একটি পথের আত্মকথা রচনা - Online story

Thursday, 8 October 2026

একটি পথের আত্মকথা রচনা

 




    রচনা

একটি পাথের আত্মকথা : 



ভূমিকা: মানুষ চলাচলের রাস্তা দিয়েই পথ গড়ে ওঠে। “পথ কি তার নিজের শেষকে জানে, যেখানে লুপ্ত ফুল আর স্তব্ধ গান পৌঁছাল, যেখানে তারার আলোয় অনির্বাণ বেদনার। দেওয়ালি উৎসব।”—রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই ভাষ্য যেন আমার সার্থক আত্মপরিচয়।

সূচনার কথা; আমি একটি পথ । অর্থাৎ একটা রাস্তা । আজও আমার ক্ষীণ মনে পড়ে, তবে এ কথা সত্যি আমার শেষ ঠিকানা কোথায় তা আমিও জানি না! বহু যুগ আগে ঘন জঙ্গলের বুক চিরে মানুষ আমাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল।। গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে এই ক্রমাগত চলাতেই তো আমার আনন্দ। এভাবে সামনে এগিয়ে যাওয়াই তো জীবন। ধুলো-মাটি দিয়ে তৈরি আমার শরীরে কত কাল ধরে কত কিছুর প্রলেপ পড়ল। ক্রমে শক্ত-জমাট হয়ে উঠলাম আমি। তবু থামতে পারলাম কোথায়! আমার থামা বারণ, কারণ আমি যে রাজপথ, পথিক মানুষের চিরসখা।

আত্মকথা:  আমি গ্র্যান্ড ট্যাঙ্ক রোড। আমার বিস্তৃতি ডানকুনি থেকে দুর্গাপুর এক্সপ্রেস পর্যন্ত। আমি ভারতের প্রধান জাতীয় সড়কগুলির মধ্যে একটি। আমার দু-পাশে কত গাছপালা, কলকারখানা, বাড়ি। দিনরাত অশান্ত, অস্থির মানুষ ও তার যানবাহন আমার বুকের ওপর দিয়ে ছুটে চলেছে। এক একজনের এক একরকম ছন্দ। তাদের গতিময় ছন্দের স্রোতের ভিন্ন ভিন্ন দোলা আমার প্রাণে তোলে শিহরণ। চরৈবেতি চরৈবেতি' এই তো আমাদের মন্ত্র। তবে এভাবেই নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে বেদনায় ম্লান অসহায় মানুষের পায়ের শব্দে আমি অনুভব করেছি নৈরাশ্যের কম্পন। আবার তৃপ্ত মানুষের হাঁটায় সয়েছি দত্ত ও আত্মবিশ্বাসের অনুরণন। আর দূর থেকে আসা মানুষজন যখন পারে পায়ে হাঁটে, তখন তাদের রোমাঞ্চ- কৌতূহল-উদ্দীপনা যেন প্রতিটি পদসঞ্চারের তালে ফুটে ওঠে। তবে ক্লান্ত পথিক অনেক পথ চলে যখন আমার প্রান্তে কোনো নদীর সামনে ক্ষণকালের জন্য দাঁড়িয়ে পড়ে, তখন কৌতুক ও আনন্দে আমারও থামতে ইচ্ছে হয়।

অনুভূতি:  মানবজীবনের মতো আমার জীবনেও যেন তিনটিঅধ্যায়—শৈশব, যৌবন ও পরিণতির কাল। আমার শৈশব হল রাজপথের পত্তনের কাল, তখন লোকজন ছিল কম, গাছপালা ছিল বেশি। তখন গাড়িঘোড়ার সংখ্যা হাতে গোনা যেত। তাই দিনে-রাতে কোনো মানুষের পদশব্দ শুনলেই আমার শিরায় শিরায় উত্তেজনার শিহরন অনুভূত হত। মানুষের পায়ের শব্দের অপেক্ষায় আমি অধীর হয়ে থাকতাম। তারপর দিন গেল বদলে। গাড়িঘোড়া বাড়ল, লোকজন বাড়ল, রক্তপাতে, বেদনায় কেঁপে উঠলাম আমি। প্রতিবাদ জানিয়েছি, কিন্তু কে শোনে সে কথা!

উপসংহার:  আজ আমি সংকীর্ণ, জরাজীর্ণ। আমার আজ অনেক বয়স। আমার অনেক জায়গায় ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে আছে। সরকার থেকে মেরামতির প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে এখনও আমার সংস্কারে তারা হাত লাগায়নি। শুনেছি আমার উপর দিয়ে একটি নতুন ওভারব্রিজ স্থাপন করা হবে। আমার জৌলুষ আজ আর নেই। আমি মৃতপ্রায় অসাড়ের মতো কোনোরকমে টিকে আছি। এখন আমার একটাই সান্ত্বনা আমি মানুষকে ঘরের সন্ধান দিই ধুলো-ধোঁয়া-কোলাহল থেকে ঘরের স্বস্তি ও স্তব্ধতায় মানুষকে নিয়ে যাই মানুষের বেদনা ও ভালোবাসার সঙ্গে আমার ভালোবাসা ও যন্ত্রণাও আবর্তিত হয়। এই বোধটুকুই আমি মানুষের মধ্যে সঞ্চারিত করতে চাই।