তাতে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যাবে। বক্তা কোন প্রসঙ্গে এ কথা বলেছেন ? এই উক্তির আলোকে বক্তার চরিত্র বিশ্লেষণ করো। বহুরূপী গল্প । দশম শ্রেণী
![]() |
প্রশ্ন: ‘তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যাবে। -বক্তা কোন্ প্রসঙ্গে এ কথা বলেছেন? এই উক্তির আলোকে বক্তার চরিত্রবিশ্লেষণ করো।
উত্তর> উদ্ধৃতিটি সুবোধ ঘোষের ‘বহুরূপী' গল্প থেকে গৃহীত। বক্তা হলেন গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বহুরূপী হরিদা। হরিদা জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীর ছদ্মবেশে খেলা দেখাতে গিয়ে প্রণামির টাকা না-নিয়ে ফিরে এসেছিলেন। অবাক হয়েছিলেন গল্পের কথক ও তাঁর বন্ধু অনাদি, ভবতোষরা। অভাবী হরিদাকে টাকা না-নেওয়ার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করলে, হরিদা অভিনয়ের প্রতি শ্রদ্ধা এবং একজন আদর্শ শিল্পীর মর্যাদ প্রসঙ্গ তুলে কথাটি বলেছেন।
||| হরিদা শুধুমাত্র পেশাগত জীবনে বহুরুপী নন, তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও নাটকীয় বৈচিত্র্যে ভরা। আপাতদৃষ্টিতে সমাজে অবহেলিত এই পেশায় নিযুক্ত মানুষের মধ্যেও যে-সততা, নিষ্ঠা, শ্রদ্ধার মতো গুণগুলি বেঁচে আছে তা লেখক দেখাতে চেয়েছেন এই গল্পে। অভাব হরিদার নিত্যসঙ্গী। হরিদা কিন্তু সেই অভাবকে দূরে সরিয়ে দিতে গতে বাঁধা জীবনের পথে পা বাড়াননি। এসব সম্ভব হয় একমাত্র তাঁর নির্লোভী ও সংযমী জীবনযাপনের জন্যই। তাই জগদীশবাবুর বাড়িতে বিরাগীর ছদ্মবেশে খেলা দেখাতে গিয়ে অভাবী হরিদা তাঁর দেওয়া সমস্ত সুযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।
কথক ও তাঁর বন্ধুরা যখন অভাবী হরিদাকে প্রণামি না-নেওয়ার জন্য কাঠগড়ায় তুলেছেন, হরিদা তখন শিল্প ও শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নির্লিপ্তভাবে বলেছেন, তাতে যে আমার ঢং নষ্ট হয়ে যায়।'
প্রশ্ন: 'অদৃষ্ট কখনও হরিদার এই ভুল ক্ষমা করবে না।'- হরিদা কী ভুল করেছিলেন? অদৃষ্ট ক্ষমা না করার পরিণাম কী?
উত্তর > বহুরূপী হরিদা পাড়ার ছেলেদের কাছ থেকে জগদীশবাবুর বাড়িতে আগত সন্ন্যাসী সম্পর্কে বিভিন্ন ঘটনা শুনে তিনি অনুভব করেন যে, তিনি প্রকৃত সন্ন্যাসী নন। সর্বত্যাগী সন্ন্যাসীর প্রকৃত স্বরূপ কেমন হওয়া উচিত তা বোঝাতেই,
|| এরপর হরিদা জগদীশবাবুর বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করেন এবং বিরাগীর ছদ্মবেশে হরিদা সকলকে বিস্মিত করেছিলেন। জ্যোৎস্নালোকিত রাতের স্নিগ্ধ পরিবেশে তাঁর আদুড় গায়ের ওপর সাদা উত্তরীয় এবং পরনে ছোটো বহরের থান আর হাওয়ায় উড়তে থাকা চল ও ঝোলার মধ্যে থাকা গীতা—সব মিলিয়ে মনে হয়েছিল যেন তিনি জগতের সীমার ওপার থেকে হেঁটে এসেছেন। হরিদার চোখের উদাত্ত-উজ্জ্বল দৃষ্টি, কণ্ঠস্বর ও মুখের ভাষায়; জগদীশবাবুর হৃদয় করুণাময় সজল হয়ে উঠেছিল। তিনি এই সর্বত্যাগী বিরাগীকে তুষ্ট করতে তীর্থ ভ্রমণের অজুহাতে প্রণামি হিসেবে একশো এক টাকা নিবেদন করেন। কিন্তু বহুরূপী হরিদার অন্তরের বৈরাগ্যে এবং নিজ শিল্পের প্রতি আন্তরিক সততার কারণে, সেই টাকার থলি হেলায় ফেলে দিয়ে চলে আসেন। বিরাগীর ছদ্মবেশধারী হরিদাকে কেউ চিনতে পারেনি। বর ভাবাবেগে আপ্লুত অভিভূত হয়ে জগদীশবাবু একশো এক টাকা প্রণামি দিলেও গ্রহণ করেননি—বিরাগী রূপধারী দরিদ্র হরিদার এটাই ভুল।
!! খাঁটি সন্ন্যাসীর মতোই জগদীশবাবু কর্তৃক প্রদত্ত টাকা হেলায় ফেলে চলে
আসেন হরিদা। কারণ টাকা নিলে তাঁর ঢং নষ্ট হয়ে যেত। অথচ তিনি নিতান্ত দরিদ্র মানুষ। বহু রূপ দেখিয়ে তাঁর যৎসামান্য রোজগারে দিন চলে। বেশিরভাগ দিন চাল না-থাকায় হাঁড়িতে শুধু জলই ফুটে যায়। এমন মানুষের পক্ষে অতগুলো টাকা পেয়ে না-নেওয়ার বিলাসিতা ভবিষ্যতে তাঁর দুর্ভোগ বাড়াবে।
