গাছ আমাদের বন্ধু রচনা - Online story

Thursday, 3 September 2026

গাছ আমাদের বন্ধু রচনা

 



প্রবন্ধ-রচনা

গাছ আমাদের বন্ধু

ভূমিকা: কবির ভাষায়

 “অন্ধভূমি গর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান

প্রাণের প্রথম জাগরণে, তুমি বৃক্ষ, আদিপ্রাণ”

মা রুপী ধরিত্রীর বুক প্রাণীর আবাসস্থল। ধরিত্রীর বুকে প্রথম প্রাণের অস্তিত্ব ঘোষণা করেছিল বৃক্ষ। ভূমিগর্ভের অন্ধকার বিদীর্ণ করে বৃক্ষই প্রথম প্রণাম জানিয়েছিল প্রভাত সূর্যকে। ধরিত্রীর বন্ধ্যাদশা ঘুচিরে ধীরে ধীরে তার বক্ষকে সবুজায়িত করেছে বৃক্ষ। রবীন্দ্রনাথ বৃক্ষকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, “মৃত্তিকার বীর সন্তান।”


আশ্রয়স্থল:  ধরিত্রীতে মানুষের আবির্ভাবলগ্নে বৃক্ষ‍ই ছিল মানুষের প্রধান আশ্রয়। আদিম মানুষকে বৃক্ষ‍ই দিয়েছে খাদ্য, পরিধেয় আর আশ্রয়। সভ্যতার অগ্রগতিতেও গাছ আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যায়নি বরং তা প্রয়োজনীয়তা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। বৃক্ষকে আশ্রয় করেই মানুষের জীবনচক্র আজও আবর্তিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে।

তপোবন : প্রাচীন সভ্যতার উন্মেষ > তপোবনের মধ্যে প্রাচীন ভারতের একদিন সভ্যতার উন্মেষ হয়েছিল। এখানেই ভারতীয় ঋষিরা বাণী শুনতে পেয়েছিলেন। তপোবন ছিল তাদের সাধনক্ষেত্র। আরণ্যক যা তারা মহৎ জীবনসত্য উপলব্ধি করেছিলেন। এখানেই রচিত

করেছিল "বেদ-উপনিষদ। এখানেই আর্য ঋষিরা সামগান করেছিলেন। তাই রামায়ণ ও মহাভারত মহাকাব্যে অরণ্যের প্রভাব এত বেশি। রাচন্দ্রের চোদ্দো বছর বনবাস, মহাভারতের বনপর্ব সবই অরণ্যের সঙ্গে নিবিড় যোগ ঘোষণা করেছে।

নগর সভ্যতার নির্মমতা :  অতীতের সে আবশ্যক জীবন আর নেই। এসেছে নগরকেন্দ্রিক সভ্যতা। বনভূমির অভাবে বৃষ্টিপাত কমেছে, বেড়েছে মরুভূমি। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ যথাথই বলেছেন, “অরণ্য নষ্ট হওয়ায় এখন

বিপদ আসন্ন। সেই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে হলে আবার আমাদের আহ্বান করতে হবে সেই বরদাত্রী বনলক্ষীকে।

নিত‍্য ব্যবহারে গাছ : গাছ মানুষের পরম উপকারী বন্ধু। গাছ থেকে পশুর খাদ্য, মানুষের খাদা, নানা রোগ নিরাময়ের ওষুধপত্র পাওয়া যায়। রং, তেল, চিনি—এ সবাই হল বৃক্ষের নান। সভ্য মানুষের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় হল কাগজ। গাছ থেকেই এই কাগজ তৈরি হয়। স্থলযান, নৌযান, গৃহনির্মাণ, গৃহসজ্জার আসবাব নির্মাণে গাছের অবদান সর্বাধিক।

বনবৃদ্ধি:  সবুজ রং মানুষের দৃষ্টিকে নন্দিত করে। শ্যামল প্রকৃতির সংস্পর্শে এলে মানুষের মন সতেজ হয়। সুন্দরবন অঞ্চলে যথেচ্ছ বৃক্ষচ্ছেদন হওয়ায় বৃষ্টির পরিমাণ কমে গেছে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির জন্য ধনবৃদ্ধির প্রয়োজন। আর বনবৃদ্ধি হলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষিত হয়।

বনমহোৎসব :  বনবৃদ্ধির জন্য রবীন্দ্রনাথ শ্রাবণ মাসে শান্তিনিকেতন ‘বনমহোৎসব'-এর আয়োজন করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন – “মরুবিজয়ের

কেতন উড়াও শূন্যে/হে প্রবল প্রাণ। ... মাধুরী ভরিবে ফুলে ফলে পল্লবে/হে মোহন প্রাণ–মরুবিজয় করতে এবং ফুল-ফলে-পল্লবে মাধুরী ভরে তুলতেই বনমহোৎসবের সূচনা। সরকারও এই উৎসবকে গ্রহণ করেছে। তাই বন উন্নয়নকল্পে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে স্থাপিত হয়েছিল 'দ্য সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফরেস্ট্রি"।

উপসংহার :  বনমহোৎসবে বৃক্ষরোপণই শেষকথা নয়। শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে পরম যত্নে লালনপালন করে মা তাঁকে বড়ো করে তোলেন। তেমনি শিশু বৃক্ষকেও সযত্ন পালনে বড়ো করে তোলা প্রয়োজন। সরকারি, বেসরকারি স্কুল-কলেজ, সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে বনমহোৎসব প্রতি বছর পালিত হয়। পরম পরিতাপের বিষয় এই যে, সাড়ম্বরে বৃক্ষরোপণ অনুষ্ঠানের পর রোপিত বৃক্ষ যাতে বিনষ্ট না-হয়, সেদিকে কারও লক্ষ থাকে না। তাই আজকের দিনের মন্ত্র হওয়া উচিত বৃক্ষদের বিনাশ নয়, নতুন নতুন বৃক্ষরোপণ করে কল্যাণের পথকে প্রশস্ত করা। আর সুন্দর পৃথিবী উপহার দেওয়া। তাহলে পৃথিবী থাকবে সুস্থ রোগমুক্ত। আর বাতাস থাকবে ফুলে ফলে সুগন্ধে ভরা।