগে মস্ত বড়ো এক শহর ছিল। ঝিলের ধারে অবস্থিত এই শহরটি ছিল ছবির মতো সাজানো। শহরে ছিল অনেক সুন্দর বাড়ি ও মন্দির।
এই শহরের লোকেরা ছিল খুব সুখী। বহুদিন পর শহরটা আর সুন্দর থাকল না, একটা ধ্বংসস্তূপের আকার নিল।
শহরটা ধ্বংস হওয়ার জন্য শহরের বাসিন্দারা অন্য জায়গায় চলে গিয়েছিল। তাদের সঙ্গে তারা তাদের গোরু, ঘোড়াদের নিয়ে গিয়েছিল। শহরে একমাত্র পড়ে থাকল ইঁদুরের দল।
ইঁদুররা মহাসুখে সেই শহরে বাস করতে লাগল। এখন এটা একটা ইঁদুর নগরী।
ইঁদুরদের পরিবার, তাদের আত্মীয়স্বজন সেই শহরের মনের আনন্দে বাস করতে থাকল। ইঁদুরের মামা, কাকা, ভাই বোন, কর্তা-গিন্নী সকলেই এই শহরের আনাচে কানাচে সুখে বাস করে। তারা আবার এই শহরে বিভিন্ন রকম উৎসব পালন করে। ইঁদুররা বসন্ত উৎসব, ধান কাটার উৎসব এইসব নিয়ে প্রায় ব্যস্ত থাকত। জীবনে দুঃখ বলে কোনো কিছু তাদের ছিল না। তাদের জীবন ছিল সুখের সাগর।
ইঁদুররা যে শহরে বাস করত সেখান থেকে বেশ কিছু দূরের একটা জঙ্গলে একদল হাতি বাস করত।
এই হাতিদের রাজা ছিল খুব ভালো ও দয়ালু স্বভাবের। দলের অন্যান্য হাতিদের সে সবসময় খেয়াল রাখত। তাদের বিপদে আপদে সে সবসময় হাতিদের রক্ষা করত।
গজরাজের এই সুন্দর স্বভাবের জন্য সব হাতিরা তাকে ভালোবাসত ও মনের আনন্দে একসঙ্গে বাস করত।
একবার এই হাতিরা মহাবিপদে পড়ল। বহু বছর ধরে বৃষ্টি না হওয়ার জন্য সব নদী নালা শুকিয়ে গেল। খাবার জলের সমস্যা দেখা গেল। হাতিরা জল তেষ্টায় ছটফট করতে লাগল। তারা বুঝতে পারল না কীভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাবে।
জলের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল হাতিরা। অনেক খোঁজাখুঁজির পর তারা সেই ঝিলের খোঁজ পেল যেই ঝিলের ধারে শহরের ইঁদুররা বাস করত। ঝিলের খোঁজ পেয়ে হাতিরা পাগলের মতো সেইদিকে ছুটতে লাগল। ঝিলে যাবার পথে পড়ল ইঁদুরে শহর। হাতিরা যখন সেই শহর দিয়ে যাচ্ছিল তখন হাতিদের পায়ের চাপে বহু ইঁদুর মারা পড়ল। বহু ইঁদুর আহত হল। প্রতিরাতে বহু ইঁদুরের মৃত্যু হতে লাগল। হাতিরা বুঝতেও পারল না তাদের জন্য ইঁদুর নগরীর হাজার।হাজার ইঁদুরদের কত ক্ষতি হচ্ছে। ইঁদুররা তো পড়ল মহাবিপদে। তারা গভীর চিন্তায় পড়ল। তারা একটা জরুরি সভা ডাকল। এক বুড়ো বিজ্ঞ ইঁদুর পরামর্শ দিল, যাও গজরাজের সঙ্গে দেখা কর।গজরাজকে গিয়ে যদি আমাদের বিপদের কথা বলা হয়, তিনি সব শুনে হাতিদের বলতে পারেন যে তারা যেন শহরের মধ্যে দিয়ে না যায়। হাতিরা যদি শহরের মধ্যে দিয়ে না যায় তবেই ইঁদুররা বেঁচে যাবে।
তিনটি ইঁদুরকে বাছা হল গজরাজের কাছে অনুরোধ নিয়ে যাবার জন্য। এই তিনটি ইঁদুর ভয়ে ভয়ে গজরাজের কাছে গেল। তারা গজরাজকে প্রণাম জানিয়ে বলল, মহারাজ, আপনি আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন। আমরা মহাবিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেছি। প্রতিদিন হাতির দল আমাদের ইঁদুর নগরীর মধ্য দিয়ে ঝিলে জল খেতে যায়।
