শীতের সকাল রচনা - Online story

Wednesday, 26 August 2026

শীতের সকাল রচনা

 



    প্রবন্ধ- রচনা

  ★ শীতের সকাল★ 

ভূমিকা: বছরের পঞ্চম ঋতু শীতকাল। হেমন্তের হাত ধরে শীতের আগমন ঘটে। কুয়াশার আলতো আবেশমাখা প্রিয় অস্পষ্ট স্মৃতির মতো শীতের সকাল হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাখিদের দল ঝাপসা আকাশের হলুদ আলোয় উড়ে উড়ে চলে। সবুজ ঘাসে শিশিরের স্পর্শ, সর পড়া পুকুরের জল, ভিজে হিম রাস্তার ঝরা পাতার ধুসর চাহনি আর কনকনে উত্তুরে হাওয়ার শীতল কাঁপুনি বলে, ওঠো, জাগো! কম্বলের উন্ন ওম সরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসি। বেরিয়ে এসে দেখি এক অন্য ধরনের পরিবেশ।

সকালের রূপ: সকলেই জেগে উঠেছে। গোবর জল দিয়ে নিকানো

উঠোন। শিশিরে টলমল করে গাছের পাতা। এসময় কবির ভাষায় বলতে ইচ্ছা হয়— “ঘাসের আগায় মানিক ঘনায় দুর্বা দলে দ্বীপ জ্বালে।” শিশির স্নাত গাছের পাতা সূর্যের আলো আর হাওয়ায় লুটোপুটি খেয়ে হীরক বিন্দুর মতো টলমল করে। হাঁসগুলো প্যাঁক প্যাঁক করতে করতে পুকুরের দিকে এগিয়ে যায়। চোখে পড়ে গাছে বাঁধা খেজুর রসের কলশি। আগের দিন শিউলিরা গাছ কেটে কলশি ঝুলিয়ে রেখে গেছে। ঠান্ডা কনকনে খেজুর রসের স্বাদ অতুলনীয়। তার সঙ্গে পাটালি গুড় আর মোয়ার কথাও মনে পড়ে যায়। মাঠে মাঠে পাকা সোনালি ধান। সেই ধানের খেতে বিচিত্র রঙের ফড়িং আর প্রজাপতির মেলা, যেন এক মোহময় রূপ। চাষিরা মাঠে মাঠে পাকাধান কাটতে নামে। কেউ আবার গেয়ে ওঠে—'পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে, আয়রে ছুটে আয়।' খেতে খেতে দেখা যায় নানা শাকসবজির সমারোহ। ফুলকপি, ওলকপি, বাঁধাকপি, মটরশুঁটি, বেগুন, টম্যাটো— যেন বর্ণময়তার খেলা। ইচ্ছে হয় টাটকা শিশিরভেজা সবজি তুলে ঝাঁকায় নিয়ে বাজার ও হাটের উদ্দেশে পাড়ি দিতে। শীতের আমেজ গায়ে মেখে রাস্তায় কুকুরগুলোও কুণ্ডলী পাকিয়ে রোদে শুয়ে আরাম উপভোগ করে। তাদের মানুষের মতো কাজকর্মের তাড়া নেই, তাই অলসভাবে শুয়ে থাকে। একটু দূরে মাঠে খেজুর রস জ্বাল দেওয়ার মিষ্টি গন্ধ নাকে ভেসে আসে। ভোজনরসিকের কাছে এই ঋতুর মতো ভালো ঋতু আর হয় না। শহরের সকালের রূপ সম্পূর্ণ আলাদা। কুয়াশার চাদরে অস্পষ্ট রাস্তাঘাট। ঝাপসা আলোয় ল্যাম্পপোস্টের আলোগুলি যেন কেরোসিনের বাতির মতো টিমটিম করতে থাকে। রাস্তায় গাড়ি চলাচল শুরু হয়ে যায়। লরি, ভ্যান করে বাজারে শাকসবজি আসতে থাকে। আবছা অন্ধকারে চায়ের দোকানে ইতিউতি ভিড় চোখে পড়ে। খবর কাগজওয়ালারা বাড়ি বাড়ি কাগজ দিয়ে বেড়ায়। একটু দেরিতে ভাঙে শহরের ঘুম। তাই রাস্তাঘাটে ভিড় কম। আস্তে আস্তে সূর্য দৃশ্যমান হয়। হইহই করে কেউ কেউ কোনো নদীর ধারে, কোনো জঙ্গলের মধ্যে, অথবা কোনো বাংলো বাড়িতে বনভোজনের উদ্দেশ্যে দলবেঁধে বেরিয়ে পড়ে। তাদের সারাদিন মজা। রোজকার জীবনের গণ্ডিবদ্ধতা ভেঙে এ-এক আশ্চর্য স্বাদবদল।

উপসংহার :  বাংলার ঋতুর বদল দু-মাস অন্তরই। তাই ঋতু বদলের অনুভূতি  সাধারণ মানুষজনের ওপর প্রভাব খুব কমই বিস্তার করে। তাদের মনের দরজায় শুধু কড়া নেড়ে যায় গ্রীষ্ম ও শীত। ফলে শীতের আগমনে শুধু গ্রামবাংলা নয়, শহরও চঞ্চল হয়ে ওঠে। উপভোগ করে শীতের উপঢৌকন আর শীতের সকাল অন্যান্য যে-কোনো ঋতুর সকালের থেকে যে স্বতন্ত্র আপন বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল –তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যুগ যুগ ধরে শীতের সকাল তার নিজের বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে চলেছে। হয়তো এভাবেই আরো যুগ যুগ ধরে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য বজায় রাখবে। আর না হলে হয়তো নিজের রূপ পাল্টিয়ে ফেলবে। তখন হয়তো শীতের সকালের এই বৈশিষ্ট্যগুলো আর দেখা যাবে না।