বাংলা ভাষার বিজ্ঞান || রাজ শেখর বসু || দশম শ্রেণি বাংলা সকল প্রশ্নের উত্তর - Online story

Friday, 21 August 2026

বাংলা ভাষার বিজ্ঞান || রাজ শেখর বসু || দশম শ্রেণি বাংলা সকল প্রশ্নের উত্তর

 




বাংলা ভাষার বিজ্ঞান

রাজশেখর বসু 

কমবেশি ১৫০ শব্দের মধ্যে উত্তর লেখো

প্রশ্ন: বাংলা ভাষার বিজ্ঞান-বিষয়ক গ্রন্থের পাঠকদের লেখক যে দুটি শ্রেণিতে ভাগ করেছেন, তাদের পরিচয় দাও।

অথবা, 'তাদের মোটামুটি দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যেতে পারে। -কাদের দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। শ্রেণি দুটির পরিচয় দাও।

উত্তর:  প্রখ্যাত রসায়নবিদ ও প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু তাঁর ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ বা গ্রন্থের পাঠকবর্গকে (বাংলাদেশে বা ভারতে) দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। যথা- (ক) প্রথম শ্রেণি : যারা ইংরেজি জানে না বা অতি অল্প জানে। (খ) দ্বিতীয় শ্রেণি : যারা ইংরেজি জানে ও ইংরেজি ভাষায় কমবেশি বিজ্ঞান পাঠ করেছে।

|| প্রথম শ্রেণির পরিচয়: প্রথম শ্রেণিভূক্ত পাঠকেরা হয় ইংরেজি জানে না, অথবা অতি অল্প ইংরেজি জানে। এই দলে পড়ে অল্পবয়স্ক ছেলেমেয়েরা এবং অল্পশিক্ষিত বয়স্ক লোকেরা। এদের বিজ্ঞানের সঙ্গে পূর্বপরিচয় থাকে না। কিছু ইংরেজি পারিভাষিক শব্দ তারা জানে, যেমন টাইফয়েড, মোটর,জেব্রা, আয়োডিন ইত্যাদি। অনেক স্থূল তথ্যও তাদের জানা থাকতে পারে। যেমন, জল আর কর্পূর উবে যায়, পিতলের চেয়ে অ্যালুমিনিয়াম হালকা ইত্যাদি। কিন্তু সুসংগঠিত বৈজ্ঞানিক জ্ঞান তাদের নেই। ইংরেজি ভাষার প্রভাবমুক্ত হওয়ায় এদের পক্ষে বাংলায় বিজ্ঞানপাঠ সহজতর হয়।

দ্বিতীয় শ্রেণির পরিচয়: দ্বিতীয় শ্রেণিভুক্ত পাঠক হল যারা ইংরেজি জানে এবং ইংরেজিতে কমবেশি বিজ্ঞানপাঠ করেছে। এই ধরনের পাঠকের পক্ষে বাংলায় লেখা বিজ্ঞান পড়া ও আয়ত্ত করা একটু কঠিন ও সময় সাপেক্ষ। কারণ বাংলা ভাষায় লেখা বিজ্ঞান রচনা পড়ার সময় তাকে ইংরেজির প্রতি পক্ষপাতিত্ব বর্জন করে মাতৃভাষার প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করতে হবে।

প্রশ্ন: ‘যে লোক আজন্ম ইজার পরেছে তার পক্ষে হঠাৎ ধুতি পরা অভ্যাস করা একটু শক্ত –ইজার' ও 'ধুতি' বলতে কী বোঝানো হয়েছে? অভ্যাস করা একটু শক্ত বলার কারণ কী?

উত্তর> ইজার ও ধুতি: লেখক রাজশেখর বসু তাঁর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে 'ইজার' ও ‘ধুতি' শব্দ দুটি রূপকার্থে ব্যবহার করেছেন। 'ইজার' হল পাজামা বা প্যান্ট, যা বিদেশি বিশেষ করে ইংরেজদের পোশাক। সেই অনুষঙ্গ ধরেই লেখক ইজারের রূপকে ইংরেজি ভাষাকে বুঝিয়েছেন। একইভাবে বাঙালি পোশাক ধুতির অনুষঙ্গে বাংলা ভাষাকে বুঝিয়েছেন। যারা ছোটোবেলা থেকে ইংরেজি ভাষায় পঠনপাঠনে অভ্যস্ত তাদের বাংলায় বিজ্ঞানপাঠ যে কঠিন তা বোঝানোর জন্য উপমাটি ব্যবহার করা হয়েছে।

 কারণ : ভাষা যদি বোধগম্য না-হয় তবে বিষয়বস্তুর অর্থ স্পষ্ট হয় না। ছোটো থেকে ইংরেজি ভাষায় পঠনপাঠনে অভ্যস্ত এমন মানুষদের পক্ষে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যপাঠ একটু সমস্যাজনক হতে পারে। কেন-না এদের মস্তিষ্কের ভাষাগত বিরোধ পারিভাষিক অর্থ বোঝার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কারণ তারা কোনো একটি বিষয়ে ইংরেজি পরিভাষার সঙ্গে পরিচিত, বাংলা ভাষায় সেসব বিষয়ের পরিভাষার সঙ্গে অভ্যস্ত হতে তাদের একটা মানসিক বিরোধ উপস্থিত হয়। এই প্রসঙ্গটিকে ব্যক্ত করতে গিয়ে প্রাবন্ধিক বলেছেন, যারা আজন্ম ইজার পরেছে অর্থাৎ ইংরেজিকে মাতৃভাষার মতো লালন করে এসেছে, হঠাৎ তাদের পক্ষে ধুতি পরার মতো বাংলা ভাষা আয়ত্ত করে বিজ্ঞানচর্চা সত্যিই মুশকিল।


প্রশ্ন:  'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় এখনও নানারকম বাধা আছে/- লেখক কোন্ ধরনের বাধার কথা বলেছেন ?

