জ্ঞানচক্ষু গল্পের সকল প্রশ্নের উত্তর দশম শ্রেণি বাংলা - Online story

Monday, 23 February 2026

জ্ঞানচক্ষু গল্পের সকল প্রশ্নের উত্তর দশম শ্রেণি বাংলা

 




জ্ঞানচক্ষু গল্পের বিষয়সংক্ষেপ: 

আশাপূর্ণা দেবী তাঁর ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পটিতে শিশুমনের অনুভূতির জগতের এক অদ্ভুত ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। তপন আর-পাঁচটা শিশুর মতোই গল্পের বই পড়তে ভালোবাসে। নিজের মনে মনে সেই গল্পের লেখকদের সে ভিন গ্রহের কোনো আশ্চর্য মানুষ ভেবে একটা আলাদা জায়গায় স্থান দেয়। তার কাছে এটা অজানা ছিল যে, লেখকরাও আর-পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতোই। কিন্তু তার ছোটোমাসির বিয়ের পর তপন যখন জানতে পারে তার নতুন মেসোমশাই অধ্যাপক হওয়ার পাশাপাশি একজন সত্যিকারের লেখক, তখন তার স্বপ্নের লেখক ক্রমশ বাস্তবে নেমে আসে। জলজ্যান্ত লেখককে সামনাসামনি দেখে এই প্রথম তপন বুঝতে পারে লেখকরা আসলে তার বাবা, কাকা, মামাদের মতোই সাধারণ মানুষ, তার জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়। গরমের ছুটিতে তপন মামারবাড়িতে কয়েকদিন থেকে যায়। ওদিকে একই কারণে মেসোমশাইও শ্বশুরবাড়িতে আসেন। তাই জলজ্যান্ত লেখককে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয় তপনের, আর তা থেকেই তার মনে লেখক হওয়ার ইচ্ছে জাগে। দুপুরে সকলের দিবানিদ্রার সুযোগে তিনতলার সিঁড়িতে সে তার হোমটাস্কের খাতায় আস্ত একটা গল্প লিখে ফেলে। তারপর নিজেই তা পড়ে শিহরিত হয়ে ওঠে। উপর থেকে নেমে তার কাছের মানুষ ছোটোমাসিকে তা দেখায়। ছোটোমাসি হইচই শুরু করে এবং ছোটো মেসোমশাইকে সেটা দেখায়। তখন মনে মনে মৃদু উত্তেজনা অনুভব করে। ছোটোমাসির অনুরোধে আর নতুন শ্বশুরবাড়ির সকলের মন রাখতে মেসোমশাই তপনের গল্পের প্রশংসা করেন এবং সামান্য কারেকশনে যে তা ছাপানো যেতে পারে সে-কথাও বলেন। মাসির পীড়াপীড়িতে তিনি ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় গল্পটি ছাপানোর ব্যবস্থা করে দেবেন বলে কথা দেন ।

ইতিমধ্যে তপন মামার বাড়ি থেকে ফিরে আসে। বাড়ির সকলে তাকে কবি, সাহিত্যিক, কথাশিল্পী বলে ঠাট্টাতামাশা করে। একদিন সন্ধ্যায় মাসি-মেসো 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকাসহ হাজির। তা দেখে তপনের বুকের রক্ত ছলাত করে ওঠে। তার মনে হয় পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে! 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকার সূচিপত্রে তার নাম দেখে সারাবাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। এত আনন্দের মাঝেও কোনো এক অজানা কারণে তপনের মনখারাপ করে। তার মা তাকে গল্পটা পড়তে বলেন। লজ্জা ভেঙে পড়তে যায় তপন। তারপর সে গড়গড়িয়ে পড়ে চলে নিজেরই লেখা অজানা সব লাইন। সবাই ধন্য ধন্য করে। কিন্তু তপনের চোখে জল আসে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে যে, কোনোদিন কাউকে লেখা ছাপাতে দেবে না। নিজের লেখা সে নিজের হাতেই দিয়ে আসবে পত্রিকার দফতরে। তার কাঁচা হাতের লেখা যদি সুপারিশের অভাবে ছাপা না-হয় তাতেও তার দুঃখ থাকবে না। আসলে ‘একটু-আধটু কারেকশন'-এর নাম করে ছোটোমেসো তার লেখা গল্পটা আগাগোড়াই বদলে দিয়েছেন। সে-লেখার কোথাও তপনের কোনো ভূমিকা নেই। তাই এ হল ছোট্ট

তপনের কাছে আত্মগ্লানির দিন, আত্মপ্রসাদের নয়। আজ তপনের জ্ঞানচক্ষু খুলে গেছে। অন্তদৃষ্টি দিয়ে সে সত্য-মিথ্যার বিচার করতে শুরু করেছে ।



জ্ঞানচক্ষু গল্পের নামকরণের সার্থকতা

সাহিত্যে নামকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর এই নামকরণ চরিতার্থ

সাহিত্যে নামকরণের করার জন্য লেখক কখনও চরিত্রকে, কখনও ঘটনাকে, পদ্ধতি কখনও-বা বিশেষ ব্যঞ্জনাকে আশ্রয় করেন। এখন'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নামকরণ কতটা সফল তা আমাদের বিচার্য বিষয়।

গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তপন কৌতূহলপ্রিয়। তাই লেখকদের সম্পর্কে তার একটা কৌতূহল ছিল। সে মনে করত লেখকরা বুঝি অন্য কোনো জগতের মানুষ। কিন্তু তার সদ্যবিবাহিত ছোটোমাসির স্বামী একজন লেখক এ কথা শুনে তপন বেশ অবাক হয়। আরও অবাক হয় যখন সে দেখে তার লেখক-মেসোর আচার- আচরণ, হাবভাব সবই তার বাবা, মামাদের মতো। এসব দেখে তার 'জ্ঞানচক্ষু' খুলে যায়। তপন বুঝতে নামকরণের সার্থকতা পারে লেখকরা আকাশ থেকে পড়া কোনো জীব নয়।

সুতরাং, সেও গল্প লিখতে পারে। অনুপ্রাণিত তপন একটা আস্ত গল্প লিখে ফেলে। সেই গল্প নতুন মেসোর প্রশংসা ও আশ্বাস পেয়ে অবশেষে ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পায়। বাড়িময় আনন্দের জোয়ার সকলের অনুরোধে ছাপার অক্ষরে লেখা নিজের গল্প পড়তে গিয়ে তপন দেখে গল্পের একটি লাইনও তার নয়। মেসো কলম চালানোয় তার লেখা নিজস্বতা হারিয়েছে। আরও একবার তার জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়। সে ভাবে পরবর্তী কালে তার লেখা কাউকে ছাপতে দিলে সে নিজের হাতেই দেবে।

বাস্তববোধ বা অন্তর্দৃষ্টির জাগরণকেই লেখিকা ব্যঞ্জনার্থে নামকরণ করেছেন—যা যথাযথ ও সার্থক।



প্রশ্ন:- 'একেবারে নিছক মানুষ। এ কথার প্রমাণ কী ছিল?

উত্তর:  নতুন মেসোমশাইয়ের লেখক পরিচয়ে আপ্লুত তপন লক্ষ করে

যে, লেখক হলেও তিনি সাধারণের মতোই দাড়ি কামান, খেতে বসে খেতে

পারবেন না বলে অর্ধেক তুলে দেন, স্নান করেন, ঘুমোন,খবরের কাগজের খবর নিয়ে গল্প ও তর্ক করেন, সিনেমা

দেখেন ও বেড়াতে বেরোন একেবারে সাধারণ মানুষের এইসমস্ত আটপৌরে

ব্যাপার মেসোমশাইয়ের মধ্যে দেখে তপন প্রশ্নোদৃত মন্তব্যটি করেছিল।


 প্ৰশ্ন:  'নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের।- ‘জ্ঞানচক্ষু’ বলতে কী বোঝ? তপনের জ্ঞানচক্ষু কীভাবে খুলে গিয়েছিল?

অথবা, ‘নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের। কীভাবে তপনের জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল ?

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবীর 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পে জ্ঞানচক্ষু বলতে মানুষের অন্তর্দৃষ্টিকে বোঝানো হয়েছে, যার সাহায্যে মানুষ প্রকৃত সত্যকে যাচাই করে নিতে পারে।

|| একজন লেখক সম্পর্কে তপনের মনে যে-ধারণা ছিল তা নতুন মেসোর

সংস্পর্শে এসে ভেঙে যায়। লেখকরা যে তার বাবা, মামা ও কাকাদের মতোই সাধারণ জীবনযাপন করে সেটা সে প্রত্যক্ষ করে। তাদের মতোই দাড়ি কামান, সিগারেট খান, খেতে বসে খাবার তুলে দেন, পলিটিকাল তর্কও করেন- এসব তপনের জ্ঞানচক্ষু দেখেই তপনের জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়। সে ভাবে লেখকরা আকাশ থেকে পড়া কোনো জীব নয়, তারাও মানুষ।


প্ৰশ্ন:  ‘রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই কথাটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।

'

উত্তর:  উদ্ধৃতিটি আশাপূর্ণা দেবীর 'জ্ঞানচক্ষু' গল্প থেকে গৃহীত। 'জহর'

অর্থাৎ মূল্যবান রত্ন, আর মূল্যবান রত্ন বিশেষজ্ঞকে জহুরি বলা হয়। এক্ষেত্রে

জহুরি বলতে নতুন মেসোকে বোঝানো হয়েছে। লেখক-মেসোকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তপন একটা আস্ত গল্প লিখে মাসিকে দেখায়। মাসি তা নিয়ে সারাবাড়িতে শোরগোল বাধিয়ে তার লেখক-স্বামীকে দেখাতে যায়। তপন ব্যাপারটায় আপত্তি তুললেও মনে মনে পুলকিত হয় এই ভেবে যে, তার লেখার মূল্য একমাত্র যদি কেউ বোঝে তবে ছোটোমেসোই বুঝবে, কেন-না জহুরির জহর চেনার মতো একজন লেখকই পারে কোনো লেখার মূল্যায়ন করতে।


প্রশ্ন: 'তখন অবশ্য মাসির এই হইচইতে মনে মনে পুলকিত হয়।'-মাসি কেন হইচই করেছিল?

