যেখানে ছিল শহর যেখানে শব্দটি প্রয়োগ করার কারণ কি? শহরটির কি পরিণতি হয়েছিল? অসুখী একজন কবিতা || দশম শ্রেণী
![]() |
![]() |
প্রশ্ন: ‘যেখানে ছিল শহর'— ‘যেখানে' শব্দটি প্রয়োগ করার কারণ কী ? শহরটির কী হয়েছিল ?
উত্তর: উদ্ধৃতিটি পাবলো নেরুদার ‘অসুখী একজন' কবিতার অংশ। কথক বা কবির বাসভূমি যে শহরে, এক্ষেত্রে সেখানকার কথা বলা হয়েছে। এই শহরটি কবি বা কথকের কাছে স্মৃতিবিজড়িত, কারণ
এখানেই তিনি তাঁর প্রিয় নারীটিকে অপেক্ষায় রেখে বহুদূরে পাড়ি দিয়েছিলেন। কবির এই বাসভূমি, প্রিয় সুখের সান্নিধ্যে, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে, স্নিগ্ধতায় ও লাবণ্যে পরিপূর্ণ ছিল। তখনও যুদ্ধের আঘাত এই শহরাকে স্পর্শ করতে পারেনি বোঝাতেই কবি ‘যেখানে শব্দটি প্রয়োগ করেছেন।
! যুদ্ধের ভয়ংকর নিষ্ঠুরতায় কবির শহর ধ্বংসের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়ায়।
যুদ্ধের আঘাতে সমস্ত সমতল জুড়ে আগুন লাগল। দেবালয়ও তার হাত থেকে রক্ষা পেল না। মানুষের মধ্যেকার যে-দেবত্বের বিশ্বাস ছিল তা ধ্বংস হয়ে গেল। সেইসঙ্গে নিশ্চিহ্ন হল কবির মধুর স্মৃতিবিজড়িত সেই স্বপ্নের বাড়িটিও।
কবির বারান্দায় যেখানে ঝুলন্ত বিছানায় তিনি ঘুমিয়েছিলেন, তাঁর প্রিয় গোলাপি গাছ, ছড়ানো করতলের মতো পাতা চিমনি ও প্রিয় জলতরঙ্গ সহ ধ্বংস হল যুদ্ধের আগুনে। গোটা শহরটাই পুড়ে গেল। সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রইল কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের বীভৎস মাথা ও রক্তের একটা কালো দাগ। কবির প্রিয় শহরের প্রতিচ্ছবি, যুদ্ধের বীভৎসতা মানুষের লোভ, হিংসা এবং বর্বরতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে, যা পাঠককে স্তম্ভিত করেছে।
প্রশ্ন: ‘আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়। মেয়েটির অপেক্ষার তাৎপর্য বিশ্লেষণ করো।
অথবা, ‘আর সেই মেয়েটি আমার অপেক্ষায়।-অপেক্ষরতা সেই মেয়েটির মধ্য দিয়ে কবি স্বদেশপ্রেম তথা মানবপ্রেমের যে-শাশ্বত রূপ তুলে ধরেছেন, তা আলোচনা করো।
উত্তর> কবি পাবলো নেরুদার 'অসুখী একজন' কবিতায় মানবমনের এক চিরন্তন সত্য প্রকাশ পেয়েছে। কবি যেন কোনো এক নারীকে তাঁরই অপেক্ষায় দাঁড় করিয়ে দূরে চলে যান। সেই অপেক্ষরতা যদিও জানত না যে, কবি আর কখনও ফিরবেন না ।
কবিতার শুরুর বিচ্ছেদদৃশ্যে লুকিয়ে থাকে দুজন নরনারীর চিরকালীন
প্রত্যাশা ও অপেক্ষার বীজ। যদিও জীবন তার নিজের গতিতে চলতে থাকে। টুকরো টুকরো প্রাত্যহিকতায় সপ্তাহ আর বছর কেটে যায়। বৃষ্টিতে কবির পদচিহ্ন ধুয়ে গিয়ে 'ঘাস জন্মালো রাস্তায়'। কবির অস্তিত্ব অনেকের মন থেকেই একটু একটু করে মুছে যেতে থাকে। কিন্তু পাথরের মতো ভারী, গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী যন্ত্রণায় সেই অপেক্ষারত নারীর দিন কাটে। এরপর আসে যুদ্ধ। সমতলে আগুন ধরে। ধ্বংস হয় মানুষের স্বপ্নের আশ্রয়। রক্ষা পায় না শিশুরাও। এতদিনকার রক্ষণশীলতার প্রতীক -মন্দির আর মন্দিরের দেবমূর্তিগুলো ধূলিসাৎ হয়। কবির মিষ্টি বাড়িটিও ধ্বংস হয়। যুদ্ধের আগুনে ভস্মীভূত হয় সমস্ত শহর। যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকে কাঠকয়লা, দোমড়ানো লোহা, মৃত পাথরের মূর্তির বীভৎস মাথা ও রক্তের শুকনো কালো দাগ। শুধু এই যুদ্ধের বীভৎসতা ছুঁতে পারে না কবির সেই প্রিয় অপেক্ষরতার ভালোবাসাকে। ধ্বংস ও বিনাশের হাজার লেলিহান শিখা তাকে কোনোমতেই ধ্বংস করতে পারে না। সময়ান্তরে প্রবহমান মানবহৃদয়ের যন্ত্রণা, আকুতি ও আর্তিই সেই মেয়েটির মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে অনুভূতির অবিনাশী প্রকাশ হিসেবে।