অথবা, 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' রচনায় প্রাবন্ধিক বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ক্ষেত্রে যেসব অসুবিধার কথা বলেছেন তা আলোচনা করো।

উত্তর >  বাংলায় বিজ্ঞানচর্চার পথে সম্ভাব্য বাধা সম্পর্কে রাজশেখর বসু তাঁর ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে আলোচনা করেছেন। বাধাগুলি এইরূপ—

> পাঠকের অভাব : ইংরেজি জানে এবং ইংরেজিতে বিজ্ঞান পাঠ করেছে এমন পাঠকের বাংলায় বিজ্ঞানচর্চা বেশ কঠিন।

> পারিভাষিক শব্দের অভাব : বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও উপযুক্ত পারিভাষিক শব্দের অভাব এ পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

>বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাব : পাশ্চাত্য দেশগুলির তুলনায় আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের বিজ্ঞানবোধ খুবই কম। সামান্য বিজ্ঞানবোধ না-থাকলে বিজ্ঞানভিত্তিক রচনা বোধগম্য হয় না। তাই বাংলায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে সমস্যা থেকে গেছে।

> ভাষার আড়ষ্টতা : অনেক লেখকের ভাষা আড়ষ্টতা ও ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ দোষে দুষ্ট হয়ে রচনা তার সাবলীলতা হারায়।

> অবাস্তব ভাবনা : অনেকে পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে রচনাকে সহজবোধ্য করার ভাবনা ভাবলেও তা বাস্তবতা পায়নি।

> অলংকারের ব্যবহার : উপমা ও রূপক ছাড়া অন্যান্য অলংকার বিজ্ঞানভিত্তিক রচনার গুরুত্বকে লঘু করে দেখায়।

> ভুল তথ্য পরিবেশন : শেষ বাধাটি হল ভুল তথ্য পরিবেশন। অনেকে না-জেনে কিংবা সামান্য জেনে বাংলায় বিজ্ঞান রচনায় ভুল তথ্য পরিবেশন করেন। প্রাবন্ধিকের মতে, আলোচিত বাধাগুলি অতিক্রম না করতে পারলে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চা ত্রুটিহীন হওয়া সম্ভব নয়।

প্রশ্ন: 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' রচনা করতে গেলে কী ধরনের বাধাও দোষ দূর করতে হবে বলে প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু মনে করেন, তা প্রবন্ধ অবলম্বনে ব্যাখ্যা করো।


অথবা, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চায় এখনও নানারকম বাধা আছে।-এই বাধা করতে লেখক কী কী পরামর্শ দিয়েছেন তা আলোচনা করো।

উত্তর>  প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' রচনায়, বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার বিবিধ সমস্যা আর অন্তরায় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তবে শুধু বাধা কিংবা দোষগুলিকে উল্লেখ করেই তিনি থেমে থাকেননি, বরং সেগুলির নিরসনের উপায় খুঁজেছেন। উপায়গুলি এইরূপ :

বাংলায় পারিভাষিক শব্দের অভাব রয়েছে। যতদিন-না উপযুক্ত আর আরজি শব্দের প্রামাণিক পারিভাষিক শব্দ রচিত হচ্ছে, ততদিন ইংরেজি শব্দ বাংলা বানানে চালানোই ভালো। যেমন— ফার্ন, ম্যালভাসি ইত্যাদি। বিজ্ঞানশিক্ষার প্রসার ও বিস্তার যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ বিজ্ঞানের প্রাথমিক বিষয়গুলির সঙ্গে পরিচিত থাকলে বৈজ্ঞানিক রচনা বোঝা সহজ হয়।


স্পষ্ট ও সাবলীল  ভাষা প্রয়োগ : আড়ষ্ট ভাষা এবং আক্ষরিক অনুবাদ বৈজ্ঞানিক রচনাকে অস্পষ্ট ও দুর্বল করে তোলে। তাই স্পষ্ট ও সাবলীল ভাষায় যথাযথ

রচনাপদ্ধতি অবলম্বন করে, বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ রচনা করা উচিত। যেমন, Sensitized Paper-এর অনুবাদ স্পর্শকাতর কাগজ না-করে লেখা উচিত সুগ্রাহী কাগজ ৷


ভাষার নিজস্বতা ও স্বাভাবিকতা বজায়: নিজের বক্তব্য ইংরেজিতে ভেবে, সেটি যথাযথ বাংলা অনুবাদে প্রকাশ করলে রচনা খুবই উৎকট হয়। বাংলা ভাষার নিজস্বতা ও স্বাভাবিকতা বজায় রাখা দরকার।

পারিভাষিক শব্দ: অল্প পরিচিত পারিভাষিক শব্দের ব্যাখ্যা দেওয়া আবশ্যক এবং প্রয়োজন অনুসারে পারিভাষিক শব্দ ব্যবহার করতে হবে।


অলংকার বর্জন : বৈজ্ঞানিক প্রসঙ্গের ভাষা হবে স্পষ্ট ও সরল, সেখানে অলংকারের প্রয়োগ কম হওয়াই বাঞ্ছনীয় অবিখ্যাত লেখকদের বৈজ্ঞানিক রচনা প্রকাশের আগে, অভিজ্ঞ লোককে দিয়ে যাচাই করিয়ে নেওয়া উচিত। সন্দর্ভ যাচাই করা



প্রশ্ন: ‘তাঁদের উদ্‌যোগের এই ত্রুটি ছিল যে... - কাদের, কোন্ উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে? উক্ত ত্রুটির বিষয়টি পরিস্ফুট করো।

উত্তর >  যাদের উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে :বহু বছর আগে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী পণ্ডিত-লেখক বিভিন্ন বিষয়ের বাংলা পরিভাষা রচনা করেছিলেন। এঁদের উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হওয়া সত্ত্বেও কাজটি ছিল ত্রুটিপূর্ণ। প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে সেই প্রসঙ্গে আলোচনাকালে এরূপ মন্তব্য করেছেন।

!! বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পণ্ডিতবর্গ নানা বিষয়ে পরিভাষা রচনা করলেও তার মধ্যে ত্রুটি ছিল। সেগুলি হল-(ক) একযোগে কাজ না করা : বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের বিদ্যোৎসাহী লেখকগণ একযোগে কাজ না-করে স্বতন্ত্রভাবে করেছিলেন।

(খ) পরিভাষার অসমতা : একযোগে কাজ না-করার জন্য সংকলিত পরিভাষা সাম্য রচিত হয়নি, একই ইংরেজি সংজ্ঞার বিভিন্ন প্রতিশব্দ রচিত হয়েছে।

এই বিষয়টি পাঠকদের মধ্যে সংশয় সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, একই বিষয়ে একটিই সর্বসম্মত ও গ্রহণযোগ্য পরিভাষা নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। এই পণ্ডিতবর্গ একত্রে কাজ করলে পরিভাষা রচনার কাজটি আরও সুসংহত ও সুচারু হতে পারত।

প্রশ্ন: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিভাষা সমিতির সদস্য কারা ছিলেন? এঁদের প্রচেষ্টা সফল হয়েছিল কিনা, তা বুঝিয়ে দাও।

উত্তর > পরিভাষা সমিতির সদস্য : রাজশেখর বসু রচিত 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' নামক প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে পরিভাষা রচনার উদ্দেশ্যে একটি সমিতি গঠিত হয়েছিল। এ সমিতির যাঁরা সদস্য ছিলেন, তাঁরা হলেন বিভিন্ন বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্ববিদ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত এবং কয়েকজন লেখক।

|| প্রচেষ্টার পরিণতি: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে বিজ্ঞানের অধ্যাপক, ভাষাতত্ত্ববিদ, সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ও লেখকদের নিয়ে যে-পরিভাষা রচনা সমিতি গঠিত হয়েছিল, তাদের কাজ ইতিপূর্বে গঠিত বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের পরিভাষা সমিতির তুলনায় অনেক সুসংহত ও সফল হয়েছিল। কারণ, তাঁরা একযোগে কাজ করেছিলেন। পৃথকভাবে কাজ করার মধ্যে যে-বিচ্ছিন্নতা রয়েছে, তা কাজের সংহতিকে বিঘ্নিত করে। এঁদের ক্ষেত্রে সেই বিচ্ছিন্নতা অনুপস্থিত থাকায় তাঁদের সংকলনে সমতা এসেছে। তাতে পাঠকের পক্ষে অর্থ বোঝা সহজ হয়েছে। কিন্তু কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-কৃত সংকলন খুব বড়ো নয় বলে আরও শব্দের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধ হয়। প্রাবন্ধিকের ভাষায়— ‘কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংকলন খুব বড়ো নয়, আরও শব্দের প্রয়োজন আছে এবং তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা করা আবশ্যক। তাই প্রাবন্ধিক আরও ব্যাপকতার সঙ্গে পারিভাষিক নির্মাণের দিকে জোর দিয়েছেন।


প্রশ্ন: 'কিন্তু দরকার মতন বাংলা শব্দ পাওয়া না গেলেও বৈজ্ঞানিক রচনা চলতে পারে। -যুক্তিসহ আলোচনা করো।

 উত্তর > ত্রুটিপূর্ণ সংকলন :রাজশেখর বসু রচিত ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান’ নামক প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ ও কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধানে যে দুটি পরিভাষা সমিতি গঠিত হয়েছিল, তারা স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিভাষা-সংকলন প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়েছিল। সংকলনগুলি ছিল যথেষ্ট ত্রুটিপূর্ণ। পরিভাষার প্রয়োজনীয়তা: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়-কৃত পরিভাষা সংকলনটি তেমন বড়ো না-হওয়ায়,আরও বহু শব্দ সংযোজনের প্রয়োজন ছিল। তাই এই বিষয়টিকে অতিক্রম করতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

প্রাবন্ধিকের সিদ্ধান্ত: 

প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে জানিয়েছেন যে, যতদিন না উপযুক্ত ও প্রামাণ্য বাংলা পরিভাষা রচিত হয়, ততদিন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান-সংক্রান্ত রচনার ক্ষেত্রে বাংলা বানানে ইংরেজি শব্দ ব্যবহার করা চলতে পারে। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় নিযুক্ত পরিভাষা সমিতি বহু ইংরেজি শব্দই বজায় রেখেছে এবং তাদের মতে নবাগত রাসায়নিক বস্তুর ইংরেজি নামই বাংলায় লেখা উচিত, যেমন- অক্সিজেন, প্যারাডাইক্লোরোবেনজিন। এ ছাড়া উদ্ভিদ ও প্রাণীর জাতিবাচক নামও ইংরেজি ভাষায় বাংলা বানানে লেখা যেতে পারে, যেমন— ম্যালভাসি, ফার্ন, আরথ্রোপোডা ইনসেক্টা ইত্যাদি।

প্রশ্ন: 'পাশ্চাত্য দেশের তুলনায় এ দেশের জনসাধারণের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান নগণ্য – লেখকের এমন মন্তব্যের কারণ কী?