উত্তর:- গরমের ছুটিতে মামার বাড়িতে এসে নতুন মেসোকে দেখে তপনের

মনে লেখক সম্পর্কে যেসব ধারণা ছিল তা ভেঙে যায়। জলজ্যান্ত লেখকের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তপন অনুপ্রাণিত হয়ে একটা আস্ত গল্প লিখে ফেলে। আর তা মাসির হাতে পড়ায় মাসি হইচই শুরু করে দেয় এবং তা নিয়ে তার লেখক স্বামীর কাছে যায়। এতে লাজুক তপন অপ্রস্তুত হলেও মনে মনে পুলকিত হয়, কারণ তার লেখার প্রকৃত মূল্য কেউ বুঝলে তা নতুন মেসোই বুঝবে।


প্রশ্ন:- মেসোর উপযুক্ত কাজ হবে সেটা।–কোন্ কাজকে মেসোর উপযুক্ত কাজ বলা হয়েছে?

উত্তর:  লেখকরা যে সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে নতুন মেসোকে দেখে তপনের জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল। তপন নতুন মেসোকে অহরহ কাছ থেকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে একটা আস্ত গল্প লিখে তার প্রিয় ছোটোমাসিকে দেখায়। গল্পটি নিয়ে ছোটোমাসি রীতিমতো হইচই ফেলে দেয়। শুধু তাই মেসোর উপযুক্ত কাজ নয়, মাসি গল্পটি তার লেখক স্বামীকেও দেখায়। গল্প দেখে তিনি সামান্য কারেকশন করে দিলে সেটা যে ছাপা যেতে পারে এ কথা বলেন। আর এ কথা শুনেই মাসি সেটা ছাপিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানায়, যেটা কিনা তপনের মেসো হিসেবে উপযুক্ত কাজ হবে।


প্রশ্ন:'পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে—অলৌকিক বলতে কী বোঝ? কোন্ ঘটনাকে কেন ‘অলৌকিক ঘটনা' বলা হয়েছে? 

উত্তর:- ‘অলৌকিক' শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল 'অবাস্তব' বা ‘অসম্ভব ব্যাপার।

>  মেসোমশাইকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তপন একটা গল্প লিখে ফেলে।

সেই গল্পটি মাসির প্ররোচনায় ও মেসোর প্রভাবে সত্যিই একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ছোট্ট তপনের কাছে তার গল্প ছাপার অক্ষরে প্রকাশ পাওয়ার ঘটনা ছিল স্বপ্নের মতোই কাল্পনিক। তাই এই ঘটনাটিকে অলৌকিক বলা হয়েছে।

প্রশ্ন: ‘কথাটা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল।— কোন্ কথা শুনে কেন তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল ?

উত্তর- তপন এতদিন ভেবে এসেছে লেখকরা বুঝি অন্য জগতের মানুষ।

সাধারণ মানুষদের সঙ্গে তাদের কোনো মিলই নেই। তাই যখন সে শুনল যে তার ছোটো মেসোমশাই বই লেখেন, আর সেই বই ছাপাও হয় তখন তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। নতুন মেসোমশাই একজন সত্যিকারের লেখক। এই আশ্চর্য খবরটা শুনেই তপনের চোখ মার্বেলের মতো গোল গোল হয়ে গেল।

 প্রশ্ন - ‘সে সব বই নাকি ছাপাও হয়।- উক্তিটিতে যে-বিস্ময় প্রকাশিত হয়েছে, তা পরিস্ফুট করো।

উত্তর:- আশাপূর্ণা দেবী রচিত 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পে তপন নামের বালকটি তার ছোটোমাসির সদ্যবিবাহিত স্বামী অর্থাৎ তার ছোটোমেসো যে একজন লেখক, উক্তিটিতে এ কথা জেনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। লেখকেরা যে সাধারণ মানুষ এবং তার মেসোমশাই একজন লেখক, যাঁর বই ছাপা হয়—এ তথ্য তার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। আলোচ‍্য

উদ্ধৃতাংশে বালক তপনের মনের সেই বিস্ময় প্রকাশ পেয়েছে।

প্রশ্ন;- “এ বিষয়ে সন্দেহ ছিল তপনের।—তপন কে? কোন্ বিষয় সন্দেহ ছিল তপনের?

উত্তর : আশাপূর্ণা দেবী রচিত ‘জ্ঞানচক্ষু’ গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তপন। সে স্কুলে পড়ে। সাহিত্যের প্রতি তপনের ঝোঁক ছোটোবেলা থেকেই।

| তপন লেখকদেরকে এক অন্য জগতের বাসিন্দা বলে মনে করত। তাঁরাও যে আর-পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই রোজকার জীবনযাপন করেন, তা ছিল তপনের কল্পনার বাইরে। সে আগে কোনোদিন কোনো লেখককে কাছ থেকে দেখেনি। এমনকি লেখকদের যে দেখা পাওয়া যায় এ কথাও তার জানা ছিল না। তাই লেখকরা যে তার বাবা, কাকা, মামাদের মতোই সাধারণ মানুষ এ ব্যাপারে তার সন্দেহ ছিল।


প্রশ্ন: 'বিকেলে চায়ের টেবিলে ওঠে কথাটা উঠল।-কোন কথাটা উঠেছিল?

উত্তর/ 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পে তপন লেখক-মেসোকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়

একটি গল্প লেখে তার স্কুলে ভরতি হওয়ার দিনের অভিজ্ঞতা নিয়ে। সেই

ছোটোমাসির হাতে পড়লে মাসি তা নিয়ে বেশ হইচই করে তার লেখক-স্বামীরগল্পটি দেখায়। তার স্বামী গল্প দেখে তপনকে ডেকে তিনি গল্পের প্রশংসা করেন এবং সামান্য কারেকশন করে দিয়ে তা ছাপার যোগ্য এ কথাও বলেন। মাসির অনুরোধে তপনের মেসো তপনকে

কথা দেন 'সন্ধ্যাতারা'-য় তার গল্প ছাপিয়ে দেবেন। এ কথাটাই চায়ের টেবিলে উঠেছিল।

প্রশ্ন:-  'তোমার গল্প আমি ছাপিয়ে দেব। -এখানে বক্তা কোন উদ্ধৃতিটির মধ্য দিয়ে বক্তার কোন মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়? 

উত্তর;- আলোচ্য উদ্ধৃতিটির বক্তা তপনের ছোটোমেসো।

| তপনের লেখা গল্পটা পড়ে ছোটোমেসো তাকে উৎসাহ দেন।

তিনি এ কথাও বলেন যে, লেখাটা একটু কারেকশন করে দিলে ছাপানোও যায়। তাঁর সঙ্গে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকার সম্পাদকের জানাশোনা আছে। মেসো অনুরোধ করলে তিনি না-করতে পারবে

না। আপাতদৃষ্টিতে এটি তাঁর উদারতার পরিচয় বলেই মনে হয়। কিন্তু একটু গভীরে বিচার করলে বোঝা যায়, শ্বশুরবাড়ির লোকেদের কাছে নিজের প্রভাব জাহির করার জন্যই তিনি এ কাজ করেছিলেন।

প্রশ্ন: ‘তপনের হাত আছে। চোখও আছে।—এখানে 'হাত'  ও ‘চোখ’ আছে বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর:  তপনের গল্প শুনে আর সবাই হাসাহাসি করলেও নতুন মেসো তার

প্রতিবাদ করে আলোচ্য উক্তিটি করেন। এখানে হাত আছে বলতে বোঝানো হয়েছে যে, তপনের লেখার

ক্ষমতা আছে, বা ভাষার দখল আছে। আর 'চোখ' আছে কথার অর্থ হল, তপন তার চারপাশের দুনিয়াটা ভালো করে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখতে ও উপলব্ধি করতে পারে। তার গল্প লেখার বিষয় নির্বাচন থেকেই এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায়।


প্রশ্ন:  ‘তপন কৃতার্থ হয়ে বসে বসে দিন গোনে।- তপন কৃতার্থ হয়েছিল কেন?


উত্তর- কৃতার্থের কারণ : তপনের জীবনে প্রথম ও সদ্য লেখা গল্পটি তার মাসি তপনের লেখক-মেসোকে দেখায়। তার সঙ্গে গল্পটি ছাপিয়ে দেওয়ার কথা বলে। এ কথা শুনে তপনের মেসো 'সখ্যাতারা' পত্রিকায় গল্পটি ছাপিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করে নিয়ে যান। এতে তপন কৃতার্থ হয়েছিল। সেইসঙ্গে রোমাঞ্চিত হয়ে সে দুরুদুরু বুকে গল্প প্রকাশের আশায় দিন গোনা শুরু করেছিল। বালক হৃদয়ের উত্তেজনা বোঝাতেই এমন কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন :  'যেন নেশায় পেয়েছে।- কীসের নেশা? কীভাবে তাকে নেশায় পেয়েছে?


