অভিষেক। মাইকেল মধুসূদন দত্ত। দশম শ্রেণি বাংলা। কিছু প্রশ্নের উত্তর - Online story

Sunday, 24 May 2026

অভিষেক। মাইকেল মধুসূদন দত্ত। দশম শ্রেণি বাংলা। কিছু প্রশ্নের উত্তর



অভিষেক কবিতা 

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

 কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্তর

প্রশ্ন: কনক-আসন ত্যজি–কে, কেন কনক আসন ত্যাগ করেছিল?


উত্তর > আমাদের পাঠ্য মধুসূদনের 'অভিষেক' নামক কাব্যাংশে রাবণ ও

মন্দোদরীর বীরপুত্র ইন্দ্রজিতের কনক-আসন ত্যাগের কথা বলা হয়েছে।

|| ইন্দ্রজিৎ প্রমোদ উদ্যানে স্ত্রী প্রমীলা ও তাঁর সখীদের নিয়ে প্রমোদবিহারে বাস্ত ছিলেন। এমন সময় ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মী সেখানে উপস্থিত হন। ধাত্রী প্রভাষার এই অপ্রত্যাশিত আগমনের কারণ জানার জন্য ও তার প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য ইন্দ্রজিৎ কনক-আসন ত্যাগ করেছিলেন। মধুসূদনের ইন্দ্রজিৎ এখানে বিনয়, শ্রদ্ধা ও সৌজন্যবোধের প্রতীকরূপে প্রতিভাত।

প্রশ্ন  “শির: চুম্বি, ছদ্মবেশী অম্বুরাশি-সুতা/উত্তরিলা;— অম্বুরাশি-সুতা” কে? তাঁর উত্তর কী ছিল?

উত্তর >  মধুসূদনের 'অভিষেক’ নামক পাঠ্য কাব্যাংশে ‘অম্বুরাশি-সুতা’ শব্দটি পাই। ইনি আসলে দেবী লক্ষ্মী। দেবতা ও অসুরের সমুদ্র মন্থনকালে জল থেকে উত্থিত বলে তাঁর এমন নাম।

|| দেবী লক্ষ্মী ধাত্রী প্রভাষার রূপে প্রমোদ উদ্যানে হাজির হলে ইন্দ্রজিৎ তাঁকে আসার কারণ ও লঙ্কার কুশল জিজ্ঞাসা করেন। অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে তিনি (দেবী লক্ষ্মী) রামের সঙ্গে  ভীষণ যুদ্ধে ইন্দ্রজিতের প্রিয় ভাই বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ ও পুত্রশোকে শোকগ্রস্ত পিতা রাবণের যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতির কথা জানান।


প্রশ্ন > ‘সসৈন্যে সাজেন আজি যুঝিতে আপনি। – আপনি কে? তার যুদ্ধসজ্জার পরিচয় দাও। 

উত্তর > মধুসূদন দত্ত রচিত 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর 'অভিষেক' নামাঙ্কিত কবিতার উদ্ধৃত অংশে 'আপনি' হলেন রাবণ।

|| রামের হাতে রাবণপুত্র বীরবাহু মৃত। সেজন্য পুত্রশোকে কাতর রাবণ

বীরমদে মত্ত হয়ে যুদ্ধযাত্রার জন্য সাজছেন। চারদিকে শোনা যাচ্ছে যুদ্ধের বাজনা, হাতির গর্জন, ঘোড়ার ডাক ও পদাতিক সৈন্যের হুংকার। উড়ছে রেশমি পতাকা।


প্রশ্ন: "জিজ্ঞাসিলা মহাবাহু বিস্ময় মানিয়া:- কাকে 'মহাবাহু' বলা হয়েছে? তার বিস্ময়ের কারণ কী?

উত্তর >  মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কাব্যাংশ থেকে গৃহীত

উদ্ধৃতিটিতে ‘মহাবাহু” বলতে রাক্ষস বংশের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ইন্দ্রজিতের কথা বলা হয়েছে।

|| স্বর্ণলঙ্কার ঘোর দুর্দিনের সংবাদ নিয়ে প্রভাষা-রূপী লক্ষ্মী প্রমোদকাননে এসে উপস্থিত হন। সেখানে উপস্থিত ইন্দ্রজিৎকে তিনি জানান, ভয়াবহ যুদ্ধে তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহু নিহত হয়েছেন এবং পুত্রশোকে স্তব্ধ রক্ষোপতি রাবণ সসৈন্যে যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি  নিচ্ছেন। লঙ্কাপুরী এখন বীরশূন্য। ভাইয়ের মৃত্যু ও পিতার যুদ্ধযাত্রার কথা শুনে, এ সমস্ত ঘটনাক্রম সম্পর্কে অনবগত ইন্দ্রজিৎ বিস্মিত হয়েছিলেন।

প্রশ্ন >  ‘এ অদ্ভুত বারতা,—কোন্ বার্তা, কেন অদ্ভুত?

 উত্তর/ উদ্ধৃত অংশটি মধুসূদন দত্ত রচিত (মেঘনাদবধ কাব্য : প্রথম সর্গ)

‘অভিষেক’ নামক পাঠ্য কবিতা থেকে গৃহীত।

|| লক্ষ্মীদেবী ইন্দ্রজিতের ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে এসে স্বর্ণলঙ্কার সকল সংবাদ তাঁকে জানালেন। সম্মুখসমরে রামের সঙ্গে প্রচণ্ড যুদ্ধে নিহত হয়েছেন ইন্দ্রজিতের প্রিয় ভাই বীরবাহু। কিন্তু ইন্দ্রজিৎ এ সংবাদে অত্যন্ত বিস্ময়াপন্ন হলেন। কারণ তিনি নিজের হাতে রাত্রিকালীন যুদ্ধে রামকে হত্যা করেছেন। আর সেই মৃত

রাঘব কিনা তাঁর ভাই-ই-এর হত্যাকারী। এই বার্তাই তাঁর কাছে অদ্ভুত লেগেছে।


প্রশ্ন: ‘সীতাপতি’ কে? তাঁকে ‘মায়াবী মানব' বলা হয়েছে কেন ?