উত্তর > প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু তাঁর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' প্রবন্ধে বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে নানা অসুবিধার কথা তুলে ধরতে গিয়ে উক্ত মন্তব্যের অবতারণা করেছেন।

ভারতীয়দের নগণ্য বৈজ্ঞানিক জ্ঞান: বিজ্ঞানের ছাত্র রাজশেখর বসু তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার দ্বারা অনুভব করেছেন, ভারতবর্ষের সমসাময়িক মানুষেরা বিজ্ঞান বিষয়ে তেমন দক্ষ নয়। বিজ্ঞান নিয়ে কৌতূহলও অনেকের মধ্যে ছিল না। হয়তো টাইফয়েড, আয়োডিন, মোটর, ক্রোটন, জেব্রা ইত্যাদির মতো গুটিকতক ইংরেজি তারা শিখেছে স্বাভাবিকভাবে, কিন্তু সুশৃঙ্খল আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্য সম্পর্কে তারা ছিল অন্ধকারে; অথচ একই সময়কালে ইউরোপ-আমেরিকার মতো দেশগুলিতে মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানের জ্ঞান অধিক ছিল। তাই প্রাবন্ধিক বলেছেন – 'ইউরোপ আমেরিকায় পপুলার সায়েন্স লেখা সুসাধ্য এবং সাধারণে তা সহজেই বোঝে। কিন্তু আমাদের দেশে বয়স্কদের জন্য যা লেখা হয়, তাও প্রাথমিক বিজ্ঞানের মতো গোড়া থেকে না-লিখলে বোধগম্য হয় না। প্রাবন্ধিকের মতে, সাধারণ মানুষদের জন্য যাঁরা বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান লেখেন, তাঁরা এ বিষয়ে অবহিত না হলে তাঁদের লেখা জনপ্রিয় হবে না। প্রাবন্ধিক অত্যন্ত আশাবাদী। তিনি জানেন সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষও বদলাবে। তাই তিনি আশা করেন, এ দেশে একদিন বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার ঘটবে আর এইসকল অসুবিধাগুলো দূরীভূত হবে; তখন বৈজ্ঞানিক সাহিত্যরচনা সুসাধ্য হবে।

প্রশ্ন: 'এ দেশে বিজ্ঞান শিক্ষার বিস্তার হলে এই অসুবিধা দূর হবে।-কোন্ অসুবিধার কথা বলা হয়েছে আলোচনা করে বুঝিয়ে দাও। 

উত্তর >  প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু তাঁর 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' নামক প্রবন্ধে স্বল্প পরিসরে পাশ্চাত্য দেশগুলির সঙ্গে ভারতবর্ষের বিজ্ঞানশিক্ষার তুলনামূলক আলোচনা করেছেন।

ভারতীয়দের সীমিত  বৈজ্ঞানিক জ্ঞান:  প্রাবন্ধিক দেখেছেন পাশ্চাত্য দেশগুলির তুলনায় ভারতবর্ষের সাধারণ

মানুষের বিজ্ঞান-বিষয়ক জ্ঞান সীমিত। বিজ্ঞান সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান না-থাকলে কোনো উচ্চমানের বৈজ্ঞানিক রচনা বোঝা এক অর্থে অসম্ভব।

পাশ্চাত্য দেশের সুবিধা: পাশ্চাত্য দেশগুলিতে পপুলার সায়েন্স বা সাধারণের জন্য বিজ্ঞান রচনা সহজসাধ্য, কারণ তা বোঝার মতো প্রাথমিক জ্ঞান সাধারণ মানুষের আছে। কিন্তু ভারতবর্ষের পরিস্থিতি আলাদা। বয়স্কদের জন্য রচিত বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যও গোড়া থেকে না-লিখলে বোধগম্য হয় না।

লেখকের দায়বদ্ধতা: প্রাবন্ধিক তাই সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে জানিয়েছেন, যাঁরা বিজ্ঞান লেখেন, এই বিষয়টি তাঁদেরও মনে রাখা দরকার। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন তাঁরা এ বিষয়ে অবহিত না হলে তাঁদের লেখা জনপ্রিয় হবে না। পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে বিজ্ঞানশিক্ষা বিস্তারলাভ করলে এই সমস্যা দূর হবে বলে প্রাবন্ধিক মতামত প্রকাশ করেছেন।

প্রশ্ন: 'তখন বৈজ্ঞানিক সাহিত্য রচনা সুসাধ্য হবে। তখন বলতে কী বোঝানো হয়েছে? বর্তমান প্রেক্ষিতে বৈজ্ঞানিক রচনা সুসাধ্য নয় কেন? কী করলে বৈজ্ঞানিক সাহিত্যরচনা সুসাধ্য হবে বলে প্রাবন্ধিক মনে করেন ?

উত্তর >  তখন বলতে প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসুর মতে, কালক্রমে এদেশে বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার ঘটলে জনসাধারণ প্রাথমিক বিজ্ঞানের গোড়ার বিষয়গুলি জেনে যাবে। জনসাধারণের বিজ্ঞান বিষয়ে প্রাথমিক জ্ঞান বাড়লে; ‘তখন' বৈজ্ঞানিক সাহিত্যরচনা সহজ হবে।

II বর্তমান প্রেক্ষিতে বৈজ্ঞানিক রচনা:  বর্তমানে এ-দেশের অবস্থা পাশ্চাত্য দেশগুলির মতো নয়। এখানকার সাধারণ মানুষ প্রাথমিক বিজ্ঞানের সাধারণ বিষয়গুলিও জানে না। এমনকি পরিণত বয়স্ক মানুষদের জন্য কিছু লিখলেও একেবারে গোড়া থেকে লিখতে হয়। কারণ বৈজ্ঞানিক জ্ঞান খুব সামান্য বা প্রায় কিছুই না-থাকায়; তা তাদের বোধগম্য হয় না। তাই এদেশে বৈজ্ঞানিক সাহিত্যরচনা সহজ নয়।

|| বৈজ্ঞানিক সাহিত্যরচনা সুসাধ্যের উপায় : বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার ঘটলেই এই পরিস্থিতির বদল ঘটবে। বিজ্ঞান সম্পর্কে প্রাথমিক ধ্যানধারণার স্বচ্ছতার জন্যই ইউরোপ- আমেরিকায় পপুলার সায়েন্স লেখা সহজ। সময়ের সাঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার প্রসার; বিজ্ঞানশিক্ষার বিস্তার এদেশেও অনুরূপ অবস্থা তৈরি করবে। মানুষের কাছে বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ বোধগম্য হয়ে উঠবে। তখন বৈজ্ঞানিক সাহিত্যরচনা সুসাধ্য হবে বলে প্রাবন্ধিক মনে করেন।

প্রশ্ন: 'এরকম বর্ণনা বাংলা ভাষায় প্রকৃতিবিরুদ্ধ। -কোন প্রসঙ্গে এরকম বর্ণনার উল্লেখ করা হয়েছে? মন্তব্যটির তাৎপর্য বিশ্লেলণ করো

অথবা, 'এতে রচনা উৎকট হয়।—কীসে রচনা উৎকট হয়? এর থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যেতে পারে বলে লেখক মনে করেন?