উত্তর:  আশাপূর্ণা দেবীর 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তপনকে গল্প লেখার নেশায় পেয়েছে।

|| তপন আগে মনে করত গল্প লেখা অনেক কঠিন কাজ। সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়। তপনের ধারণা ছিল লেখকরা ভিন্ন গোত্রের মানুষ। কিন্তু লেখক-ছোটোমেসোকে দেখে অনুপ্রাণিত তপন সাহস করে লিখে ফেলে একটা আস্ত গল্প। ছোটোমাসির হাত ঘুরে সেই গল্প ছোটোমেসোর হাতে পড়ে। তিনি তপনকে উৎসাহ দিতে গল্পটা পত্রিকায় ছাপিয়ে দেবেন বলে কথা দেন। উৎসাহিত তপন গল্প লেখার নেশায মেতে ওঠে।


প্রশ্ন:  ‘গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল তপনের – তপন কে? তার গায়ে কেন কাঁটা দিয়ে উঠল?

উত্তর- আশাপূর্ণা দেবীর ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পের মূল চরিত্র হল তপন।

| তপন তার নতুন মেসোমশাইকে দেখে বোঝে লেখকেরাও আর সকলেরই মতো সাধারণ মানুষ। এর আগে সে কখনও জলজ্যান্ত একজন  লেখককে এভাবে এত কাছ থেকে দেখেনি।

মেসোমশাইয়ের দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে সে স্কুলের হোমটাস্কের খাতায় একাসনে বসে আস্ত একটা গল্প লিখে ফেলে। লেখার পর নিজের প্রথম গল্পটি পড়ে রোমাঞ্চে ও উত্তেজনায় তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠেছিল।


প্রশ্ন: ‘কিন্তু তাই কি সম্ভব?'—কী সম্ভব নয় বলে বক্তার মনে হয়েছে?

উত্তর:  আশাপূর্ণা দেবী রচিত ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পে তপনের লেখক-মেসো তার সদ্য লেখা গল্পটি পড়ে মুগ্ধ হয়ে যান। তপনের মাসি গল্পটি ছাপিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানালে তিনি তাতে রাজি হয়ে গল্পটি নিজের সঙ্গে নিয়ে যান। অবশেষে একদিন সত্যিই তা ছাপা হলে তপন বিস্মিত হয়ে প্রশ্নে উদ্ধৃত কথাটি ভাবে।

 > এই ভাবনায় বালক তপনের

কিশোর-হৃদয়ের অবিশ্বাস ও মুগ্ধতাবোধ প্রকাশ পায় ।



প্রশ্ন:  'বিষণ্ণ মন নিয়ে বসে আছে এমন সময় ঘটল সেই ঘটনা। -কেন মন বিষণ্ণ হয়েছিল ? এমন সময়ে কী ঘটেছিল ?

উত্তর লেখক-মেসোকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তপন একটি গল্প লিখে ফেলে। মেসো ছাপিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তপনের গল্পটি নিয়ে চলে যান। এবার তপন অধীর আগ্রহে দিন গোনে। দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার দরুন ক্রমে হতাশ হয়ে ছাপানোর আশা ছেড়ে দেওয়ায়; তার মন দুঃখে বিষণ্ণ হয়ে ওঠে।

তপন যখন প্রায় গল্প ছাপানো নিয়ে আশা ছেড়ে দিয়েছে ঠিক এমন সময়ে ছোটোমাসি আর মেসো একদিন তাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন।

তাঁদের হাতে ধরা একটি পত্রিকা, নাম ‘সন্ধ্যাতারা’। সেখানে সত্যিই ছাপা হয়েছে তপনকুমার রায়ের গল্প।

অবশেষে তপনের স্বপ্নপূরণ ঘটানো, এই ঘটনাই ঘটেছিল।


প্রশ্ন:  ‘সারা বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়।–কোন্ বাড়ির কথা এখানে বলা হয়েছে? শোরগোলটা কী ছিল ?

উত্তর:  ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পের অন্যতম চরিত্র তপনের বাড়ির কথা বলা হয়েছে প্রশ্নোদ্ধত অংশটিতে।

> প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে তপনের 'কাঁচা হাতের' গল্পটি 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছেপে বেরোলে সারাবাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। তপনের মেসো তাঁর কলমের কারেকশনে অপরিণত হাতের লেখাকে 'আঁটসাঁট' দেহে প্রকাশ করে দেন। ছাপার অক্ষরে প্রথম গল্প প্রকাশের উত্তেজনায় অনাবিল আনন্দে ভাসতে থাকে তপন। আর সেই খবরেই সারাবাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়।

তপনের বয়স অনুপাতে তার সৃষ্টিকর্মের জন্যই বাড়ির সকলে মন্দমধুর আলোচনায় সরব হয়ে ওঠে।


প্রশ্ন: 'ওর লেখক মেসো ছাপিয়ে দিয়েছে।—'ও' কে? লেখক-মেসোর কী ছাপিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে?


উত্তর- 'ও' বলতে আলোচ্য অংশে গল্পকার আশাপূর্ণা দেবী রচিত “জ্ঞানচক্ষু গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র বালক তপনের কথা বলা হয়েছে।

| তপনের মেসো তাঁর পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তপনের লেখা গল্প 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। এই সত্য জানার পর তপনের কোনো কোনো আত্মীয় তার কৃতিত্বকে খাটো করে দেখিয়ে প্রশ্নোদৃত মন্তব্যটি করেছিলেন।

প্রশ্ন:  ‘পত্রিকাটি সকলের হাতে হাতে ঘোরে—কোন পত্রিকা, কেন সকলের হাতে হাতে ঘুরছিল ?


উত্তর- সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় তপনের লেখা গল্প প্রকাশিত হওয়ার পর সেই পত্রিকাটি সকলের হাতে হাতে ঘুরেছিল।

|| লেখক মেসোকে দেখে তপন অনুপ্রাণিত হয়ে একটি গল্প লিখে ফেলে।

তারপর মেসো সেটিকে কিছুটা কারেকশন করে পত্রিকায় ছাপানোর ব্যবস্থা করে দেন। কিছুদিন পর লেখক মেসো সেই পত্রিকাটি নিয়ে বাড়িতে এলে জানাজানি হয়ে যায় তপন একটি গল্প লিখেছে যার নাম ‘প্রথম দিন’। তখন বাড়ির সকলে কৌতূহলবশত পত্রিকাটি হাতে নিয়ে দেখতে থাকে এবং সেই সূত্রেই পত্রিকাটি সকলের হাতে হাতে ঘোরে।


প্রশ্ন:  ‘আমাদের থাকলে আমরাও চেষ্টা করে দেখতাম- কার উক্তি? এমন উক্তির কারণ উল্লেখ করো ।

উত্তর- প্রশ্নে উদ্ধৃত উক্তিটির বক্তা হলেন তপনের মেজোকাকু।

| তপনের লেখক-মেসো তাঁর প্রভাব আর পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে ছোট্ট তপনের গল্পটি পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন। এ কথা শুনে বাড়ির বিভিন্ন সদস্য তপনের কৃতিত্বকে খাটো করার চেষ্টা করে। তপনের মেজোকাকুর উক্তিতেও সেই মধ্যবিত্ত মানসিকতারই প্রকাশ লক্ষ করা যায়।


প্রশ্ন :  'আজ আর অন্য কথা নেই,–'আজ' দিনটির বিশেষত্ব কী ? সেদিন আর অন্য কথা নেই কেন ?

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবী রচিত ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পে ‘আজ' বলতে সেই দিনটির কথা বোঝানো হয়েছে, যেদিন তপনের মাসি ও মেসো ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকার সংস্করণটি নিয়ে এলেন, যেটাতে তপনের লেখা গল্প প্রকাশিত হয়েছিল।

>  বালক তপনের লেখা গল্প যে সত্যি সত্যিই কোনো পত্রিকায় ছাপা হতে পারে, তা কেউই বিশ্বাস করেনি। কিন্তু যেদিন সত্যিই সেই অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটল, সেদিন সকলের মুখে মুখে বারবার এই ঘটনার কথাই আলোচিত হচ্ছিল।


প্রশ্ন:  'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় তপনের গল্প ছেপে বের হওয়ার পরেও তপনের এত দুঃখ হয়েছিল কেন?


উত্তর: তপন ভাবত লেখকরা কোনো স্বপ্নের জগতের মানুষ। কিন্তু

লেখক-মেসোকে দেখে তার ভুল ভাঙে। উৎসাহিত তপন নিজেই লিখে ফেলে একটা গল্প। ছোটোমেসোর উদ্যোগে সামান্য কারেকশনের পর সেটা ছেপেও বেরোয় ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায়। পত্রিকার সুচিপত্রে নিজের নাম ছাপার অক্ষরে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয় তপন।

কিন্তু গল্পটা পড়া শুরু করতেই সে বুঝতে পারে কারেকশনের নাম করে ছোটোমেসো তার গল্পটা আগাগোড়াই পালটে দিয়েছেন। নিজের লেখার পরিবর্তে একটা সম্পূর্ণ অচেনা লেখা দেখে তপনের আনন্দ দুঃখে পরিণত হয়।


প্রশ্ন:  "এর প্রত্যেকটি লাইনই তো নতুন আনকোরা, তপনের অপরিচিত’–‘এর' বলতে কীসের কথা বলা হয়েছে? কেন বলা হয়েছে?