উত্তর > পাঠ্য ‘অভিষেক' কাব্যাংশে উক্ত নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।

অযোধ্যার রাজা দশরথের জ্যেষ্ঠপুত্র ছিলেন রাম। এই রামচন্দ্রের স্ত্রীর নাম

সীতাপতি সীতা। এই কারণে রামচন্দ্রকে 'সীতাপতি' বলা হয়েছে।

|| সীতাপতি রামচন্দ্রকে লক্ষ্মীদেবী 'মায়াবী মানব' বলেছেন। কারণ মায়াবী না-হলে প্রবল শক্তিশালী ইন্দ্রজিতের তিরে রামের মৃত্যু হলেও, তিনি কীভাবে পুনরায় দৈবপ্রভাবে পুনর্জীবন লাভ করেন। এই কারণে কাব্যাংশে রামকে 'মায়াবী মানব' রূপে উপস্থাপনা করা হয়েছে।

প্রশ্ন > 'রক্ষ রক্ষঃকুল মান. এ কালসমরে, রক্ষঃ চূড়ামণি। -বা‘রক্ষঃ-চূড়ামণি' বলে কাকে সম্বোধন করেছেন। 'কালসমর' বলতে কী বোঝা ?


উত্তর > বক্তা ইন্দিরা সুন্দরী অর্থাৎ লক্ষ্মী দেবী ‘রক্ষঃ-চূড়ামণি' বলে ইন্দ্রজিৎকে সম্বোধন করেছেন।

'কালসমর' বলতে বোঝায় কাল রূপ সমর বা ভয়ংকর যুদ্ধ। এক্ষেত্রে রামচন্দ্রের সঙ্গে রাক্ষসদের ভয়ংকর প্রাণঘাতী যুদ্ধকে বোঝানো হয়েছে।

ছদ্মবেশী দেবী লক্ষ্মী প্রমোদকাননে ইন্দ্রজিতের সামনে যখন হতাশার সুরে বীরবাহুর মৃত্যু, রাবণের যুদ্ধযাত্রার কথা বলছিলেন তখন তা তাঁর বিশ্বাস হচ্ছিল না। দেবী মায়াবী মানব রামচন্দ্রের জেগে ওঠা ও তাঁর দৈবী শক্তির পরিচয় দিতে শব্দটি ব্যবহার করেছেন।

প্রশ্ন > ‘ধিক্ মোরে’–কে, কেন এ কথা বলেছেন? 

উত্তর > উদ্ধৃত অংশটির বক্তা মধুসূদনের ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ থেকে গৃহীত অভিষেক' নামক কাব্যাংশের অন্যতম চরিত্র ইন্দ্রজিতের। মেঘনাদ

প্রমোদকাননে বিলাসব্যসনে মত্ত থাকার সময় প্রভাষার ছদ্মবেশে লক্ষ্মী এসে ইন্দ্রজিৎকে তার প্রিয় ভ্রাতা বীরবাহুর মৃত্যু এবং শোকস্তব্ধ রাবণের শত্রু রাঘব নিধনে ব্রতী হওয়ার কথা জানান। লঙ্কার এই দুর্দিনে ইন্দ্রজিৎ প্রমোদকাননে মেয়েদের মাঝে থেকে রাজধর্ম পালনে ব্যর্থ হয়েছেন বলে তাঁর এই আত্মধিক্কার।



প্রশ্ন: ‘এই কি সাজে আমারে'—কার উক্তি? এমন উক্তি কেন করা হয়েছে?


উত্তর >  মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কাব্যাংশ থেকে গৃহীত

উদ্ধৃতিটির বক্তা ইন্দ্রজিৎ।


|| ইন্দ্ৰজিৎ প্রমোদকাননে বামাদল মাঝে বিলাসব্যসনে মত্ত। এমন সময় প্রভাষা-রূপী লক্ষ্মী এসে জানান বুদ্ধে রামের হাতে বীরবাহু মৃত। এই

পরিস্থিতিতে স্বয়ং রক্ষোরাজ রাবণ যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। লঙ্কার এমন দুর্দশায় বীরধর্ম পালনে ব্যর্থ হওয়ায় ইন্দ্রজিৎ লজ্জা ও ঘৃণায় আত্মধিকার দেন। তখন ক্রোধে 'কুসুমদাম', 'কনকবলয়' ছুড়ে ফেলে যুদ্ধযাত্রার উদ্দেশ্যে অধীর হয়ে উঠে, তিনি প্রশ্নোদ্ধৃত মন্তব্যটি করেছিলেন।


প্রশ্ন: 'ঘুচাব এ অপবাদ, – বক্তা কোন্ অপবাদ, কীভাবে ঘোচাতে চেয়েছেন? 

উত্তর/ প্রশ্নে উদ্ধৃত অংশটি 'অভিষেক' নামাঙ্কিত কাব্যাংশ থেকে গৃহীত

হয়েছে। বক্তা ইন্দ্রজিৎ প্রভাষা রাক্ষসীর বেশধারিণী লক্ষ্মীদেবীর মুখে ভাইয়ের মৃত্যুসংবাদ এবং রাবণের যুদ্ধপ্রস্তুতির কথা শুনে দ্রুত প্রমোদ উদ্যান ত্যাগ করে-লঙ্কায় যাত্রা করতে উদ্যত হলেন। যখন তিনি বুঝলে স্বর্ণলঙ্কার ঘোরতর দুর্দিনে তিনি নারীদের মাঝে বিলাসব্যসনে মত্ত, তখন নিজেকে তিনি ধিক্কার জানালেন ও শত্রুকুলের নির্ধন

করবার প্রতিজ্ঞা করে সকল অপবাদ ঘোচাবেন বলে দৃঢ সংকল্প নিলেন।


প্রশ্ন:;'সাজিলা রণীদর্য'-'রথীন্দ্রবভ' কে? তিনি কেমনভাবে সাজলেন ?


উত্তর>  মধুসুদনের 'অভিষেক' নামক পাঠ্য কাব্যাংশে 'রথীন্দর্যভ’ শতা

পাই, যার অর্থ 'শ্রেষ্ঠ রথী'। এখানে 'রথীন্দ্রর্যভ' বলতে ইন্দজিৎকে বোঝানো হয়েছে।

||| প্রমোদকাননে মেয়েদের মাঝে ইন্দ্রজিৎ যখন বিলাসব্যসনে মত্ত ছিলেন। তখন লঙ্কার ঘোর দুর্দিনের পবর পেয়ে নিজেকে ধিক্কার জানান। শত্রুপক্ষকে বিনাশ করতে এই শ্রেষ্ঠ বীর তারকাসুর বিনাশকালে কার্তিকের মতো ও বিরাট রাজার গোধন রক্ষার সময় বৃহন্নলারূপী অর্জুনের মতো রণসাজে সজ্জিত হলেন।

প্রশ্ন: বৃহন্নলারূপী কিরীটি কে? তাঁর কোন কীর্তির কথা পাঠে উল্লিখিত হয়েছে?