উত্তর >   প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু ‘বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' রচনায় বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ অনুবাদের সময় ভাষার জড়তা এবং আড়ষ্টতা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে আক্ষরিক অনুবাদের অসাড়তার দিকটিকে উল্লেখ করেছেন। কারণ অনেক লেখক তাঁদের বস্তুর ইংরেজিতে ভাবেন আর যথাযথ বাংলা অনুবাদে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। যেমন, 'The atomic engine has not even reached the blue pri stage, — 'পরমাণু এন্ট্রিন নীল চিত্রের অবস্থাতেও পৌঁছায়নি। এরকম উৎকট রচনাকেই তিনি বাংলা ভাষার প্রকৃতিবিরুদ্ধ বলে মনে করেছেন।

|| বাংলা রচনাপদ্ধতি আয়ত্ত করা : বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্যকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে গেলে- ভাষা। আড়ষ্টতাজনিত দুর্বলতার দোষ কাটিয়ে তুলতে হবে। আর বাংলা ভাষার মাধুর্য এবং বাক্যগঠন পদ্ধতির মধ্যে ভারসাম্য রেখেই এ কাজ করা উচিত। এজন্য বাংলা রচনাপদ্ধতিটি ও আয়ত্তে থাকা প্রয়োজন।

ভাষার নিজস্বতা ও বাংলা ভাষায় :  পূর্বে উল্লেখিত ইংরেজি বাক্যটির তরজমা করতে গিয়ে একটু ঘুরিয়ে যদি লেখা হয়, 'পরমাণু এঞ্জিনের নকশা পর্যন্ত এখনও প্রস্তুত হয়নি' তবে বাংলা ভাষাটি বজায় থাকে। প্রাবন্ধিক এসমস্ত কারণেই মাছিমারা নকলের বদলে ভাষার নিজস্বতা এবং স্বাভাবিকতা বজায় রাখার পক্ষপাতী।

সাবলীল ভাষার প্রয়োগ : সাবলীল ভাষা, যথাযথ রচনাপদ্ধতি ও স্বাভাবিকতার দিকে নজর থাকলে,বাংলা বৈজ্ঞানিক রচনা সহজ আর স্পষ্ট হয়ে উঠবে। এটাই প্রাবন্ধিকের অভিমত।


প্রশ্ন: এই দোষ থেকে মুক্ত না হলে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্য প্রতিষ্ঠিত হবে না।- 'এই দোষ' বলতে কোন্ দোষের কথা বলা হয়েছে? এই দোষের যে-ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা আলোচনা করো।

অথবা, 'এই দোষ থেকে মুক্ত না হলে বাংলা বৈজ্ঞানিক সাহিত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হবে না -কোন্ দোষের কথা বলা হয়েছে? কীভাবে এই দোষ থেকে মুক্ত হওয়া যাবে?


উত্তর > এই দোষ-এর পরিচয়:   প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসুর মতে, বাংলায় বৈজ্ঞানিক সাহিত্য লেখার জন্য যে-রীতি অবলম্বন করা উচিত তা বহু লেখকই রপ্ত করতে পারেননি। তাদের ভাষা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আড়ষ্টতা এবং ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদের দোষে দুষ্ট। প্রশ্নে সে-দোষের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।

| প্রতিশব্দজনিত দোষের ব্যাখ্যা:  বৈজ্ঞানিক সাহিত্য লেখার ক্ষেত্রে বহু লেখক ইংরেজি শব্দের অর্থব্যাপ্তি যা ‘Connotation' বাংলা প্রতিশব্দে হুবহু আনতে চান। এমনটি করতে গিয়ে তাঁরা অদ্ভুত কিছু শব্দের প্রয়োগ করেন। যেমন, ইংরেজি ‘sensitive” শব্দটির বহু ইংরেজি অর্থ আছে। যেমন, sensitive person, balance ইত্যাদি। আবার এগুলির বাংলা অর্থ হতে পারে ব্যথাপ্রবণ, সুগ্রাহী ইত্যাদি। কিন্তু ‘sensitized paper'- এর বাংলা অনুবাদ কেউ যদি ‘স্পর্শকাতর কাগজ” বলে তবে তা শুনতে অদ্ভুত লাগবে। বরং ‘সুগ্রাহী কাগজ' লিখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়।

অনুবাদজনিত দোষের ব্যাখ্যা: ইংরেজি বাক্যের আক্ষরিক অনুবাদও শ্রুতিকটু হয়। যেমন, ‘The atomic engine has not even reached the blue print stage'-এর আক্ষরিক অনুবাদ ‘পরমাণু এঞ্জিন নীল চিত্রের অবস্থাতেও পৌঁছোয়নি'। এটি একটি উৎকট অনুবাদ। তবে অংশটির ভাবানুবাদ (‘পরমাণু এঞ্জিনের নকশা পর্যন্ত এখন প্রস্তুত হয়নি') অনেকাংশেই শ্রুতিমধুর। এ থেকে স্পষ্ট যে, লেখক সহজ-সাবলীল অনুবাদের মাধ্যমে ভাষার আড়ষ্টতা ও আক্ষরিক অনুবাদের দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে চেয়েছেন।


প্রশ্ন: 'এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। কোন্ ধারণা? লেখক কীভাবে প্রমাণ করেছেন যে, এই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয় ?