উত্তর: প্রশ্নোকৃত অংশে 'এর' বলতে তপনের লেখা গল্পের বিষয়ে বলা

হয়েছে।

| তপনের নিজের লেখা গল্প ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপানোর উপযোগী করতে তার লেখক-মেসো একটু-আধটু কারেকশনের কথা বলে এবং নিজের পাকা হাতে কারেকশনও করে দেন। লেখা ছাপা হলে

তপন দেখে লেখক-মেসো গল্পটির সংশোধনের নামে প্রায় সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছেন। সেই গল্পকে আর যাই

হোব নিজের লেখা বলতে তপনের আটকাচ্ছে। তার প্রত্যেকটি লাইনই

তপনের কাছে নতুন, আনকোরা।


প্রশ্ন: ‘সত্যিই তপনের জীবনের সবচেয়ে সুখের দিনটি এল আজ – তপনের জীবনে সুখের দিনটি কীভাবে এল? গল্পের শেষে সুখের দিনটি কীভাবে দুঃখের দিন হয়ে উঠল?

উত্তর: লেখক-মেসোমশাইয়ের সৌজন্যে ও উদারতায় ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় তপনের গল্পটি প্রকাশিত হয়। ছাপার অক্ষরে তপনকুমার রায়ের গল্প প্রকাশ পাওয়ার এই দিনটি প্রাথমিকভাবে তার জীবনে সবচেয়ে সুখের দিন হয়ে উঠেছিল।

কেন দুঃখের দিন: 

| মাসির উৎসাহ আর প্ররোচনায় তপনের লেখক-মেসো সেই গল্পটি ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর সে দেখে পুরো গল্পটাই মেসো আগাগোড়া নতুন করে লিখে দিয়েছেন। এ গল্পে শুধু তার নামটুকুই আছে; অথচ সে কোথাও নেই। এই ঘটনা তপনের অন্তর্মনে আঘাত করে। লজ্জায়, অনুতাপে, আত্মসম্মান হীনতায় সে সকলের কাছ থেকে পালিয়ে ছাদের অন্ধকারে একলা দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলে। নিজের কাছে নিজেই এভাবে ছোটো হয়ে যাওয়ায় তার মনে হয়, ‘আজ’ জীবনে সবচেয়ে দুঃখের দিন।


প্রশ্ন:  ‘যে ভয়ংকর আহ্লাদটা হবার কথা, সে আহ্লাদ খুঁজে পায় না।-‘আহ্লাদ' হবার কথা ছিল কেন? ‘আহ্লাদ খুঁজে না পাওয়ার কারণ কী ?


উত্তর:  আশাপূর্ণা দেবী রচিত 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পে তপনের লেখা গল্পটি কাঁচা হাতের লেখা হলেও তা যদি হুবহু ‘সন্ধ্যাতারা পত্রিকায় ছাপা হত তবে তা পড়ে তপনের আহ্লাদ হওয়ার কথা ছিল।

|| লেখক-মেসোর প্রভাব ও পরিচিতির জোরে ছোট্ট তপনের লেখা গল্প ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তপনের লেখা গল্প প্রকাশ হওয়ার সংবাদে সারাবাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। কিন্তু তপনের কৃতিত্বের বদলে মেসোর মহত্ত্বকেই বাড়ির বড়োরা বেশি গুরুত্ব দেয়। তাদের মতে মেসোই ও গল্প ছাপিয়ে দিয়েছেন। এই কথাও ওঠে, উনি

না-থাকলে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকার সম্পাদক তপনের গল্প কড়ে আঙুল দিয়ে ছুঁয়েও দেখতেন না। এসব নানা কথায় তপন ক্রমশ যেন হারিয়ে যায়। তাই মনটা একটু তিন্তু হয়ে যায়, গল্প প্রকাশ হওয়ার ভয়ংকর আহ্লাদটা সে আর খুঁজে পায় না।


প্রশ্ন:  'তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের।-কে অপমানিত হয়েছিল ? কেন অপমানিত হয়েছিল?

উত্তর:  আশাপূর্ণা দেবীর 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নায়ক তপন অপমানিত হয়েছিল।

|| লেখক-মেসোমশাইকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ছোট্ট তপন একটি গল্প লিখে ফেলে। গল্প লেখার উত্তেজনায় সে গল্পটি ছোটোমাসিকে দেখায়। ফলে তা নতুন মেসোর হাতে পড়ে এবং তিনি তপনের লেখার প্রশংসা করেন; সেটি পত্রিকার ছাপিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। পত্রিকায় গল্প ছাপা হওয়ার পর তপন দেখে সমস্ত গল্পটাই মেসো তাঁর পাকা হাতের কলমে আগাগোড়া নতুন করে লিখ দিয়েছেন। নিজের লেখা গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা পড়ার যন্ত্রণা তাকে বিদ্ধ করে। এভাবে আত্মমর্যাদা হারানোর ফলে তপন অপমানিত বোধ করেছিল।


প্রশ্ন;  ‘আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন— 'আজ' বলতে কোন্ দিনটির কথা বলা হয়েছে? সেটি কী কারণে বক্তার কাছে সবচেয়ে দুঃখের দিন?


উত্তর:  আশাপূর্ণা দেবী রচিত ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পে তপনের নতুন মেসো তার ছোটোমাসিকে নিয়ে তাদের বাড়িতে হাতে করে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকার একটি সংখ্যা নিয়ে আসে, সেই দিনের কথা বলা হয়েছে।

> মাসির উৎসাহ আর প্ররোচনায় তপনের লেখক-মেসো সেই গল্পটি ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন। কিন্তু পত্রিকায় প্রকাশ হওয়ার পর সে দেখে পুরো গল্পটাই মেসো আগাগোড়া নতুন করে লিখে দিয়েছেন। এ গল্পে শুধু তার নামটুকুই আছে; অথচ সে কোথাও নেই। এই ঘটনা তপনের অন্তর্মনে আঘাত করে। লজ্জায়, অনুতাপে, আত্মসম্মান হীনতায় সে সকলের কাছ থেকে পালিয়ে ছাদের অন্ধকারে একলা দাঁড়িয়ে কেঁদে ফেলে। নিজের কাছে নিজেই এভাবে ছোটো হয়ে যাওয়ায় তার মনে হয়, ‘আজ’ জীবনে সবচেয়ে দুঃখের দিন।


প্রশ্ন> ‘শুধু এই দুঃখের মুহূর্তে গভীর সংকল্প করে তপন,- দুঃখের মুহূর্তটি কী? তপন কী Church করেছিল ?

উত্তর;  ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নায়ক তপনের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তটি একপলকে দুঃখের মুহূর্তে পরিবর্তিত হয়। 

  > সে প্রকাশিত গল্পটি পড়তে গিয়ে টের পায়, লেখক-মেসো গল্পটিকে কারেকশনের নামে প্রায় সম্পূর্ণ বদলে ফেলেছেন। এ গল্পকে আর যাই হোক তার নিজের লেখা বলা যায় না।

| এই ঘটনায় তপন সংকল্প করেছিল যে, যদি কোনোদিন নিজের কোনো লেখা ছাপাতে দেয়, তবে নিজে গিয়ে ছাপাতে দেবে। ছাপা হোক বা না-হোক অন্তত তাকে শুনতে হবে না যে, কেউ তার লেখা প্রভাব খাটিয়ে ছাপিয়ে দিয়েছে।



প্রশ্ন: ‘তপনকে যেন আর কখনো শুনতে না হয় - কী না-শোনার কথা বলা হয়েছে?

উত্তর-- ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নায়ক বালক তপন গল্প লেখায় যতই অপরিণত হোক-না-কেন, সে মনেপ্রাণে একজন লেখক। তার লেখা গল্পের ওপরে তার লেখক-মেসোর কারেকশনের নামে খোলনলচে বদলে দেওয়া তপনের কাছে অপমানজনক। এই ঘটনায় সে অভিমানে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। আত্ম অসম্মানে আহত তপন সংকল্প নেয় যে, পরবর্তীকালে লেখা ছাপাতে দিলে সে নিজে দেবে। তবু এ কথা তাকে শুনতে হবে না যে, অন্য কেউ তা প্রভাব খাটিয়ে ছাপিয়ে দিয়েছে।


প্রশ্ন: 'যদি কখনো লেখা ছাপতে দেয় তো, তপন নিজে গিয়ে দেবে'—কোন্ লেখার কথা বলা হয়েছে? সে-লেখা তপন নিজে গিয়ে ছাপতে দেবে কেন ?


উত্তর:  'জ্ঞানচক্ষু' গল্প থেকে গৃহীত উদ্ধৃতাংশে 'লেখা' বলতে তপনের

গল্পের কথা বলা হয়েছে।

>  তপনের জীবনের সবচেয়ে আনন্দঘন দিনটি মুহুর্তের মধ্যে সবচেয়ে দুঃখের দিনে পর্যবসিত হয়। কারণ পত্রিকায় প্রকাশিত গল্পটি তপন পড়তে  গিয়ে টের পায়, কারেকশনের নামে লেখক-মেসো প্রায় সম্পূর্ণ গল্পটিত বদলে দিয়েছেন। এ ঘটনায় সে আহত হয়। আর যাই হোক গল্পটিকে নিজের গল্প বলা যায় না।

বিশেষত নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়া যে কতটা দুঃখ ও অসম্মানের তা তপন উপলব্ধি করে। তাই এমন দুঃখের দিনে সে সংকল্প করে লেখা ছাপা হোক কিংবা নাই হোক; ভবিষ্যতে লেখা ছাপতে দিলে নিজে গিয়ে দেবে।


প্রশ্ন: 'কিন্তু নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের। - নতুন মেসোর পরিচয় দাও। তাঁকে দেখে তপনের জ্ঞানচক্ষু খুলে যাওয়ার কারণ কী?