উত্তর>  মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কাব্যাংশে বৃহন্নলারূপী কিরীটি হলেন তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন। অজ্ঞাতবাস কালে, বিরাট রাজার কন্যা উত্তরার নৃত্যগীত শিক্ষিকারূপে নিযুক্ত অর্জুন বৃহন্নলারূপী কিরীটি বৃহন্নলাবেশ ধারণ করেন।


||অর্জুন যখন বৃহন্নলার ছদ্মবেশে বিরাট রাজার প্রাসাদে ছিলেন, সেসময় দুর্যোধন বিরাট রাজাকে পরাস্ত করে তাঁর সমস্ত গোধন হরণ করেন। তখন অর্জুন রাজপুত্র উত্তরের সারথিরূপে কৌরবদের সঙ্গে যুদ্ধ করে বিরাট রাজাকে বিপদ থেকে মুক্ত করেন। তাঁর সেই গোধন উদ্ধারের কীর্তির কথাই পাঠে উল্লিখিত হয়েছে।


প্রশ্ন:; ‘কহিলা কাঁদিয়া ধনি;’–‘ধনি’ কে? তিনি কাঁদলেন কেন?

উত্তর > ‘অভিষেক’ কাব্যাংশে ‘ধনি’ বলতে ইন্দ্ৰজিৎ-পত্নী প্রমীলাকে বোঝানো হয়েছে।

|| ধাত্রী প্রভাষা বেশধারী লক্ষ্মী যখন স্বর্ণলঙ্কার দুর্দিন, ইন্দ্রজিতের ভাই

বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ ও রাবণের যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতির খবর ইন্দ্রজিতের কাছে দিলেন, তখন তিনি প্রমোদকাননে নারীদের মাঝে বিলাসব্যসনে মত্ত ছিলেন। স্বর্ণলতা যেভাবে বড়ো গাছকে আঁকড়ে ধরে, সেভাবে প্রমীলা রক্ষকুলনিধি

ইন্দ্রজিৎকে আঁকড়ে ধরে, তাঁর পথ রোধ করে কেঁদে ফেলেন। স্বামীর বিচ্ছেদ বেদনায় পত্নীর কাতর ও ব্যথাতুর রূপটি প্রমীলার মধ্য দিয়ে ফুটে ওঠে।

প্রশ্ন: 'তাজ কিঙ্করীরে আজি?-বক্তা কে? তার মনে এমন প্রশ্ন জেগে ওঠার কারণ কী ?

অথবা, 'কেমনে ধরিবে প্রাণ তোমার বিরহে-কার উক্তি? কেন এমন উক্তি?

উত্তর>  মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কবিতা থেকে গৃহীত অংশে ইন্দ্ৰজিৎ-পত্নী প্রমীলার মনে এই প্রশ্ন জেগেছে।

|| ইন্দ্ৰজিৎ, ধাত্রী প্রভাষা-বেশী লক্ষ্মীর কাছে স্বর্ণলঙ্কার দুর্দিনের খবর পান। এই সংবাদ শুনে তিনি স্বর্ণলঙ্কার উদ্দেশে রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত। হন। এমন সময় পত্নী প্রমীলা তাঁর পথ রোধ করে দাঁড়ান। প্রমীলা স্বামীর কাছে, তাঁকে ত্যাগ করার কারণ জানতে চান। জানতে চান এই হতভাগিনি ইন্দ্রজিৎ-বিনা কেমনভাবে বেঁচে থাকবেন।

ব্রততীকে মাতঙ্গ ত্যাগ করলেও যেমন যুথনাথ আশ্রয় দেয়, ঠিক তেমনভাবেই তিনি কোনোক্রমে ইন্দ্রজিতের পদাশ্রয়ে নিজ স্থান খুঁজেছেন। আসলে স্বামীবিরহে বিরহাতুরা এক পত্নীর অন্তরের রূপটি এই উক্তির মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।


প্রশ্ন:  বিদায় এবে দেহ, বিষ্ণুমুখী ।— 'বিধুমুখী' শব্দের অর্থ কী? তার কাছে কেন বিদায় চাওয়া হচ্ছে?

অথবা, 'বিদায় এবে দেহ, বিধুমুখী।'— 'বিধুমুখী' কাকে বলা হয়েছে? কেন বিদায় চাওয়া হয়েছে?

উত্তর>  উদ্ধৃতাংশটি মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘অভিষেক’ কাব্যাংশ থেকে গৃহীত। ‘বিধুমুখী' শব্দের অর্থ চন্দ্রমুখী। প্রাণাধিক-প্রিয় প্রমীলার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁর প্রতি ইন্দ্রজিতের এমন সম্বোধন।

|| ইন্দ্ৰজিৎ‍ প্রমোদকাননে প্রমীলাসহ বামাদল মাঝে বিলাসব্যসনে মত্ত

ছিলেন। এমন সময় ধাত্রীর ছদ্মবেশে লক্ষ্মী এসে তাঁকে স্বর্ণলঙ্কার ঘোরতর

দুরবস্থার কথা জানান। প্রিয় ভাই বীরবাহু মৃত এবং শোকে বিহ্বল পিতা রাবণ সসৈন্যে যুদ্ধযাত্রায় উদ্যত। এ

সংবাদে লজ্জিত ও ক্রুদ্ধ ইন্দ্রজিৎ তৎক্ষণাৎ প্রমোদকানন ত্যাগ করে পিতার সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশে লঙ্কাপুরীর দিকে রওনা হন। বিদায় নেওয়ার সময় তিনি প্রশ্নোকৃত মন্তব্যটি করেছিলেন।


প্রশ্ন: কাঁপিলা লঙ্কা, কাঁপিলা জলধি ! লঙ্কা কেঁপে উঠল কেন ?


উত্তর > পাঠ্য 'অভিষেক' কাব্যাংশে ছদ্মবেশী প্রভাষার কাছে লঙ্কার

দুর্দিনের সংবাদ শুনে প্রমোদকানন ত্যাগ করে ইন্দ্রজিৎ শত্রুর হাত থেকে

লঙ্কাকে রক্ষার্থে লঙ্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন।

ইন্দ্রজিতের এই আগমনকে আকাশপথে মৈনাক পর্বতের সোনার পাখা বিস্তার করে উজ্জ্বল করে তোলার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ক্রুদ্ধ ইন্দ্রজিতের ধনুকের গুণ পরানো ও শর নিক্ষেপকে মেঘের মাঝে গরুড়ের গর্জনের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। এর ফলেই লঙ্কা ও সমুদ্র কেঁপে উঠেছে।

প্রশ্ন : 'এ মায়া, পিতঃ, কোন্ মায়ার কথা বলা হয়েছে?

