রচনা একটি নির্জন দুপুর - Online story

Friday, 11 September 2026

রচনা একটি নির্জন দুপুর

 



রচনা

একটি নির্জন দুপুর

ভূমিকা -“নীরব মধ্যাহ্ন বেলা, শব্দহীন নিঃসাড় ভুবন –

কেহ কোথা নাই—

অকস্মাৎ মর্মরিল তরুশাখে মন্থর পবন

চমকিয়া চাই।"


নির্জন কোনো দুপুরের কথা ভাবতে গেলে, এই ছবিটাই আমার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কবি যখন এই কবিতা লিখেছিলেন, তখনও শহরে ও গ্রামে ছিল দীর্ঘ দুপুরের নিস্তব্ধতা, ছিল নির্জনতা, ছিল পাখির ডাক। কালের ব্যবধানে আজ ওই দুপুর থাকলেও, তার নির্জনতা নিঃশব্দে হয়ে গেছে অদৃশ্য। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে দ্বিপ্রহরের নিস্তব্ধতা, কোলাহলে মুখর হয়ে উঠেছে স্তব্ধ দুপুরের মুহূর্তগুলি।


নির্জনতা হীন-  গ্রামে-গঞ্জে। শহরে-নগরে এখন হই-হট্টগোল খুবই বেড়ে গেছে। শহর কলকাতা কোনো সময়ের জন্যই এখানে নিস্তব্ধ থাকে না। ভারী ভারী ট্রাক বিকট শব্দ করে ছুটে চলেছে শহরের পথে পথে। কোলাহল উঠে পদাতিক জনস্রোতের ভিতর থেকে। শান্ত, নীরব, নির্জনতা শহর কলকাতায় আজ আর দেখা যায় না। তা কেবল কলকাতাই-বা কেন, মফস্সল শহরেরও একই অবস্থা।


নির্জনতার স্বরপ- নির্জন একটি দুপুরের খোঁজে যদি আমরা গ্রামে গিয়ে হাজির হই, সেখানেও তেমনি নির্জন দুপুর আমরা পাই না। ধু-ধু মাঠ, খাঁ-খাঁ দুপুর, চিলের ডাক, শাঁ শাঁ বাতাস ইত্যাদিও ইদানীং দুর্লভ হয়ে গেছে পল্লির পরিবেশে। যে নিবিড় সবুজ ছোটো ছোটো গ্রামে কোকিলের কুহুরব, ঘুঘুর ডাক কিংবা টিয়াপাখির ট্যা ট্যা শোনা যেত, এখন তা নেই। শোনা যায় না উদাস বাঁশির সুর।


দুপুরের নির্জনতা-  গ্রীষ্মের দুপুর একরকম, শীতের দুপুর অন্যরকম। শরতের দুপুরে সাদা মেঘের ভেলা দেখতে দেখতে মনের ভিতর যে আনন্দ ও আবেগের লহর ওঠে, বসন্তকালের দুপুরে ঠিক তেমনটি হয় না। বসন্তের দুপুরে শোনা যায় ভ্রমরের গুঞ্জন, নানারকম ফুলের সৌরভ এবং বসন্তসখা কোকিলের কুহুতান, মুখরিত বাতাসের ছোঁয়ায় দেহ-মনে রোমাঞ্চ জাগে।

বর্ষা ঋতুর দুপুর দেখা দেয় বৃষ্টির চাদর গায়ে দিয়ে। শোনা যায়, মৃদু মৃদু মেঘ গর্জন। বর্ষার দুপুর বেশ নির্জন, রিমঝিম বৃষ্টির সংগীতে যে-সময় মন হয়ে যায় উদাস।

নির্জনতার কাব্যিক অনুভব-  দুপুর যে ঋতুরই হোক-না-কেন, তার

ভিতর কেমন যেন এক মন কেমন-করা নির্জনতা আছে। আছে বেশ একটি আলগা অবকাশ। নিজের শৈশবের স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথও এইরকমই এক ছবি এঁকেছেন, যখন তিনি দুপুরের নির্জনতায় ছাদে উঠে একান্ত নির্জনে শহর কলকাতার ভিন্নতর এক ছবি দেখতেন। মাথার ওপর আকাশব্যাপী খরদীপ্তি, তারই দূরতম প্রান্ত হতে চিলের সূক্ষ্ম তীক্ষ্ণ ডাক পৌঁছোত কিশোর রবীন্দ্রনাথের কানে। গলির ভিতর শোনা যেত ফেরিওয়ালার ডাক। সেই নিস্তব্ধ নির্জন দুপুরে কিশোর কবির মন কেমন যেন উদাস হয়ে যেত।

 উপসংহার-  সেই পুরোনো পরিবেশ এখন নেই। সেই পরিবেশ না-থাকুক, প্রতিটি ঋতুর হাত ধরেই আমাদের কাছে এসে আজও হাজির হয়, মন কেমন-করা উদাস নির্জন দুপুরগুলি। ডাকঘরের অমল যে ঘণ্টাধ্বনি শুনেছিল, তা আজও বেজে চলেছে। প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, সময় বসে নেই, সময়য়চলে যাচ্ছে। ছুটির দিনে নিঃসঙ্গ দ্বিপ্রহর আজও হাতছানি দেয়। দুপুরের মুহূর্তগুলি তখন অন্তরঙ্গ হয়ে ধরা দেয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর লেখা 'ভরদুপুরে" কবিতার একটি লাইন - 'আঁচল পেতে বিশ্বভুবন ঘুমাচ্ছে এইখানে"।