উত্তর:- জ্ঞানচক্ষু' গল্পে তপনের নতুন মেসো হল তার ছোটোমাসির স্বামী।

তিনি একজন লেখক, বই লেখেন। ইতিমধ্যে তাঁর অনেক বই ছাপাও হয়েছে। সর্বোপরি তিনি একজন প্রফেসর।

| তপনের ছোটোমাসির বিয়ের পর নতুন মেসো যে লেখক, এ কথা শুনে তার কৌতূহলের অন্ত ছিল না। তার কাছে লেখক মানে ভিন গ্রহের কোনো

মানুষ, যারা সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। একজন লেখককে যে এত কাছ থেকে দেখা যায় কিংবা লেখকরা যে তপনের বাবা, ছোটোমামা বা মেজোকাকুদের মতো সাধারণ মানুষ হতে পারে, এ বিষয়েও তার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কিন্তু তার সেই ধারণাগুলো ভেঙে গেল, যখন দেখল তার ছোটোমেসোও তার বাবা, ছোটোমামা বা মেজোকাকুর মতোই দাড়ি কামান, সিগারেট খান, খেতে বসে অর্ধেক খাবার তুলে দেন, সময়মতো স্নান করেন, ঘুমোন।

ছোটোমামাদের মতোই খবরের কাগজের খবরে তর্ক ও শেষপর্যন্ত দেশ সম্পর্কে একরাশ হতাশা ঝেড়ে ফেলে সিনেমা দেখতে বা বেড়াতে চলে যান।

এসব বিষয়ে অন্যদের সঙ্গে মেসোর মিল দেখে তপনের জ্ঞানচক্ষু উন্মোচিত হয়। সে বুঝতে পারে লেখকরা আকাশ থেকে পড়া জীব নয়, নিছকই মানুষ।


প্রশ্ন: ‘রত্নের মূল্য জহুরির কাছেই।—‘রত্ন' ও ‘জহুরি' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? উদ্ধৃত উক্তিটির তাৎপর্য বুঝিয়ে দাও।

উত্তর:  আশাপূর্ণা দেবীর 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পে উদ্ধৃতিটি পাই। 'রত্ন' বলতে মূল্যবান পাথর বোঝায়। 'জহুরি' বলতে বোঝায় জহর অর্থাৎ রত্ন বিশেষজ্ঞকে।

ও 'জহুরি' যে-কোনো পাথরকে রত্ন বলে চালালে তা জহুরির চোখ এড়ানো মুশকিল। 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পে 'রত্ন' বলতে তপনের গল্পকে আর 'জহুরি' বলতে তার ছোটোমাসির স্বামী তথা নতুন  মেশোমশাইকে বোঝানো হয়েছে।


> সীমিত জীবনবৃত্তের পরিধিতে তপনের গল্পের বইয়ের সঙ্গে পরিচিতি থাকলেও লেখকদের সম্পর্কে তার কিছুই অভিজ্ঞতা ছিল না। তখন তাদের গ্রহান্তরের কোনো জীব ভাবত। ছোটোমাসির বিয়ের পর নতুন লেখক-মেসোর সঙ্গে যখন পরিচিত হল, তখনই তপনের লেখক সম্পর্কে সমস্ত ধারণা বদলে গেল। তার জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল। তপন তার বাবা, কাকা ও মামাদের সঙ্গে নতুন মেসোর কোনো তফাত পেল না। এসব কিছু মিলিয়েই তপন ভাবে তারই-বা লেখক হতে বাধা কোথায়? তাই সে গল্প লিখতে গিয়ে আস্ত একটা গল্প লিখে ফেলায় উত্তেজনায় ছোটোমাসিকে দেখায়। ছোটোমাসি তা মেসোকে ঘুম থেকে তুলে দেখায়।

ব্যাপারটায় তপনের মত না-থাকলেও সে মনে মনে পুলকিত হয়, কেন-না

জহুরির রত্ন চেনার মতো তার লেখার কদর একমাত্র নতুন মেসোই বুঝতে পারবে।



প্রশ্ন: 'পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে ?'—কোন্ ঘটনাকে অলৌকিক বলা হয়েছে? একে অলৌকিক বলার কারণ কী? 


অথবা, ‘পৃথিবীতে এমন অলৌকিক ঘটনাও ঘটে ?' 'জ্ঞানচক্ষু গল্প অনুসারে অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা দাও।

উত্তর-প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবীর গল্প ‘জ্ঞানচক্ষু'-র কেন্দ্রীয় চরিত্র তপন। বিশাল পৃথিবীতে স্বপ্ন বাস্তবতাবোধ নিয়ে আর-পাঁচটা শিশুর মতোই তারও পথ চলা। লেখকদের সম্পর্কে তার ধারণা সে-কথাই বলে। সেই তপন তার নতুন লেখক-মেসোমশাইয়ের সান্নিধ্যে এসে তার প্রতিভাকে বিকশিত করে কাঁচা হাতে লিখে ফেলে একটা আস্ত গল্প। সেই গল্প মেসোর হাতে গেলে মেসো তপনের ও বাড়ির লোকেদের মন রাখার জন্য তা সামান্য কারেকশন করে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন ও সেটি নিয়ে যান। এর বেশ কিছু দিন পর সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় গল্পটি ছেপে বেরোয়। তপনের কাছে এই চমকপ্রদ ঘটনাটিই অলৌকিক বলে মনে হয়েছিল।


| 'অলৌকিক' শব্দটির আভিধানিক অর্থ হল মানুষের পক্ষে যা সম্ভব নয়

বা পৃথিবীতে সচরাচর যা ঘটে না। এক্ষেত্রে ছোট লেখা গল্প পরিবেশ ও পরিস্থিতির সমন্বয়ে যেভাবে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল সেটাই অলৌকিক। আসলে তপনের লেখক

সম্পর্কে ধারণার অবসান, গল্প লেখা, তা মেসোর হাত ধরে ছাপার অক্ষরে

প্রকাশিত হওয়া প্রভৃতি ঘটনাগুলি তার কাছে এতটাই অবিশ্বাস্য যে, তার মনে হয় সমস্ত ঘটনাটিই যেন অলৌকিক।


প্রশ্ন: 'হঠাৎ ভয়ানক একটা উত্তেজনা অনুভব করে তখন।- তপন কেন উত্তেজনা অনুভব করে এবং তা 'ভয়ানক' কেন?

উত্তর:  নতুন মেসো তপনের স্বরচিত গল্প 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপার জন্য নিয়ে গেলে তার গল্প লেখার উৎসাহ আরও বৃদ্ধি পায়। উৎসাহের বশে তিনতলার সিঁড়িতে একান্ত নির্জনে একাসনে বসে তার হোমটাস্কের খাতায় লিখে ফেলে আস্ত আর একটি গল্প।

গল্পটি পড়ে নিজেই অবাক হয়। বিশ্বাস জন্মায় নিজের সামর্থ্যের প্রতি। সে যে একজন লেখক হতে চলেছে—এই উত্তেজনা সে অনুভব করে।

| নতুন মেসোকে দেখে তপনের যেমন লেখক সম্বন্ধে জ্ঞানচক্ষু খুলে গিয়েছিল, ঠিক তেমনভাবে তার গল্প লেখার উৎসাহও বেড়ে গিয়েছিল।

লেখক হতে চাওয়ার যে সুপ্ত ইচ্ছা তার মধ্যে ছিল তার পূর্ণতা পাওয়ার দিন যেন সে দেখতে পায়। উৎসাহভরে হোমটাস্কের খাতা নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠে একান্তে বসে লিখে ফেলে গোটা একটি গল্প। মা যেমন সন্তানকে দেখে খুশি হয় তাঁর নিজের অংশ হিসেবে ভেবে, তপনও তেমনি তার নিজের সৃষ্টিতে আনন্দিত হয়ে ওঠে। নিজের সৃষ্টি আগাগোড়া পড়ে তার শরীরে শিহরন খেলে যায়। সে ভাবতেই পারে না, এত সুন্দর একটা গল্প সে নিজেই লিখতে পারবে। নিজস্ব ভাব ও ভাবনার বাণীমূর্তিই আলোচ্য অংশে ভয়ানক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, যা তার গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

প্রশ্ন:  ‘তপন অবশ্য মাসির এই হইচইতে পুলকিত হয়’– মাসি হইচই করেছিল কেন? তপনের পুলকিত হওয়ার কারণই-বা কী ছিল?