উত্তর>  মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কাব্যাংশে রামচন্দ্রের মায়াবলে পুনরায় জীবন ফিরে পাওয়ার প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয়েছে।

ধাত্রী প্রভাষারূপী লক্ষ্মী ইন্দ্রজিৎকে লঙ্কার ঘোরতর দুর্দিনের কথা জানান

এবং এও বলেন, ‘মায়াবী মানব সীতাপতি; তব শরে মরিয়া বাঁচিল।' এ সংবাদ শোনামাত্র ইন্দ্রজিৎ প্রমোদ উদ্যান ত্যাগ করে লঙ্কায় পিতা রাবণের কাছে উপস্থিত হলেন। রাজা রাবণ তখন নিজেই যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন। এই অবস্থায় ইন্দ্রজিৎ রাবণকে। রামচন্দ্রের পুনর্জীবন লাভের কারণ জানতে চাইলেন।


প্রশ্ন:  'সমূলে নির্মূল/করিব পামরে আজি - কাকে, কীভাবে বক্তা নির্মূল করবে।

উত্তর > 'মেঘনাদবদ কাব্য'-এর 'অভিষেক' সর্গের অন্তর্গত আলোচ্য পঙ্ক্তিটিতে ইন্দজিৎ রামচন্দ্রকে নির্মূল করতে চেয়েছেন।

| যুদ্ধে যখন বীরবাহুকে রামচন্দ্র নিহত করেছেন, সে সংবাদ পেয়ে ইন্দ্রজিৎ পিতা রাক্ষসরাজ রাবণকে বলেছেন পিতা অনুমতি দিলে তিনি অগ্নিবাণে তাঁকে ভস্ম করে বায়ু অস্ত্রে উড়িয়ে দেবেন, নয়তো রামচন্দ্রকে তাঁর পিতার চরণে বেঁধে এনে দেবেন।

প্রশ্ন : ‘আলিঙ্গি কুমারে,—কুমার কে? তাঁকে আলিঙ্গন করে কে, কী বলেছিলেন ?

উত্তর >  'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর অন্তর্গত ‘অভিষেক' নামাঙ্কিত কাব্যাংশে কুমার হলেন রাবণ ও মন্দোদরী পুত্র ইন্দ্রজিৎ।

||| পুত্রের বীরত্বব্যঞ্জক বাক্যে অত্যন্ত খুশি ও আহ্লাদিত হয়ে রাবণ তাঁর শির চুম্বন করলেন এবং তাঁকে ‘রাক্ষস-কুল-শেখর' ও 'রাক্ষস-কুল-ভরসা' বলে বাহবা জানালেন। সেইসঙ্গে পুত্রবৎসল পিতৃহৃদয়ে জেগে উঠল পুত্রকে যুদ্ধে পাঠানোর আশঙ্কা। তিনি অকপটে পুত্রের কাছে স্বীকার করলেন নিজের অসহায়তার কথা। বিধাতার বিরূপতায় আজ তাঁকে বাধ্য হয়েই লঙ্কার শ্রেষ্ঠ সন্তান মেঘনাদকে যুদ্ধে পাঠাতে হচ্ছে।


★ প্রশ্ন:  ‘হায়, বিধি বাম মম প্রতি।-বক্তা কে? তিনি এমন কথা বলেছেন কেন ?

উত্তর>  উদ্ধৃতাংশটি মধুসূদন দত্ত রচিত ‘অভিষেক’ নামক পদ্যাংশ থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে বক্তা স্বয়ং রাবণ।

|| বীরবাহুর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ক্রুদ্ধ ইন্দ্রজিৎ লঙ্কায় উপস্থিত হয়ে রাবণের কাছে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। একবার পুত্রশোক পাওয়ার পর রামের বিরুদ্ধে এই ভয়ানক যুদ্ধে আর-এক প্রিয় পুত্রকে পাঠাতে চান না রাবণ। কিন্তু ভাগ্য তাঁর প্রতি এতটাই বিরূপ যে, শেষপর্যন্ত রক্ষকুলশেখর ইন্দ্রজিৎকেও যুদ্ধে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি।


প্রশ্ন:  ‘কে কবে শুনেছে পুত্র, ভাসে শিলা জলে, বক্তা কে? তাঁর এ কথা বলার কারণ কী ?


উত্তর:  'অভিষেক' কবিতাংশে রামচন্দ্রের পুনর্বার বেঁচে ওঠা সম্পর্কে সন্দিহান হয়ে রাবণ এমন উপমা ব্যবহার করেছেন।

|| ইন্দ্রজিতের হাতে দু-বার রামচন্দ্রের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েও তিনি আবার বেঁচে ওঠেন। তাই প্রিয় পুত্রকে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি দিলেও বিধাতা যে তাঁর প্রতি বিরূপ তা তিনি বুঝতে পারেন।

শিলা বা পাথরের জলে ভাসার মতোই মৃত মানুষের বেঁচে ওঠাও অবিশ্বাস্য ব্যাপার। বিস্ময় ও হতাশা ব্যক্ত করতে এমন উপমা ব্যবহৃত হয়েছে।


প্রশ্ন:  : 'বীর বাঁচে কি ঔষধে। -এ কথা বলা হয়েছে কেন ?

উত্তর >   পিতাকে যুদ্ধযাত্রা থেকে বিরত করে ইন্দ্রজিৎ রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অনুমতি চান। রাবণ রাক্ষসকুলের একমাত্র ভরসাকে কালসমরে পাঠাতে নারাজ ছিলেন। কিন্তু ইন্দ্রজিৎ বলেন, পুত্র বর্তমান থাকতে পিতার যুদ্ধযাত্রা কলঙ্কব্যঞ্জক। ইতিপূর্বে দু-বার রামচন্দ্র তাঁর কাছে পরাজিত হয়ে দৈবীবলে জীবন ফিরে পেলেও এবার কোনো ওষুধেই তিনি বাঁচবেন না। আত্মবিশ্বাস ও পিতার

কাছে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চাওয়ার কারণে এ কথা বলা হয়েছে।


প্রশ্ন: 'জাগান অকালে'-কে 'অকালে' জেগেছিল। কেন জেগেছিল?