অথবা, 'অনেকে মনে করেন পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে বক্তব্য প্রকাশ করলে রচনা সহজ হয় :- মতটিকে তুমি কি সমর্থন কর? আলোচনা করে বুঝিয়ে দাও।

উত্তর> ধারণা:  অনেকে মনে করেন যে, বাংলা ভাষায় বৈজ্ঞানিক সাহিত্য লেখার সময় পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে বক্তব্য প্রকাশ করলে রচনা সহজ হয়। লেখক রাজশেখর বসুর মতে, এই ধারণা বিভ্রান্তিকর।

 লেখকের প্রমাণ: প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু মনে করেন যে, কোথাও কোথাও পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে কাজ চললেও সর্বত্র তা সম্ভব নয়। যেমন: 'আমেরুদণ্ডী' বোঝাতে লেখা যেতে পারে যেসব জন্তুর শিরদাঁড়া  নেই। কিন্তু 'আলোকতরঙ্গ' পরিবর্তে আলোর কাঁপন বা নাচন লেখা কখনোই বিজ্ঞানসম্মত নয়। এক্ষেত্রে কোনো বিষয় সম্পর্কে ভুল ধারণার সৃষ্টি হতে পারে। একইসঙ্গে বারবার কোনো বিষয়ের বর্ণনা ভাষার গতি যেমন শ্লথ করে, তেমনই তাকে স্থূল করে তোলে। তাই পরিভাষার ব্যবহার ভাষাকে সংক্ষিপ্ত ও সুনির্দিষ্ট অর্থবিশিষ্ট করে। সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে প্রথমবার ব্যবহৃত কিংবা কম ব্যবহৃত পরিভাষার অর্থ ও প্রয়োগ দিয়ে দেওয়া উচিত। লেখার পরবর্তী অংশে কেবল পরিভাষাটি দিলেই চলে। এভাবেই প্রাবন্ধিক বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধে যথার্থ পরিভাষা ব্যবহারের পক্ষে সওয়াল করেছেন।


প্রশ্ন : তাতে পাঠাকের অসুবিধা হয়। ---- কীসে পাঠকের অসুবিধা হয়? অসুবিধা দূর করার জন্য কী কী করা প্রয়োজন?

উত্তর >  পাঠকের অসুবিধা:  প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসুর মতে, বাংলায় বৈজ্ঞানিক সাহিত্য রচনায় পরিভাষার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। যথার্থ পরিভাষা ভাষাকে সর্বাঙ্গসুন্দর করে। পরিভাষা ছাড়া কোনো রচনায় বিষয়ের বর্ণনায় বারবার একই কথা লিখে আলোচনা দীর্ঘায়িত করতে হয়। অবান্তর বর্ণনা পাঠকমনে অসুবিধা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।

| অনেক লেখকের মতে, পারিভাষিক শব্দ কম ব্যবহার করে বা সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে রচনাকে সহজতর করা যায়। কিন্তু ব্যাপারটা তা নয়, পরিভাষা বর্জন কোনো কোনো ক্ষেত্রে সম্ভব হলেও সর্বত্র তা অনুচিত। কারণ, আমেরুদণ্ডী বুঝাতে যেসব জন্তুর শিরদাঁড়া নেই লেখা গেলেও আলোক তরঙ্গ বোঝাতে আলোর কাঁপন বা নাচন লিখলে ব্যাপারটা কিছুমাত্র সহজ হয় না। তাই যথার্থ পরিভাষার ব্যবহারেই পাঠকের অসুবিধা দূর করা সম্ভব। পরিভাষা-লেখার ভাষাকে যেমন সংক্ষিপ্ত করে, তেমনই অর্থকে সুনির্দিষ্ট করে। সুতরাং পরিভাষ সম্পূর্ণ বর্জনের পরিবর্তে, বৈজ্ঞানিক রচনাগুলিতে ছয় পরিচিত বা অপরিচিত পরিভাষার সঙ্গে তার ব্যাখ্যা ও ইংরেজি নাম দেওয়া চলতে পারে।

পরবর্তীকালে বিষয়টি পরিচিত হয়ে যাওয়ার পর শুধু বাংলা পরিভাষাটি দিলেই কাজ চলবে।

প্রশ্ন :  আমাদের আলংকারিক শব্দের ত্রিবিধ কথা বলেছেন—শব্দের ত্রিবিধ কথাগুলি আলোচনা করো

অথবা, "আলংকারিকগণ শব্দের ত্রিবিধ কথা বলেছেন- এগুলি কি কি উদাহরণ সহযোগে বুঝিয়ে দাও।


 উত্তর>  শব্দের ত্রিবিধ কথা- মানবশরীরের শোভাবর্ধনকারী গহনাকে অলংকার বলে। সাহিত্যের অঙ্গ হিসেবে শব্দ ও অর্থের শোভাবর্ধনকার বিষয়গুলিকে অলংকার বলে। 

অভিধা : ভারতীয় অলংকারীদের মধ্যে শব্দের শক্তিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়।অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা।  'অভিধা' শব্দের অর্থ নাম বা সংজ্ঞা এবং একটি শব্দের প্রথম শক্তি। যার সাহায্যে শব্দের মুখ্য অর্থের জ্ঞান হয়। এক কথায় শব্দের আভিধানিক অর্থ হলো 'অভিধা। যেমন অরণ্য শব্দের অর্থ বন, জঙ্গল ইত্যাদি।


লক্ষণা : শব্দের দ্বিতীয় শক্তি 'লক্ষণা' ব্যবহৃত হয় যখন শব্দের মূল অর্থ বাধাপ্রাপ্ত হয় তখন। যেমন, 'দেশের লজ্জা' বলতে 'দেশ' অর্থাৎ ভারত, চিন, জাপানের লজ্জা নয়, সেখানকার জনগণের অর্থাৎ দেশবাসীর লজ্জা বোঝায়।