উত্তর:  গরমের ছুটিতে নামার বাড়িতে এসে নতুন মেসোকে দেখে তপনের

মনে লেখক সম্পর্কে যেসব ধারণা ছিল তা ভেঙে যায়। জলজ্যান্ত লেখকের সঙ্গে সময় কাটিয়ে তপন অনুপ্রাণিত হয়ে একটা আস্ত গল্প লিখে ফেলে। সদ্য লেখা গল্পের এক অভাবনীয় উত্তেজনায় তিনতলার সিঁড়ি থেকে নেমে এসে তপন তার চিরকালের বন্ধুসম ছোটোমাসিকে সেই গল্প দেখায়। আর মাসি তাতে একটু চোখ বুলিয়েই তার পিঠ চাপড়ে বাহবা দেওয়ার পাশাপাশি হইচই শুরু করে দেয় এবং তা নিয়ে তার লেখক স্বামীর কাছে যায়।

| ছোটোমাসি যখন গল্পে চোখ বুলিয়ে মেসোকে দেখাতে যায়, তখন তপন ব্যাপারটায় প্রথমে আপত্তি তুললেও মনে মনে পুলকিত হয়। পুলকিত হয় এই ভেবে যে, তার লেখার মূল্য একমাত্র কেউ যদি পুলকিত হওয়ার বোঝে তবে ছোটো মেসোমশাই বুঝবে। কেন-না জহুরির জহর চেনার মতো একজন লেখকই পারে কোনো লেখার মূল্যায়ন করতে। তপনের ভাবনার রূপান্তর ঘটে, যখন তার লেখক-মেসো গল্প দেখে তপনকে ডেকে তার গল্পের প্রশংসা করেন এবং সামান্য কারেকশন করে সেই গল্পটা ছাপিয়ে দেওয়ার কথাও দেন।


প্রশ্ন:: 'নতুন মেসোকে দেখে জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল তপনের-কোন্ ঘটনায় জ্ঞানচক্ষু খুলে গেল? গল্প অনুসারে সত্যিই কি এই ঘটনায় তপনের জ্ঞানচক্ষু খুলেছিল ?



উত্তর- গল্পকার আশাপূর্ণা দেবীর 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের প্রধান চরিত্র তপন।

তার শিশুমনে লেখক বা সাহিত্যিক সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো ধারণা ছিল না। সে ভারত লেখকেরা বুঝি কোনো ভিন গ্রহের জীব। ছোটোমাসির বিয়ে হওয়ার পর তপন জানতে পারে নতুন মেসো একজন লেখক এবং তাঁর অনেক বই ছাপা হয়েছে। জলজ্যান্ত একজন সত্যিকারের লেখককে চোখের সামনে দেখে সে বুঝতে

পারে লেখকেরা তার বাবা, ছোটোমামা কিংবা মেজোকাকুর মতোই সাধারণ মানুষ। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই তপনের প্রাথমিক জ্ঞানচক্ষু খুলে যায়।

|| লেখক মেসোমশাইয়ের দৃষ্টান্তে অনুপ্রাণিত হয়ে তখন নিজেও একটা

আস্ত গল্প লিখে ফেলে এবং গল্প লিখে ফেলার রোমাকে ও উত্তেজনায় তা সে বন্ধু মনোভাবাপন্ন ছোটোমাসিকে দেখায়। ছোটোমাসির প্ররোচনায় আর নতুন মেসোর প্রভাবে সেই গল্পটি ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কিন্তু পত্রিকায় ছাপা গল্পটি পড়ে তপন টের পায় সংশোধনের নামে মেসো লেখাটির আগাগোড়া বদলে দিয়েছেন। এ গল্পে

তপন কোথাও নেই। আর বাড়িতেও মুখে মুখে রটে যায় মেসোর দৌলতেই তার গল্প ছাপা হয়েছে। এ ঘটনা আত্মমর্যাদাবোধ সম্পন্ন তপনের সংবেদনশীল লেখক মনে আঘাত করে। লজ্জায় অনুশোচনায় সে

সিদ্ধান্ত নেয় ভবিষ্যতে কারও সুপারিশে নির্ভর না-করে নিজের লেখা নিজেই ছাপতে দেবে। এক কিশোরের আত্মস্বরূপ আবিষ্কারের এ কাহিনির মধ্যেই আসলে লুকিয়ে আছে প্রকৃত জ্ঞানচক্ষু লাভের সার্থকতা।



প্রশ্ন:  ‘তার চেয়ে দুঃখের কিছু নেই, তার থেকে অপমানের!-কার এ কথা মনে হয়েছে? জীবনের কোন্ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে?

অথবা, ‘আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন — দিনটি কীভাবে বক্তার জীবনে 'সবচেয়ে দুঃখের দিন' হয়ে উঠল তার বর্ণনা দাও।


উত্তর- কথাশিল্পী আশাপূর্ণা দেবীর 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নায়ক তপনের এ

কথা মনে হয়েছিল।

>  শিশুমন কোমল, সামান্য আঘাত পেলেই তারা ভীষণভাবে মুষড়ে পড়ে।

এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ছোট্ট তপনের লেখক সম্পর্কে সব কৌতূহলের শেষ

হয় নতুন মেসোকে দেখে। অনুপ্রাণিত তপন একটি গল্প লেখে। সেই গল্প মাসির পীড়াপীড়িতে মেসোর হাত ধরে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপা হয়। স্বাভাবিক কারণে তপন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। নানান বিরূপতা সত্ত্বেও সে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু তার গর্ব মাটিতে মিশে যায় গল্পটি পড়ার সময়। সে দেখে প্রকাশিত গল্পে তার লেখা লেশমাত্র নেই। কারণ গল্পটা সামান্য কারেকশনের নামে পুরোটাই বদলে গিয়েছিল। এতে তপনের লেখকসত্তা অপমানিত হয়। তার চোখে জল এসে যায়। নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়ার দুঃখ ও যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খায়। লজ্জা, অনুশোচনা এবং আত্মসম্মানহীনতার সংকোচ থেকে এভাবেই সে উপরিউক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।


প্রশ্ন:  ‘তপনের মনে হয় আজ যেন তার জীবনের সবচেয়ে দুঃখের দিন।-কোন দিন তপনের এমন মনে হয়েছিল। তার এমন মনে হওয়ার কারণ কী?

উত্তর:  আশাপূর্ণা দেবী রচিত 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পে তপনের নতুন মেসো তার ছোটোমাসিকে নিয়ে তাদের বাড়িতে হাতে করে 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকার একটি সংখ্যা নিয়ে আসে, সেই দিনের কথা বলা হয়েছে।

>  শিশুমন কোমল, সামান্য আঘাত পেলেই তারা ভীষণভাবে মুষড়ে পড়ে।

এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ছোট্ট তপনের লেখক সম্পর্কে সব কৌতূহলের শেষ

হয় নতুন মেসোকে দেখে। অনুপ্রাণিত তপন একটি গল্প লেখে। সেই গল্প মাসির পীড়াপীড়িতে মেসোর হাত ধরে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপা হয়। স্বাভাবিক কারণে তপন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে।

নানান বিরূপতা সত্ত্বেও সে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু তার গর্ব মাটিতে মিশে যায় গল্পটি পড়ার সময়। সে দেখে প্রকাশিত গল্পে তার লেখা লেশমাত্র নেই। কারণ গল্পটা সামান্য কারেকশনের নামে পুরোটাই বদলে গিয়েছিল। এতে তপনের লেখকসত্তা অপমানিত হয়। তার চোখে জল এসে যায়। নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়ার দুঃখ ও যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খায়। লজ্জা, অনুশোচনা এবং আত্মসম্মানহীনতার সংকোচ থেকে এভাবেই সে উপরিউক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।


প্রশ্ন: তপন আর পড়তে পারে না। বোবার মতো বসে থাকে।- 'তপনের এরকম অবস্থার কারণ বর্ণনা করো।

উত্তর:  আশাপূর্ণা দেবীর 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তপনের ইচ্ছে ছিল লেখক হওয়ার। একইসঙ্গে লেখকদের সম্বন্ধে তার ধারণা ছিল, তাঁরা। বুঝি আকাশ থেকে পড়া অতিলৌকিক কোনো প্রতিভা। কিন্তু তার ছোটোমাসির বিয়ের পর নতুন মেসোকে দেখে তার সেই ভুল ভাঙে। তার নতুন মেসো অধ্যাপক, বইও লেখেন; সেসব বই ছাপাও হয়—অথচ মেসোর আচার-আচরণের সঙ্গে তার বাবা, ছোটোমামা বা মেজোকাকুর আচার- আচরণের কোনো তফাতই সে খুঁজে পায় না। নতুন মেসোকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তপন একটি আস্ত গল্প লেখে, যেটি তার মাসির হাত ঘুরে মেসোর হাতে গিয়ে পড়ে। মাসির পীড়াপীড়িতে সামান্য কারেকশন করে সেই গল্প ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপানোর আশ্বাস দেন নতুন মেসো। বাড়িতেও সে নিয়ে আনন্দের শেষ নেই।

অনেকদিনের ইচ্ছে হয়তো এবার পূরণ হতে চলেছে—এই ভেবেই একটু

সংশয়কে সঙ্গী করে তপনের মনও উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠে। কিন্তু যথাসময়ে

'সন্ধ্যাতারা'-য় ছাপা লেখাটি পড়তে গিয়ে তপন টের পায় কারেকশনের নামে লেখক-মেসো গল্পের আগাগোড়া বদলে দিয়েছেন। নির্বিচারে কলম চালানোয় নিজের নামে ছাপানো গল্পে সে আর নিজেকেই খুঁজে পায় না। তপনের

লেখকমন আহত হয়। নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়ার যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খায়। লজ্জা, অনুশোচনা আর আত্মসম্মান হীনতায় তার বাকরোধ হয়ে আসে।


প্রশ্ন ; গল্প ছাপা হলে যে ভয়ংকর আহ্লাদটা হবার কথা, সে আহ্লাদ

খুঁজে পায় না – এরকম কেন হল তপনের?