উত্তর>  'অভিষেক' নামক রচনাংশে উদ্ধৃত অংশটির উল্লেখ রয়েছে।

রাক্ষসরাজ রাবণের মধ্যম ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ অকালে জেগেছিল।


|| ব্রহ্মার বরে কুম্ভকর্ণ ছ-মাস ঘুমোনোর পর একদিন জেগে উঠে প্রচুর আহার ও পান করতেন। তিনি ছিলেন বিশাল বলশালী। তাই লঙ্কার এই দুর্দিনে একমাত্র তিনিই পারতেন দেশ ও জাতিকে রাঘবকুলের মতো শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে। তাই কুম্ভকর্ণের ঘুমের মেয়াদ পূর্ণ না-হওয়া সত্ত্বেও, বহু অনুচর পাঠিয়ে রাবণ তাঁর নিদ্রাভঙ্গ করেন। একেই ‘অকাল জাগরণ' বলা হয়েছে।


প্রশ্ন :  কুম্ভকর্ণের পরিচয় দাও।

উত্তর >  অভিষেক' কবিতায় কুম্ভকর্ণের উল্লেখ পাওয়া যায়। রাক্ষসরাজ রাবণের মধ্যম ভ্রাতা কুম্ভকর্ণ। তিনি বিশ্বশ্রবা মুনি ও নিষার দ্বিতীয় পুত্র। ব্রহ্মার বরে তিনি ছ-মাস ঘুমোনোর পরে একদিন জাগতেন এবং ওই একদিন তিনি প্রচুর পরিমাণে পান ও ভোজন করতেন। তিনি অমিত বলশালী ছিলেন। বিশাল দেহধারী এই রাক্ষস বহু যুদ্ধে রাবণকে সাহায্য করেছিলেন। রামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য বহু অনুচর পাঠিয়ে রক্ষরাজ রাবণ অসময়ে কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ করেন। রামের হাতেই কুম্ভকর্ণের মৃত্যু হয়।


প্রশ্ন: 'আগে পূজ ইষ্টদেবে,—এমন উক্তি কার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে? কেন এমন উক্তি করা হয়েছে?

উত্তর > মাইকেল মধুসুদন দত্তের 'অভিষেক' কবিতায় রাক্ষসকুলপতি

প্রিয় পুত্র ইন্দ্রজিতের উদ্দেশ্যে প্রশ্নোদৃত উক্তিটি করেছিলেন।

| লঙ্কাপুরীতে প্রবেশ করে বীরশ্রেষ্ঠ ইন্দ্রজিৎ পিতাকে যুদ্ধযাত্রা থেকে বিরত করেন। শোকে-দুঃখে কাতর রাবণকে তিনি এক সুযোগ্য সন্তানের মতো সাহস জোগান। পুত্রের শৌর্য সাহস ও বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে রাবণ আশ্বস্ত হন।

ইন্দ্রজিৎ দ্বিতীয়বার রাঘবকে পরাজিত করার জন্য পিতার কাছে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চান। তখন রাবণ প্রথমে ইন্টাদেবতা অগ্নির পুজার্চনায় তাঁকে তুষ্ট করে এবং নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করে আশীর্বাদপ্রাপ্ত হয়ে, যুদ্ধযাত্রার কথা বলেন। এর থেকে পুত্রের প্রতি এক শুভাকাঙ্ক্ষী পিতার স্নেহ, ভালোবাসা এবং মততাবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। এখানে রাবণীর ধার্মিকতার ও পরিচয় পাওয়া যায়।

প্রশ্ন 'প্রভাতে যুঝিও,’-বক্তার এমন বলার কারণ কী?

উত্তর> প্রশ্নোদ্ভূত উক্তির বক্তা রাবণ। ইন্দ্রজিৎ তাঁকে যুদ্ধযাত্রা থেকে বিরত

করে নিজে যুদ্ধযাত্রায় যাবেন এমন আবেদন করেন। অনেক আবেদন-নিবেদনের পর রাবণ অনুমতি দেন এবং ইন্দ্রজিৎকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করেন।

বিধাতার কাছে পরাজিত রাবণ দৈবশক্তির প্রতি আস্থা রেখে পুত্রকে ইষ্টদেবের পূজা করে যুদ্ধযাত্রার কথা

বলেন। নিজের সামরিক অভিজ্ঞতা থেকে লঙ্কেশ্বর তাঁর প্রিয় পুত্রকে সন্ধায় যুদ্ধে না-গিয়ে প্রভাতে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।



প্রশ্ন: প্রমীলা কে? ইন্দ্রজিতের সঙ্গে তাঁর কথোপকথন নিজের ভাষায় লেখো।


উত্তর > পাঠ্য 'অভিষেক' নামাঙ্কিত কাব্যাংশে মধুসুদন ইন্দ্রজিতের স্ত্রী

হিসেবে প্রমীলাকে উপস্থিত করেছেন। বাল্মীকি রামায়ণে না-থাকলেও আমরা কৃত্তিবাসী রামায়ণে তাকে পাই। এখানে  প্রমীলা কবির নিজস্ব পরিকল্পনা।

| প্রমোদ উদ্যানে বিলাসে মত্ত থাকাকালীন প্রভাষারূপী ছদ্মবেশী দেবী লক্ষ্মীর মুখে রাঘবের হাতে বীরবাহুর মৃত্যু ও শোকাহত রাবণের যুদ্ধযাত্রার কথা শুনে ক্রুদ্ধ ইন্দ্ৰজিৎ নিজেকে ধিক্কার জানিয়ে রণসাজে সজ্জিত হয়ে যখন বীরদর্পে যুদ্ধে গমনোদ্যত, তখন প্রমীলার দেখা পাওয়া যায়। তিনি তখন স্বামীর দুটি পা ধরে কেঁদে জানতে চান, ইন্দ্রজিৎ তাঁকে রেখে আজ কোথায় চলেছেন? স্বামীর বিরহে কীভাবে তিনি দিনপাত করবেন? এ প্রসঙ্গে প্রমীলার বক্তব্য গভীর জঙ্গলে হাতির দল বনলতার আকর্ষণ ছিন্ন করলেও, হাতির দলপতি তাকে পদতলে স্থান দেয়।

তিনিও এটুকুই চান। আজ কেন ইন্দ্রজিৎ এই সেবিকাকে ত্যাগ করে যাচ্ছেন? স্বামী-স্ত্রীর চিরন্তন বন্ধনের কথা মনে করিয়ে ইন্দ্ৰজিৎ যত দ্রুত সম্ভব ফিরে আসার অঙ্গীকার করেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রমীলাই তো ইন্দ্রজিতের কল্যাণী। তার মঙ্গল কামনার জোরে এই যুদ্ধে ইন্দ্রজিৎ রাঘবকে অনায়াসে নাশ করতে পারবেন। প্রমোদকানন থেকে লঙ্কায় যাত্রাকালে ইন্দ্ৰজিৎ এভাবেই প্রমীলার কাছ থেকে বিদায় নিয়েছিলেন।


প্রশ্ন: 'অভিষেক করিলা কুমারে– 'কুমার' কে? পাঠ্য কবিতা অবলম্বনে কুমারের চরিত্র আলোচনা করো।

অথবা, 'অভিষেক' কাব্যাংশে ইন্দ্রজিতের চরিত্রবৈশিষ্ট্য যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তা আলোচনা করো।