লক্ষণা: 'অভিধা' বা 'লক্ষণা'-র দ্বারা যখন বক্তার মনোভাব পরিস্ফুট না-হয়, তখন অর্থ বোঝানোর জন্য 'ব্যঞ্জনা' প্রযুক্ত হয়। যেমন, 'অরণ্যে রোদন' শব্দটির অর্থ 'বনে কান্না' নয়; ব্যঞ্জনার্থে শব্দটির অর্থ হল 'নিষ্ফল খেদ'।

প্রাবন্ধিকের মন্তব্য: প্রাবন্ধিকের মতে শব্দ ও পরিভাষা বিষয়ের আলোচনায় আলংকারিকদের ত্রিবিধ অর্থ প্রকাশনা সূত্রের কথা মাথায় রাখতে হবে।

‘অভিধা’, ‘লক্ষণা' ও 'ব্যঞ্জনা' বিষয়ে অস্পষ্ট ধারণার কারণে বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধের উদ্দেশ্য অস্পষ্ট হয়ে যায়। তাই অলংকারের পরিবর্তে পরিভাষার প্রয়োগ যুক্তিযুক্ত।


প্রশ্ন: 'কিন্তু বৈজ্ঞানিক সাহিত্যে যত কম থাকে ততই ভালো—কী কম থাকার কথা বলা হয়েছে? সেই বিষয়গুলিকে পরিস্ফুট করো।


উত্তর >  কম থাকা বিষয়: সাহিত্যে লক্ষণা, ব্যঞ্জনা, উৎপ্রেক্ষা, সমাসোক্তি প্রভৃতি অলংকারের প্রয়োগ ঘটলেও, প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসুর মতে বিজ্ঞান-বিষয়ক সাহিত্যের ব্যবহার কম হওয়া উচিত।

|শব্দের ত্রিবিধ শক্তি:  ভারতীয় আলংকারিকগণ শব্দের শক্তিসমূহকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন, যথা—অভিধা, লক্ষণা ও ব্যঞ্জনা। ‘অভিধা' শব্দের অর্থ হল নাম বা সংজ্ঞা। ‘লক্ষণা' হল শব্দের দ্বিতীয় শক্তি। মুখ্য অর্থের পরিবর্তে এই শক্তি দ্বারা শব্দের অন্য অর্থ প্রবল হয়ে ওঠে। যেমন, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি'-র অর্থ হল অরণ্যবাসীদের রোজনামচা।

‘ব্যঞ্জনা' কাব্যের নিগূঢ় অর্থপ্রকাশক বৃত্তি। অভিধা ও লক্ষণার দ্বারা যে-অর্থ বোঝানো সম্ভব হয় না, তা ব্যঞ্জনার দ্বারা বোঝানো হয়। যেমন, ‘অরণ্যে রোদন' কথার অর্থ হল 'নিষ্ফল আবেদন'।

বিভিন্ন অলংকার: পূর্বে উল্লিখিত ত্রিবিধ শক্তি ছাড়াও আলোচ্য অংশে লেখক রাজশেখর বসু উৎপ্রেক্ষা ও অতিশয়োক্তি অলংকারের কথা বলেছেন। উপমেয়কে উপমানরূপে ভুল করা হলে উৎপ্রেক্ষা অলংকার হয়। যেন, বুঝি ইত্যাদি শব্দ উৎপ্রেক্ষার দ্যোতক। উৎপ্রেক্ষা দু-প্রকার –বাচ্যোৎপ্রেক্ষা ও প্রতীয়মানোৎপ্রেক্ষা। অন্যদিকে অতিশয়োক্তি অলংকারে উপমেয়ের উল্লেখ মোটেই না-করে উপমানকেই উপমেয়রূপে নির্দেশ করা হয়। বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধের ক্ষেত্রে এইসব অলংকারের ব্যবহা কম হওয়াই উচিত।

প্রশ্ন :  ‘এই কথাটি সকল লেখকেরই মনে রাখা উচিত।— কোন্ কথাটি মনে রাখা উচিত? লেখকদের কোন্ কোন্ ত্রুটির কথা প্রাবন্ধিক তুলে ধরেছেন?


উত্তর > মনে রাখার বিষয় ; প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যরচনায় ভাষার গুরুত্ব প্রসঙ্গে উক্তিটি করেছেন। তাঁর মতে, এ জাতীয় আলোচনার ভাষা সরল ও স্পষ্ট হওয়া উচিত। এ কথা লেখকদেরও মনে রাখা উচিত।

|| লেখকদের ভাষাসমস্যা : বাংলায় বিজ্ঞানভিত্তিক সাহিত্যরচনায় লেখকদের ভাষাসমস্যা অন্যতম অন্তরায়। এক্ষেত্রে উপযুক্ত লিখনশৈলী অনেক লেখক আয়ত্ত করতে পারেননি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁদের ভাষা আড়ষ্ট ও ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ হয়ে দাঁড়ায়। ইংরেজি শব্দের অর্থব্যাপ্তি বাংলা প্রতিশব্দে আনতে গিয়ে তারা নানা অদ্ভুত করেন।


লেখকদের ভাবনাচিন্তা : অনেক লেখক আছেন, যাঁরা তাঁদের বক্তব্যের বিষয়বস্তু ইংরেজিতে ভালো আর তার হুবহু অনুবাদের চেষ্টা করেন। তখন পাঠ বিষয় নীরস ও শুষ্ক হয়ে পড়ে।


পরিভাষা ব্যবহারে সমস্যা : পরিভাষাও ব্যবহারের ক্ষেত্রেও লেখকদের কিছু সমস্যা থেকে গেছে। বিজ্ঞানভিত্তিক রচনায় পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে লেখাকে সহজবোধ্য করতে গিয়ে কিছু লেখা পরিভাষার  মূল উদ্দেশ্য যে ভাষাসংক্ষেপ, তা থেকে বিচ্যুত হচ্ছে।