উত্তর:  আশাপূর্ণা দেবী রচিত ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তপনে্য ইচ্ছা ছিল লেখক হওয়ার। একইসঙ্গে লেখকদের সম্বন্ধে তার ধারণা ছিল, তাঁরা বুঝি আকাশ থেকে পড়া অতিলৌকিক কোনো প্রতিভা। কিন্তু তার ছোটোমাসির বিয়ের পর নতুন মেসোকে দেখে তার সেই

ভুল ভাঙে। তার নতুন মেসো পেশায় অধ্যাপক হলেও লেখক, বই লেখেন; সেসব বই ছাপাও হয়—অথচ মেসোর আচার-আচরণের তার বাবা, ছোটোমামা বা মেজোকাকুর আচার-আচরণের কোনো তফাত সে খুঁজে পায় না। নতুন মেসোকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তপন একটি আস্ত গল্প লেখে, যেটি তার মাসির হাত ঘুরে মেসোর হাতে গিয়ে পড়ে। মাসির

পীড়াপীড়িতে সামান্য কারেকশন করে সেই গল্প 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপানোর আশ্বাস দেন নতুন মেসো। বাড়িতেও সে নিয়ে আনন্দের শেষ নেই।

অনেকদিনের ইচ্ছে হয়তো এবার পুরণ হতে চলেছে, এ ভেবেই একটু সংশয়কে সঙ্গী করে মামার বাড়ি থেকে সে নিজের বাড়িতে ফিরে এসেছে। যখন সে ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা গল্প দেখতে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়ে বিষণ্ণ মন নিয়ে বাড়িতে বসে আছে, তখন 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকার একটা সংখ্যা

নিয়ে তাদের বাড়িতে আসেন ছোটোমাসি ও মেসো। তার স্বপ্ন সত্যি হয়। ‘সন্ধ্যাতারা’ পত্রিকায় শ্রীতপন কুমার রায়-এর 'প্রথম দিন' গল্প প্রকাশিত হয়েছে। বাড়িতে শোরগোল পড়ে যায়। সকলেই চোখ বুলিয়ে প্রাথমিকভাবে প্রশংসা করলেও নতুন মেসো যখন বলেন, তিনি একটু-আধটু কারেকশন করে দিয়েছেন, তখন তাদের বাড়ির অনেকেই বলেন যে ‘সন্ধ্যাতারা'-র সম্পাদককে নতুন মেসোমশাই না বলে দিলে এই ‘প্রথম দিন' গল্পটা কড়ে আঙুল দিয়ে ছুঁয়েও দেখতেন না সম্পাদকমশাই। এইসব কথাবার্তা তপনের শিশুমনে আঘাত করে। তাই গল্প ছাপা হলেও ভয়ংকর আহ্লাদটা তার হয় না।


প্রশ্ন:  ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নামকরণ কতখানি সার্থক হয়েছে, তা আলোচনা করো।

উত্তর/ আগে নামকরণের সার্থকতা' অংশটি দ্যাখো।

প্রশ্ন:   ছোটোগল্প হিসেবে আশাপূর্ণা দেবী রচিত 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের সার্থকতা বিচার করো।

উত্তর:  শুধু আয়তনে ছোটো হলেই কোনো গল্প ছোটোগল্পের পর্যায়ে পড়ে

না। ছোটোগল্পের কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য থাকে। সেই বৈশিষ্ট্যগুলির সাপেক্ষে

‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পটিকে বিচার করলে বোঝা যাবে ছোটোগল্প হিসেবে সেটি কতটা সার্থক।

ছোটোগল্প শুরু হয় হঠাৎ করে। ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পতেও এই বৈশিষ্ট্যটি লক্ষ করা যায়। ‘কথাটা শুনে তপনের চোখ মার্বেল হয়ে গেল'—এই বাক্যটি দিয়ে আচমকাই গল্পটি শুরু হয়।

গল্প লেখাকে কেন্দ্র করে তপনের মোহ এবং সেই মোহভঙ্গের কাহিনিকে ঘিরেই এই গল্প। গল্পে অন্য কোনো উপকাহিনি গড়ে ওঠেনি। তাই গল্পটি তার সংক্ষিপ্ত পরিধির মধ্যে একটিমাত্র বিষয়েই সীমাবদ্ধ।

‘> জ্ঞানচক্ষু' গল্পে তপন ছাড়াও যে চরিত্রগুলির ভূমিকা নজর কাড়ে, তাঁরা হলেন তপনের ছোটোমাসি এবং মেসো। বাকি চরিত্রগুলি নেহাতই গৌণ। এক্ষেত্রেও ছোটোগল্পের বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে। অতিরিক্ত চরিত্রের ভিড় নেই। ছোটোগল্প যেমন হঠাৎ করে শুরু হয়, তেমনই হঠাৎ করেই শেষ হয়। গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও পাঠকের মনে এক ধরনের অতৃপ্তি থেকে যায়।

>> জ্ঞানচক্ষু' গল্পটিও এর ব্যতিক্রম নয়। ছাপার অক্ষরে নিজের নামের মতোই নিজের লেখাকেও দেখতে চেয়েছিল তপন। তার সেই স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণা নিয়েই গল্পটি শেষ হয়।

“জ্ঞানচক্ষু' গল্পটির মধ্যে ছোটোগল্পের প্রতিটি বৈশিষ্ট্যই রয়েছে। সুতরাং,

ছোটোগল্প হিসেবে এটি নিঃসন্দেহে সার্থক।

প্রশ্ন: ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পের তপন চরিত্রটি আলোচনা করো।


উত্তর- আশাপূর্ণা দেবীর 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের তপনের মধ্যেও সব শিশুর মতোই আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ, কল্পনা-বাস্তব, আনন্দ-অভিমানের টানাপোড়েন দেখা যায়। তবে তার চরিত্রের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য তাকে আলাদা করে রাখে।

কল্পনাপ্রবণ: তপন মনে মনে তার কল্পনার জগৎকে সাজিয়ে নিতে ভালোবাসে। তাই তার কল্পনার জগতে লেখকরা ছিলেন ভিন গ্রহের প্রাণী। সাধারণ মানুষদের সঙ্গে তাদের বুঝি-বা কোনো মিলই নেই।

সাহিত্যের প্রতি তপনের ঝোঁক 

সাহিত্যপ্রেমী: ছোটোবেলা থেকেই। সে অনেক গল্প শুনেছে ও পড়েছে। লেখকদের সম্পর্কেও তার কৌতূহল অসীম। ছোটোমেসোকে দেখে তার মনেও লেখক হওয়ার ইচ্ছে জাগে। উৎসাহী হয়ে বেশ কয়েকটা গল্পও লিখে ফেলে।


সংবেদনশীল: বয়স অনুপাতে তপন একটু বেশিই সংবেদনশীল। সমবয়সি ছেলেমেয়েদের মতো রাজারানি, খুন-জখম ও অ্যাকসিডেন্ট নিয়ে না-লিখে, তার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা আর অনুভূতি নিয়ে সে গল্প লেখে। তা নিয়ে বাড়ির লোকের ঠাট্টাতামাশা কিংবা মাসি-মেসোর উৎসাহদান-কোনোটাতেই সে প্রকাশ্যে তার প্রতিক্রিয়া দেখায় না।

এটা তার অন্তর্মুখী স্বভাবেরই পরিচয়। তাই কারেকশনের নামে মেসো তার গল্পটা আগাগোড়া বদলে দিলে তপন তার কষ্ট লুকোতে ছাদে গিয়ে কাঁদে।


আত্মমর্যাদাসম্পন্ন: তপনের আত্মমর্যাদাবোধ ছিল প্রবল। তার গল্প ছোটোমেসো কারেকশনের নাম করে আগাগোড়াই বদলে দিলে তপনের লেখকসত্তা আহত হয়। সে মনে মনে শপথ নেয়, ভবিষ্যতে লেখা ছাপাতে হলে সে নিজে গিয়ে লেখা দিয়ে আসবে পত্রিকা অফিসে। তাতে যদি তার মতো নতুন লেখকের লেখা ছাপা না হয়, তাতেও দুঃখ নেই।



প্রশ্ন:  জ্ঞানচক্ষু' গল্পে নতুন মেসোর চরিত্রটি আলোচনা করো।

উত্তর: মিশুকে:  কথাশিল্পী আশাপূর্ণা দেবী রচিত 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের মূল চরিত্র তপনের আত্মোপলব্ধির পিছনে যে-চরিত্রটির প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে, তিনি হলেন তপনের নতুন মেসো। এই মেসো পেশায় অধ্যাপক এবং লেখক। তাঁর লেখক পরিচয় তপনের মনের বহু ভুল ধারণা ভেঙে দেয়। অধ্যাপক ও লেখক হওয়া সত্ত্বেও মেসো ব্যক্তিটি বেশ মিশুকে, ফুর্তিবাজ। তিনি শ্যালক-শ্যালিকাদের সঙ্গে গল্প করেন, তর্ক করেন,  কবজি ডুবিয়ে খাওয়াদাওয়া করেন, সিনেমায় যান ও বেড়াতেও যান।


সহানুভূতিশীল; শ্বশুরবাড়ির সদস্য হিসেবে তপনের প্রথম লেখা গল্পের তিনি প্রশংসা  করেন ও তা ছাপার দায়িত্ব নিয়ে নেন।