অথবা, ‘অভিষেক' কবিতাটি অবলম্বনে ইন্দ্রজিতের চরিত্র আলোচনা করো।


অথবা, 'অভিষেক' কবিতা অবলম্বনে 'ইন্দ্রজিৎ' চরিত্রটি বিশ্লেষণ করো।

উত্তর >  আমাদের পাঠ্য কাব্যাংশ 'অভিষেক'-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র মেঘনাদ বা ইন্দ্রজিৎ। তিনিই কবিতায় 'কুমার' সম্বোধনে সম্বোধিত হয়েছেন।

পাঠ্যাংশের স্বল্প পরিসরে তাঁর চরিত্রের বেশ কিছু দিক ফুটে ওঠে


 বীরত্ব : বীর ইন্দ্রজিৎ নিজের বাহুবলের ওপর যথেষ্ট আস্থাশীল। বীরবাহুর মৃত্যু ও পিতার যুদ্ধযাত্রার কথা শুনে তাঁর বীরসত্তা জেগে ওঠে। বীরোচিত সাজসজ্জা করে তিনি লঙ্কার উদ্দেশে যাত্রা করেন।


 আত্মপ্রত্যয় : ইন্দ্ৰজিৎ আগে দু-বার রামচন্দ্রকে পরাজিত করেছেন, এমনকি তাকে নিহতও করেছেন। তবু কোনো এক মায়াবলে আবার জীবন ফিরে পেয়েছেন রাম। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি যখন রামচন্দ্রকে বন্দি করে রাবণের পদতলে নিয়ে আসার কথা বলেন, তখন তাঁর মধ্যে আত্মপ্রত্যয় ও দৃঢ়তা লক্ষ করা যায়।


 কর্তব্যবোধ : প্রমোদকাননে বিলাসে মত্ত থাকাকালীন প্রভাষারূপী লক্ষ্মীর

কাছে লঙ্কার দুর্দিন এবং পিতার যুদ্ধযাত্রার কথা শোনামাত্রই ইন্দ্ৰজিৎ লঙ্কায় উপস্থিত হন। যোগ্য সন্তান থাকা সত্ত্বেও পিতার যুদ্ধযাত্রাকে তিনি নিজের কলঙ্ক বলেই মনে করেন।


 দেশপ্রেম ও আত্মসমালোচনা : স্বর্ণলঙ্কা শত্রুসেনা দ্বারা আক্রান্ত অথচ তিনি প্রমোদকাননে বিলাসে মত্ত এ কথা জেনে ইন্দ্ৰজিৎ নিজেকে ধিক্কার দেন।

এর থেকে তাঁর দেশপ্রেমের যেমন পরিচয় পাওয়া যায়, তেমনই বোঝা যায় প্রয়োজনে নিজের সমালোচনা করতেও তিনি পিছপা নন।


পত্নীপ্রেম: স্ত্রী প্রমীলার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তাঁকে আশ্বস্ত করে ইন্দ্রজিৎ বলেন ভালোবাসার যে-দৃঢ় বন্ধনে তাঁরা আবদ্ধ তা ছিন্ন হওয়ার নয়। এ তাঁর পত্নীপ্রেমেরই পরিচয়।

এভাবেই মহাকাব্যের খলনায়ক চরিত্র মধুসূদনের লিখনকৌশলে হয়ে

উঠেছে কবির পছন্দের নায়ক।


প্রশ্ন : 'অভিষেক' কাব্যাংশে রাবণ চরিত্র আলোচনা করো।

উত্তর >  মধুসুদনের রাবণ এক ভাগ্যবিড়ম্বিত নায়ক। পাঠ্যাংশে আমরা তাঁকে পাই একজন স্নেহশীল পিতা, দৈবাহত রাজা, দায়িত্ববান শাসক, ভ্রাতৃপ্রেমী অগ্রজ, সমর বিশেষজ্ঞ এবং ধর্মভীরু হিসেবে।

◆ স্নেহশীল পিতা : বীরবাহুর মৃত্যুতে শোক এবং ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধে পাঠাতে

না-চাওয়া লঙ্কেশ্বর রাবণের অকৃত্রিম পুত্রস্নেহের পরিচায়ক।

◆ দৈবাহত রাজা : রাবণের রণসজ্জার মধ্যে তাঁর তেজোদৃপ্ত রাজসিক ভাব যথেষ্ট প্রকাশিত হলেও এই রাজাকেই আমরা নিয়তির কাছে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করতে দেখি। তিনি 'বিধি বাম' বলে ইন্দ্রজিতের কাছে অসহায়তা প্রকাশ করেন।

দায়িত্ববান শাসক : কুম্ভকর্ণ ও বীরবাহুর মৃত্যুতে লঙ্কাপুরী যখন

বীরশূন্য তখন দেশকে বাঁচাতে রাজা রাবণ স্বয়ং যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নেয়। তাঁর এই উদ্যোগ রাজা হিসেবে তাঁর দায়িত্বকেই প্রকট করে।

ভ্রাতৃপ্রেমী অগ্রজ : দেশের সুরক্ষার স্বার্থে রাবণ কুম্ভকর্ণকে অকালে জাগিয়ে যুদ্ধে পাঠান এবং যুদ্ধে কুম্ভকর্ণের মৃত্যু হয়। এজন্য তিনি শুধু শোকগ্রস্তই হন না বরং নিজেকে দায়ীও মনে করেন।


সমর বিশেষজ্ঞ : লঙ্কেশ্বর দেশের স্বার্থে যোগ্য বীর ইন্দ্রজিৎকে সেনাপতি পদে বরণ করে নেন। তবে তাঁর অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ইন্দ্রজিৎকে রাতে যুদ্ধে যেতে নিষেধ করেন।

ধর্মভীরু : ইন্দ্রজিৎকে সেনাপতি পদে অভিষিক্ত করার সময় রাবণ শাস্ত্রবিধি মেনেই তা করেন। এমনকি যুদ্ধে যাওয়ার আগে তিনি ইন্দ্রজিৎকে ইস্টদেবতার পূজা করার উপদেশ দেন। এ তাঁর ধর্মভীরুতারই প্রকাশ।


প্রশ্ন : মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' কাব্যাংশ অবলম্বনে ধাত্রীরূপী ইন্দিরা ও ইন্দ্রজিতের সাক্ষাৎ দৃশ্যটি বর্ণনা করো।

