আফ্রিকা কবিতায় যে মানবতার মর্ম বাণী ধ্বনিত হয়েছে, তা কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো। আফ্রিকার কবিতা। দশম শ্রেণী
![]() |
প্রশ্ন: 'আফ্রিকা' কবিতায় মানবতার মর্মবাণী ধ্বনিত হয়েছে।—কবিতা অবলম্বনে আলোচনা করো।
উত্তর> সাম্রাজ্যবাদের ঘোর বিরোধী, মানবতার পূজারি রবীন্দ্রনাথ। তাই মুসোলিনির ইথিওপিয়ায় অনুপ্রবেশকে ধিক্কার জানিয়ে লেখা ‘আফ্রিকা’ কবিতায় মানবতার মর্মবাণী ধ্বনিত হবে এটাই স্বাভাবিক। কবিতাটি আফ্রিকার সমাজ ও রাজনৈতিক ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।
সৃষ্টির আদিতে আফ্রিকা তৈরি হয়েছিল প্রকৃতির খেয়ালে। আদিম প্রকৃতি নিজের মনের মতো করে গড়ে তুলেছিল তাকে। বাকি পৃথিবীর কাছে সে ছিল অপরিচিত। পরবর্তীকালে সভ্যসমাজের দৃষ্টি পড়ে এই অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাদেশের ওপর। ক্রমে ক্রমে আফ্রিকা হয়ে ওঠে পশ্চিমি সভ্য দেশগুলির জন্য ক্রীতদাস জোগানের ক্ষেত্র। এমনকি সে দেশের আদিম প্রকৃতির কোলে লুকিয়ে থাকা সম্পদও তাদের নজর এড়ায় না। পৃথিবীর তথাকথিত সভ্য দেশগুলির 'আফ্রিকা' কবিতায় লোভ আর অমানবিকতায় লুণ্ঠিত হয় আফ্রিকা। তার ধুলো-মাটি কাদা হয় সেখানকার মানুষদের রক্তে কান্নায়। লেখা হয় তার অপমানের ইতিহাস। কিন্তু কার্য মানবতার পূজারি। তাই সভ্যতার নামে মানবতার এই অপমান তিনি সহ্য করেননি। দিনবদলের সন্ধিক্ষণে তাই পৃথিবীর সমস্ত শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের হয়ে অপমানিত, লাঞ্ছিত আফ্রিকার কাছে তিনি ক্ষমাপ্রার্থনা করেছেন। সভ্যতার এই সংকটের দিনে ঘৃণা বা হিংসা নয়, মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা আর সংবেদনশীলতাকেই আশ্রয় করতে চেয়েছেন তিনি।
প্রশ্ন: ‘উদভ্রান্ত সেই আদিম যুগে'—কবি আফ্রিকাকে যেভাবে দেখেছিলেন লেখো। এই আফ্রিকার প্রতি উন্নত পৃথিবীর দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল।
উত্তর> বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত 'আফ্রিকা' কবিতাটি ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে অনুজ কবি অমিয় চক্রবর্তীর অনুরোধে রচনা করেন। কবি আফ্রিকা মহাদেশের জন্মরহস্যকে এক আশ্চর্য কাব্যিক রূপ দিয়েছেন। পাতগাঠনিক তত্ত্ব অনুযায়ী পাতের নড়াচড়ার ফলে এশিয়া মহাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই এই আফ্রিকার সৃষ্টি। কবির ভাষায়-
রুদ্র সমুদ্রের বাহু প্রাটী ধরিত্রীর বুকের থেকে
ছিনিয়ে নিয়ে গেল তোমাকে, আফ্রিকা –
সৃষ্টির আদিম লগ্নে রুদ্র সমুদ্রের বাহু তাকে মূল ভূখণ্ড থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তারপর বিচ্ছিন্ন আফ্রিকাকে বনস্পতির নিবিড় পাহারায় অর্থাৎ দুর্গম আরণ্যক জগতের ছায়াঘেরা রহস্যময়তায় যেন চিরতরে বেঁধে রাখে। এই রহস্যময় বন্যতাই তাকে তার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করেছিল।
|| সৃষ্টির আদিতে প্রকৃতির রহস্যময়তায় ঢাকা আফ্রিকা মহাদেশ বাকি পৃথিবীর কাছে ছিল অজানা, অচেনা এক দেশ। সভ্যসমাজের কাছে সে ছিল উপেক্ষার পাত্র। পশ্চিমি সভ্যতা আফ্রিকাকে পদানত করে ক্রীতদাস জোগানোর এক উর্বর ক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। অরণ্যের গভীরে লুকিয়ে থাকা আফ্রিকার প্রাকৃতিক সম্পদ ক্রমশ প্রকাশ পেলে সাম্রাজ্যবাদী শাসক দল অমানবিকভাবে আক্রমণ করল আফ্রিকাকে-
"পঙ্কিল হলো ধুলি তোমার রক্তে অশ্রুতে মিশে,
দস্যু-পায়ের কাঁটা-মারা জুতোর তলায় বীভৎস কাহার পিণ্ড
চিরচিহ্ন দিয়ে গেল তোমার অপমানিত ইতিহাসে"
রক্ত, ঘাম আর কান্নায় ভিজে গেল আফ্রিকার মাটি। ঔপনিবেশিক শোষণ-পীড়ন আর লাঞ্ছনার শিকার আফ্রিকার সেই অপমান ব্যথা হয়ে বেজেছে কবির বুকে। তাই তিনি মনে করেন অপমানিত আফ্রিকা ও তার অধিবাসীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে নেওয়াটাই সভ্যসমাজের প্রতিটি শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য।