নিজের প্রতিপত্তি জাহিরে আগ্রহী : তপনকে উৎসাহ দিতে শুধুমাত্র ছোটোমেসো তার গল্পটা ছাপিয়ে দেন,

এমনটা নয়। শ্বশুরবাড়িতে নিজের প্রতিপত্তি জারি করতেও তিনি এ কাজ করেন।


অন্যের আবেগ বুঝতে অক্ষম ; তপনের গল্প যাতে প্রসিদ্ধি পায়, তাই সংশোধনের নামে গল্পের খোলনলচে বদলে দেন মেসো। তাঁর উদ্দেশ্য হয়তো মহৎ ছিল। কিন্তু তাঁর এই উদ্যোগ তপনের লেখকসত্তাকে আঘাত করে। একদিকে চারিত্রিক উদারতায় ও মহত্ত্বে আবার অন্যদিকে অসতর্কতায়, তপনের নতুন মেসো এক রক্তমাংসের চরিত্র হয়ে ওঠেন।

যদিও একজন লেখক হয়ে অন্য লেখকের এই আত্মসম্মান ও অহংবোধকে উপলব্ধি করা তাঁর উচিত ছিল।


প্রশ্ন:  তপনের ছোটোমাসির চরিত্রটি আলোচনা করো।

উত্তর:   ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পে আশাপূর্ণা দেবী সৃষ্ট চরিত্রগুলির মধ্যে ছোটো অথচ বেশ শক্তিশালী চরিত্র হল তপনের ছোটোমাসির চরিত্রটি। ছোটোমাসি বয়সে তপনের চেয়ে বছর আষ্টেকের বড়ো। 


বন্ধুত্বপূর্ণ:: স্বামী গর্বে গর্বিতা: প্রায় সমবয়সি ছোটোমাসি ছিল তপনের চিরকালের বন্ধু। মামার বাড়িতে এলে তপনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের সঙ্গী ছিল সে। তাই তপন প্রথমবার গল্প লিখে ছোটোমাসিকেই সকলের আগে দেখায়।


স্বামী গর্বে গর্বিতা: সদ্যবিবাহিতা ছোটোমাসির স্বামী একজন অধ্যাপক। তিনি আবার বইও লেখেন। তাই বিয়ের পর থেকে ছোটোমাসির মধ্যে একটা মুরুব্বি মুরুব্বি ভাব এসেছে। তপনের লেখা গল্পটি পুরোটা না পড়েই সে তার মতামত জানায় এবং লেখাটা নিয়ে যায় তার স্বামীর কাছে। তার জোরাজুরিতেই তার স্বামী তপনের গল্পটা ছাপানোর ব্যবস্থা করতে রাজি হয়ে যান। তাই সেই গল্প 'সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছেপে বেরোলে মাসির মুখে আত্মপ্রসাদের আনন্দ দেখা যায়।


স্নেহময়ী: প্রায় সমবয়সি হলেও তপন ছিল তার বিশেষ স্নেহের পাত্র। তাই তার লেখা গল্প ছাপানোর ব্যাপারে মাসি এত উদ্যোগ নেয়। সে যখন মজা করে তপনের লেখাটা ‘টুকলিফাই' কিনা জানতে চায়, তখনও সেই বক্তব্যের মধ্যে অভিযোগ বা সন্দেহের বদলে স্নেহেরই সুর

বাজে।

প্রশ্ন:   তপনের লেখা গল্প সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা কে, কী প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন 'জ্ঞানচক্ষু' গল্প অবলম্বনে লেখো।

অথবা, তপনের আত্মীয়স্বজন 'জ্ঞানচক্ষু' গল্পে তার প্রতি কেমন মনোভাব পোষণ করেছেন বুঝিয়ে দাও ।

উত্তর: আশাপূর্ণা দেবী রচিত ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র তপন। সে কল্পনাপ্রবণ, সাহিত্যানুরাগী। সে তার নতুন লেখক মেসোমশাইয়ের সান্নিধ্যে -

এসে তার প্রতিভাকে বিকশিত করে কাঁচা হাতে লিখে ফেলে একটা আস্ত গল্প এবং প্রথম দেখাতে যায় তার ছোটোমাসিকে। তপনের থেকে আট বছরের বড়ো ছোটোমাসি গল্পে একটু চোখ বুলিয়েই পিঠ চাপড়ে বলে –“ওমা এ তো বেশ লিখেছিস রে?' যদিও তারপরে একটু সন্দেহের সুরে বলে ওঠে 'কোনোখান থেকে টুকলিফাই করিসনি তো?' তবে ছোটোমাসিই তপনের লেখা গল্প তার লেখক স্বামীর কাছে নিয়ে গিয়ে

দেখায়।


তপনের গল্প পড়ে ছোটোমেসোর

প্রতিক্রিয়া : তপনের ছোটো মেসোমশাই অধ্যাপক এবং লেখক হয়েও তপনের গল্প প্রথম পড়ে তাচ্ছিল্য করেননি, বরং প্রশংসা করেছেন-তপন, তোমার গম তো দিব্যি হয়েছে' এবং সেই গল্প তিনি একটু ‘কারেকশান' করে তার পরিচিত 'সন্ধ্যাতারা'-র সম্পাদককে বলে ছাপার ব্যবস্থা করে দেন।

গল্পের পরবর্তীতে বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের কাছে তপনের নাম হয়ে

গেছে, 'কবি, সাহিত্যিক, কথাশিল্পী' আবার কেউ উঠতে বসতে তপনকে ঠাট্টা করছে- 'তোর হবে। হ্যাঁ বাবা তোর হবে।' এরপর যখন তপনের সেই গল্প ‘সন্ধ্যাতারা” পত্রিকায় প্রকাশ পায় এবং সেই পত্রিকার সংখ্যা নিয়ে ছোটোমাসি ও মেসোমশাই তাদের বাড়িতে আসে তখন বাড়িতে।একটা শোরগোল পড়ে যায়। সকলেই একবার করে চোখ

বোলায় এবং বলে— ‘বারে, চমৎকার লিখেছে তো!' মেসো তখন মৃদু হেসে বলে ‘একটু আধটু কারেকশান করতে হয়েছে।' তবে মাসি প্রতিবাদ করে বলেন – 'তা হোক, নতুন নতুন অমন হয়—' এরপর ছড়িয়ে পড়ে কারেকশনের কথা। তপনের বাবা একটু অবজ্ঞার ছলেই বলেন—

'তাই। তা নইলে ফট করে একটা লিখল, আর ছাপা হলো। তপনের

মেজেকাকু বলেন- 'তা এরকম একটি লেখক মেসো থাকা মন্দ নয়। তারপর

তার মা তাকে গল্প পড়ে শোনাতে বলেন এবং মন্তব্য করে – 'বাবা, তোর পেটে পেটে এত।' সকলেই যখন বলে তার নতুন মেসোর বদান্যতায় এবং কারেকশনের জন্য তার গল্প প্রকাশিত হয়েছে তখন তার গল্প প্রকাশের আর সে আনন্দ খুঁজে পায় না।


প্ৰশ্ন:  তপনের মনে লেখক হওয়ার বাসনা কীভাবে জাগল ? তার পরিণতি কী হয়েছিল ?


উত্তর: ‘জ্ঞানচক্ষু' গল্পটির প্রধান চরিত্র কিশোর তপন। সম্প্রতি তার ছোটোমাসির বিয়ে হয়েছে এমন একজনের সঙ্গে যিনি পেশার অধ্যাপক হলেও একজন লেখক। কিশোর তপনের দু-চোখে স্বপ্ন লেখক হওয়ার; একইসঙ্গে সে ভাবে, কবি-সাহিত্যিক-লেখক—তাঁরা সাধারণ মানুষ নন; তাঁরা অনন্যসাধারণ, ভিন্ন প্রকৃতির; হয়তো আকাশ থেকে পড়া কোনো জীব। কিন্তু নতুন লেখক-মেসোকে দেখে তার ধারণার কাল্পনিক পর্দা সরে যায়; সে অনুভব করে লেখকরাও রক্তমাংসে গড়া আর-পাঁচজন সাধারণ মানুষের মতোই। তার মনে লেখক হওয়ার বাসনা হঠাৎই উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

>  শিশুমন কোমল, সামান্য আঘাত পেলেই তারা ভীষণভাবে মুষড়ে পড়ে।

এক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। ছোট্ট তপনের লেখক সম্পর্কে সব কৌতূহলের শেষ

হয় নতুন মেসোকে দেখে। অনুপ্রাণিত তপন একটি গল্প লেখে। সেই গল্প মাসির পীড়াপীড়িতে মেসোর হাত ধরে ‘সন্ধ্যাতারা' পত্রিকায় ছাপা হয়। স্বাভাবিক কারণে তপন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে। নানান বিরূপতা সত্ত্বেও সে গর্ব অনুভব করে। কিন্তু তার গর্ব মাটিতে মিশে যায় গল্পটি পড়ার সময়। সে দেখে প্রকাশিত গল্পে তার লেখা লেশমাত্র নেই। কারণ গল্পটা সামান্য কারেকশনের নামে পুরোটাই বদলে গিয়েছিল। এতে তপনের লেখকসত্তা অপমানিত হয়। তার চোখে জল এসে যায়। নিজের গল্প পড়তে বসে অন্যের লেখা লাইন পড়ার দুঃখ ও যন্ত্রণা তাকে কুরে কুরে খায়। লজ্জা, অনুশোচনা এবং আত্মসম্মানহীনতার সংকোচ থেকে এভাবেই সে উপরিউক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।