উত্তর/ 'অভিষেক' কাব্যাংশ অনুসারে ধাত্রীরূপী ইন্দিরা তথ্য লক্ষ্মী

প্রমোদকাননে ইন্দ্রজিতের কাছে গিয়ে উপস্থিত হন। বিনয়াবনত ইন্দ্রজিৎ ধাত্রীর চরণে প্রণাম করে 'কনক-আসন' ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। তিনি প্রভাষারূপী লক্ষ্মীর কাছে শারীরিক কুশলতা সহ এখানে আসার কারণ জানতে চান। তখন ছদ্মবেশী লক্ষ্মী বীরবাহুর মৃত্যু এবং পুত্রশোকে আহত রাবণের যুদ্ধযাত্রার সংবাদ জানান।

প্রভাষারূপী লক্ষ্মীর মুখে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ শুনে ইন্দ্ৰজিৎ বিস্মিত

হয়েছিলেন, কারণ তাঁর দ্বারা পরাস্ত ও নিহত রামের হাতে বীরবাহুর কীভাবে মৃত্যু হতে পারে ! ইন্দ্রজিতের কাছে এই বার্তা অদ্ভূত বলে মনে হয়েছে এবং বার্তার উৎস জানতে চাইলে লক্ষ্মীদেবী সীতাপতি রাঘবকে মায়াবী মানব বলে অভিহিত করেন। ও ইন্দ্রজিৎকে এই কালসমরে লঙ্কাকে রক্ষার আহ্বান জানান।

ইন্দিরা সুন্দরীর মুখে ইন্দ্ৰজিৎ মায়াবী মানব সীতাপতির পুনরুজ্জীবনের

কথা শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তিনি গলার ফুলের মালা ছিঁড়ে, হাতের সোনার বালা ও কানের অলংকার সমস্ত ছুড়ে ফেললেন। অশোক গাছের তলায় অশোক ফুল যেভাবে পড়ে থাকে সেভাবেই ইন্দ্রজিতের সমস্ত অলংকার

তাঁর পদতলে শোভা পাচ্ছিল। তীব্র আত্মধিক্কারে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন—যখন শত্রুদল স্বর্ণলঙ্কা ঘিরে ফেলেছে তখন তাঁর মতো বীরের পক্ষে কি নারীদের মাঝে বিলাসমত্ত থাকা শোভা পায়? তীব্র ক্রোধ ও আত্মগ্লানির বশবর্তী হয়ে ইন্দ্রজিৎ অনুচরদের যুদ্ধযাত্রার জন্য রথ প্রস্তুত করতে বলেন এবং শত্রুপক্ষকে বধ করে অপবাদ ঘোচাবার অঙ্গীকার করেন।


প্রশ্ন :  ‘জিজ্ঞাসিলা মহাবাহু বিস্ময় মানিয়া: '-'মহাবাহু' কে?

প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তাঁর বিস্ময়ের কারণ উল্লেখ করো।


উত্তর > মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত আমাদের পাঠ্য 'অভিষেক' নামক কাব্যাংশে ‘মহাবাহু' বলতে রাবণ ও মন্দোদরী পুত্র ইন্দ্রজিৎকে বোঝানো হয়েছে। প্রবল পরাক্রমী বীরত্বের জন্য তাঁকে এই বিশেষণে বিশেষিত করা হয়েছে।

|| প্ৰমোদ উদ্যানে যখন ইন্দ্ৰজিৎ বিলাসমত্ত, ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশধারী দেবী লক্ষ্মী তখন সেখানে আসেন। ধাত্রীকে দেখে ইন্দ্ৰজিৎ কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়েন এবং সিংহাসন ত্যাগ করে বিনম্র চিত্তে তাঁর আগমনের কারণ ও লঙ্কার কুশল জিজ্ঞাসা করলেন।

ছদ্মবেশী দেবী তাঁর শিরঃচুম্বন করে কনকলঙ্কার দুর্দশার ইঙ্গিত দেন। তিনি

আরও জানান, এক ভীষণ যুদ্ধে ইন্দ্রজিতের প্রিয় ভাই বীরবাহুর মৃত্যু ঘটেছে এবং শোকাহত রাবণ সেইজন্য সসৈন্যে যুদ্ধযাত্রার আয়োজন করছেন। এসব শুনেই মহাবাহু ইন্দ্রজিতের এমন বিস্ময়ের উদ্রেক ঘটেছে।

| রামের হাতে প্রিয় ভ্রাতা বীরবাহুর মৃত্যু ঘটেছে এ কথা শুনে তাঁর মনে

বিস্ময় জেগেছে, কারণ ইন্দ্রজিৎ ইতিপূর্বে রাত্রিকালীন যুদ্ধে রামকে তিরের আঘাতে টুকরো টুকরো করে কেটে হত্যা করেন। অথচ সেই রামের হাতেই বীরবাহুর মৃত্যু হয়েছে। ব্যাপারটা তাঁকে বিস্মিত করেছে। তাই ইন্দ্রজিৎ ভগবতীর কাছে অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে এর বাস্তবতা জানতে চেয়েছেন।


প্রশ্ন: "রত্নাকর রত্নোত্তমা ইন্দিরা সুন্দরী/উত্তরিলা' - 'ইন্দিরা সুন্দরী' কে? তাঁর উত্তরটি কী ছিল। উত্তরে মেঘনাদের প্রতিক্রিয়া কী ছিল ?

উত্তর >  মধুসূদনের 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গ থেকে সংকলিত

আমাদের পাঠ্য 'অভিষেক' নামক কাব্যাংশে 'ইন্দিরা সুন্দরী' বলতে বিষ্ণুপত্নী লক্ষ্মীদেবীকে বোঝানো হয়েছে।

॥ ধাত্রী প্রভাষার ছদ্মবেশে দেবী লক্ষ্মীর মুখে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ শুনে ইন্দ্রজিৎ বিস্মিত হয়েছিলেন, কারণ তার দ্বারা পরাস্ত ও নিহত রামের হাতে বীরবাহুর কীভাবে মৃত্যু হতে পারে! ইন্দ্রজিতের কাছে এই বার্তা অদ্ভুত বলে মনে হয়েছে এবং বার্তার উৎস জানতে চাইলে লক্ষ্মীদেবী সীতাপতি রাঘবকে মায়াবী মানব বলে অভিহিত করেন ও ইন্দ্রজিৎকে এই কালসমরে লঙ্কাকে রক্ষার আহ্বান জানান।

| ইন্দিরা সুন্দরীর মুখে ইন্দ্ৰজিৎ মায়াবী মানব সীতাপতির পুনরুজ্জীবনের কথা শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। তিনি গলার ফুলের মালা ছিঁড়ে, হাতের সোনার বালা ও কানের অলংকার সমস্ত ছুড়ে ফেললেন। অশোক গাছের তলায় অশোক ফুল যেভাবে পড়ে থাকে সেভাবেই ইন্দ্রজিতের সমস্ত অলংকার

তাঁর পদতলে শোভা পাচ্ছিল। তীব্র আত্মধিক্কারে তিনি নিজেকে প্রশ্ন করেন—যখন শত্রুদল স্বর্ণলঙ্কা ঘিরে ফেলেছে তখন তাঁর মতো বীরের পক্ষে কি নারীদের মাঝে বিলাসমত্ত থাকা শোভা পায়? তীব্র ক্রোধ ও আত্মগ্লানির বশবর্তী হয়ে ইন্দ্রজিৎ অনুচরদের যুদ্ধযাত্রার জন্য রথ প্রস্তুত করতে বলেন এবং শত্রুপক্ষকে বধ করে অপবাদ ঘোচানোর অঙ্গীকার করেন

প্রশ্ন :  'ঘুচাব এ অপবাদ, বধি রিপুকুলে—‘এ অপবাদ” বলতে বক্তা কোন্ অপবাদের কথা বলেছেন? সেই অপবাদ ঘোচাতে বক্তা কী করেছিলেন?