আপনারা হলেন শক্তিশালী, অসীম ক্ষমতার অধিকারী। আপনাদের পায়ের চাপে প্রতিদিন।বহু ইঁদুরের মৃত্যু ঘটছে। আমরা হলাম ছোটো জীব। আপনাদের শক্তির কাছে আমরা কিছুই নই। দয়া করুন মহারাজ। আপনিই পারেন আমাদের এই বিপদের থেকে বাঁচাতে।
এরপর তারা আরও, বলল, কোনো সময় যদি আমরা আপনাদের কোনো কাজে আসি তবে নিশ্চয় আমরা তা করব।
দয়ালু স্বভাবের গজরাজ এই তিনটি ইঁদুরকে বলল, তোমরা নিশ্চিন্তে ইঁদুর নগরীতে ফিরে যাও। তোমাদের আর কোনো ক্ষতি হবে না।
ইঁদুররা তো এরপর মহাসুখে থাকল। বহুদিন পর দেশের রাজার যুদ্ধের জন্য হাতি দরকার পড়ল। তিনি হাতির খোঁজে লোক পাঠালেন। তারা খুঁজতে খুঁজতে সেই জঙ্গলে এল যেখানে বহু হাতির বাস ছিল। রাজার লোকজন গর্ত খুঁড়ে ডালপালা দিয়ে চাপা দিল। হাতি ধরার ফাঁদ ছিল এই গর্তগুলো। হাতিরা যখন জঙ্গলে ঘোরাঘুরি করছিল তখন তারা এই গর্তে পড়ে গেল। গর্তে পড়ে হাতিরা ছটফট করতে লাগল, কিন্তু বৃথাই চেষ্টা। রাজার লোকজন এসে তাদের গর্ত থেকে তুলে দড়ি দিয়ে দিয়ে বাঁধল। রাজার লোকজন এতগুলো হাতিকে একসঙ্গে ধরতে পেরে খুব খুশি হল। তারা এই আনন্দ সংবাদ রাজাকে দিতে গেল। গজরাজ তার দলের হাতিদের বন্দি অবস্থায় দেখে ছটফট করতে লাগল ও চোখের জল ফেলতে লাগল। সে বুঝতে পারল না
এই বিপদ থেকে কীভাবে অন্যান্য হাতিকে রক্ষা করা যায়।
অনেক চিন্তার পরে হঠাৎ গজরাজের ইঁদুরদের কথা মনে পড়ল। সব হাতিরা কাঁদে আটকা পড়লেও গজরাজের রানি ফাঁদে আটকা পড়েনি। গজরাজ রানিকে ডেকে বলল, ইঁদুরদের কাছে যাও। তাদের গিয়ে আমাদের বিপদের কথা বলো।
রানি তখনই ইঁদুরদের কাছে গিয়ে হাতিদের বিপদের কথা বলল। ইঁদুররা এই কথা শুনে বলল, কোনো চিন্তা কোরো না। একসময় গজরাজ আমাদের জীবন দান করেছিলেন। আজ হাতিদের বিপদে আমরা প্রাণ দিয়ে তাদের রক্ষা করব।
দলে দলে ইঁদুররা এসে সেই জঙ্গলে হাজির হল। তারা ধীরে ধীরে তাদের ধারালো দাঁত দিয়ে তাদের দড়ি কেটে ফেলল। এইভাবে তারা সমস্ত হাতিকে মুক্ত করল, হাতিরা।তো খুব খুশি।
ইঁদুররা গজরাজের ঋণ শোধ করার সুযোগ পেয়ে খুশি হল। ইঁদুর ও হাতিরা আনন্দে মেতে উঠল। গজরাজ বলল, এই তো আনন্দের উৎসব, মিতালির উৎসব। আজ আমরা হাতি ও ইঁদুররা একসঙ্গে নাচব, গাইব, মজা করব। গজরাজ বলল, আজ থেকে আমরা প্রকৃত বন্ধু।
মি ত্ৰ প্ৰাপ্তি
পঞ্চতন্ত্রের হিতবচন
১। বিপদে যে হতবুদ্ধি হয় না, সে সহজেই বিপদ কাটিয়ে উঠতে পারে।
২। ওষুধ, অর্থ, সুপরামর্শ ও মহৎজনের বুদ্ধি— এসব যার সহায় সে অসাধ্য সাধন করে।
৩। বিপদে যে কাছে থাকে সেই সত্যিকারের আপনজন।
৪। অর্থ কাজে না লাগলে সেই অর্থ মূল্যহীন।