অলংকারের ব্যবহার: অলংকারের ক্ষেত্রে একমাত্র উপমা ও রূপক অলংকার চলতে পারে। তার মৌলিক ও উচ্চাঙ্গের বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ লিখতে গেলে অলংকারবর্জিত, সাবলীল, আক্ষরিক অনুবাদের ত্রুটিমুক্ত সহজসরল স্পষ্ট ভাষা লেখকদের অনুসরণ করা উচিত।

প্রশ্ন:  'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' শীর্ষক প্রবন্ধটিতে পরিভাষা রচনা প্রসঙ্গে লেখক যে-বক্তব্য প্রকাশ করেছেন তা আলোচনা করো।

অথবা, ‘অনেকে মনে করেন পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে বক্তব্য প্রকাশ করলে রচনা সহজ হয়।-মতটির যাথার্থ্য বিচার করো।

উত্তর > 'বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান' রচনায় রাজশেখর বসু বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার বিভিন্ন সমস্যা বিষয়ে আলোকপাত করে সেগুলি অতিক্রম করার বিষয়ে সচেষ্ট হয়েছেন।

পারিভাষিক শব্দের অভাব ও সমাধান :  বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার বিভিন্ন বাধার মধ্যে একটি হল পারিভাষিক শব্দের অভাব। অনেক সময়েই কোনো ইংরেজি শব্দের উপযুক্ত বাংলা শব্দ পাওয়া যায় না। এই সমস্যা দূর করার জন্য; যতদিন না যথাযথ বাংলা শব্দ রচিত হচ্ছে, ততদিন ইংরেজি শব্দ বাংলা বানানে ব্যবহার করাই যুক্তিসংগত।

অনেকের ধারণ: অনেকে আবার মনে করেন পারিভাষিক শব্দ বাদ দিয়ে বক্তব্য প্রকাশ করলে রচনা সহজ হয়। তবে এ ধারণা সম্পূর্ণ ঠিক নয়। যেমন, অমেরুদণ্ডীর বদলে হয়তো যেসব জন্তুর শিরদাঁড়া নেই লেখা যায়; কিন্তু 'আলোকতরঙ্গ'-র বদলে আলোর কাঁপন বা নাচন লিখলে প্রাসঙ্গিক অর্থ পরিস্ফুট হয় না।

প্রাবন্ধিকের সিদ্ধান্ত : পরিভাষার উদ্দেশ্যই হল ভাষার সংক্ষেপ এবং সুনির্দিষ্ট অর্থের প্রকাশ তাই পরিভাষা বাদ দিলে একই কথার পুনরাবৃত্তির ফলে বক্তব্য অনর্থক দীর্ঘ এবং অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভ লেখার সময় অল্পপরিচিত পারিভাষিক শব্দ প্রথমবার প্রয়োগের সময়, তার ইংরেজি নামসহ ব্যাখ্যা দেওয়া আবশ্যক। যদিও পরে প্রচলিত হয়ে গেলে, শুধু বাংলা পারিভাষিক শব্দটি ব্যবহার করলেই চলে।


প্রশ্ন:  ‘বাংলা বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধাদিতে আর একটি দোষ প্রায় নজরে পড়ে।–কোন্ দোষের কথা বলা হয়েছে? এই দোষ মুক্তির উপায় কী?

অথবা, 'এই রকম ভুল লেখা সাধারণ পাঠকের পক্ষে অনিষ্টকর/- কী ধরনের ভুল লেখার কথা লেখক উল্লেখ করেছেন। সেই ভুল সংশোধনের কোন উপায় তিনি নির্দেশ করেছেন লেখো।


উত্তর > দোষের পরিচয়:  বাংলায় বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধরচনা করতে লেখকদের বহু ক্ষেত্রে ত্রুটিবিচ্যুতি লক্ষণীয়, যেমন—ভাষার আড়ষ্টতা, ইংরেজির আক্ষরিক অনুবাদ, পরিভাষা বর্জন, অতিরিক্ত অলংকারের ব্যবহার ইত্যাদি। প্রাবন্ধিক রাজশেখর বসু এসব কিছুকে ছাপিয়ে অপর একটি প্রচলিত ও হানিকর দোষের কথা উল্লেখ করেছেন। সেটি হল সঠিক তথ্য না-জেনে ভুল লেখা। এতে পাঠকদের জ্ঞান আহরণে ক্ষতি হয়। লেখক এ বিষয়ে একটি পত্রিকার উদ্ধৃতি দিয়েছেন, যাতে লেখা ছিল, 'অক্সিজেন বা হাইড্রোজেন স্বাস্থ্যকর বলে বৈজ্ঞানিক যুক্তি নেই। তারা জীবের বেঁচে থাকবার পক্ষে অপরিহার্য অঙ্গ মাত্র। তবে ওজন গ্যাস স্বাস্থ্যকর।' এ ধরনের বিজ্ঞানগত ভুল পাঠকের পক্ষে ক্ষতিকর। তাই এ দোষ থেকে মুক্ত হওয়ার কথাই প্রাবন্ধিক উক্ত প্রবন্ধে বলেছেন।

 দোষ মুক্তির উপায়: প্রাবন্ধিক এই দোষ মুক্তির ব্যাপারে লেখক ও পত্রপত্রিকার সম্পাদকদের সচেতন হতে বলেছেন। বিজ্ঞানভিত্তিক রচনায় ভুল তথ্য পরিবেশন একেবারেই কাম্য নয়-এ বিষয়ে নজর রাখতে হবে। কোনো বিষয় সম্পর্কে গভীর ও যথার্থ জ্ঞান সংগৃহীত হওয়ার পরই এই ধরনের রচনায় মনোনিবেশ করা উচিত। পত্রিকা ও পুস্তক সম্পাদকদের উচিত কোনো অখ্যাত বা অনামি লেখকদের রচনা প্রকাশের আগে তাদের লেখাকে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের দিয়ে যাচাই করে নেওয়া। এককথায়, বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ রচনাকালে বিষয়ের ওপর স্পষ্ট ধারণা ও জ্ঞান থাকা উচিত।