উত্তর >  মাইকেল মধুসুদনের ‘অভিষেক’ নামাঙ্কিত কাব্যাংশ থেকে গৃহীত উদ্ধৃতিটির বক্তা রক্ষোকুলের শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা ইন্দ্রজিৎ। তিনি প্রমোদকাননে বিলাসব্যসনে মগ্ন অবস্থায় প্রভাষারূপী লক্ষ্মীর কাছে বীরবাহুর মৃত্যুসংবাদ এবং পিতা রাবণের যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতির কথা শোনেন। লঙ্কার এমন ঘোর দুর্দিনে নিজের ভূমিকায় ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট ইন্দ্ৰজিৎ আত্মধিক্কার দেন। সেইসঙ্গে যুদ্ধে শত্রুকুলের আমূল বিনাশ।ঘটিয়ে সমস্ত অপবাদ মুছে ফেলার সংকল্প করেন।

|| ইন্দ্রজিতের নির্দেশে দ্রুত গগনচারী রথ এসে উপস্থিত হয়। তিনি রণসাজে সজ্জিত হন। তাঁর যোদ্ধা রূপ শুধু দেবসেনাপতি কার্তিক এবং বৃহন্নলারূপী অর্জুনের সঙ্গে তুলনীয়। এসময় স্ত্রী প্রমীলা তাঁর পথ রোধ করে দাঁড়ালে ইন্দ্রজিতের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ভালোবাসা আর আত্মবিশ্বাসের উপর বাণী। তারপর প্রাণাধিক প্রিয় ‘বিধুমুখী'-র কাছ থেকে বিদায় নিয়ে তিনি আকাশপথে লঙ্কাপুরীতে এসে পৌঁছোন। তাঁর ধনুকের ছিলার টংকারে সমগ্র

জলধিসহ লঙ্কা কেঁপে ওঠে। ইন্দ্রজিৎকে দেখে সমস্ত রাক্ষস সৈন্যদল সাহস ও অহংকারে রণহুংকার দিয়ে ওঠে। মধুসুদানের ইন্দ্রজিতের মধ্যে সাহস, সততা এবং বিনয়ের এক আশ্চর্য সংমিশ্রণ দেখা যায়। এই সমস্ত গুণের সাহায্যেই তিনি অসহায় পিতাকে আশ্বস্ত করেন। আর দ্বিতীয়বার রাঘবকে বধ করার জন্য রাবণের কাছে অনুমতি চান। পিতা রাবণ প্রথমে ইস্টদেবতার পূজা সাঙ্গ করে পরদিন সকালে তাঁকে যুদ্ধযাত্রার পরামর্শ দেন এবং যথানিয়মে ইন্দ্রজিতকে সেনাপতি পদে বরণ করে নেন।

প্রশ্ন : 'সাজিলা রথীন্দ্রর্যভ বীর -আভরণে,'- 'রথীন্দ্রর্যন্ত' বলতে কাকে বোঝানো হয়েছে? তাঁর এই বার আভরণে সজ্জিত হওয়াকে কাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে, ঘটনা উল্লেখ করে তা বর্ণনা করো

উত্তর > মধুসূদনের 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গ থেকে গৃহীত পাঠ্য ‘অভিষেক' নামক কাব্যাংশে আমরা 'রথীন্দ্রর্যন্ত' শব্দটি পাই, যার অর্থ শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা। এক্ষেত্রে রাবণপুত্র ইন্দ্রজিতের বীরত্ব বোঝাতে ‘রথীন্দ্রর্যভ' শব্দটি কবি ব্যবহার করেছেন।

|| ইন্দ্ৰজিৎকে শ্রেষ্ঠ যোদ্ধা হিসেবে বর্ণনা করতে গিয়ে কবি তাঁকে দেবসেনাপতি কার্তিক ও বৃহন্নলারূপী তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুনের বীরত্বের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্ত্রী প্রমীলা-সহ নারীদের মাঝে বিলাসমত্ত ইন্দ্রজিৎ ছদ্মবেশী লক্ষ্মীদেবীর মুখে যখন শুনলেন, তাঁর প্রিয় ভাই বীরবাহু রাঘবের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন এবং পিতা রাবণ শোকাহত অবস্থাতেই যুদ্ধযাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, তখন তিনি নিজেকে তীব্র ধিক্কার জানান। শত্রুপক্ষকে বধ করেই তিনি এই অপবাদ ঘোচাতে চান।

বীরসাজে সজ্জিত ইন্দ্রজিতের পরাক্রম বোঝাতেই কবি এই দুই শ্রেষ্ঠ যোদ্ধার সাহসিকতার সঙ্গে ইন্দ্রজিতের সাহসিকতার তুলনা করেছেন। তারকাসুর স্বর্গরাজ্য অধিকার করে দেবলোকে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল। পার্বতী ও মহাদেবের পুত্র কার্তিকেয় তাকে হত্যা করে স্বর্গরাজ্য দেবতাদের ফিরিয়ে দেন। বৃহন্নলারূপী কিরীটি অর্থাৎ অর্জুন অজ্ঞাতবাসকালে বিরাট রাজকন্যার নৃত্যগীতাদির শিক্ষক ছিলেন। সেই সময় দুর্যোধনরা বিরাটের গোধন অপহরণ করলে প্রবল পরাক্রমী অর্জুন তথা বৃহন্নলারূপী কিরীটি তা রক্ষ করেন।


প্ৰশ্ন : ‘যথা নাশিতে তারকে মহাসুর; কিম্বা যথা বৃহন্নলারূপী কিরীটি,–'বৃহন্নলারুপী কিরীটি' কে? তার বৃত্তান্তটি বর্ণনা করো। 'নাশিতে তারকে মহাসুর' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

উত্তর > কবি মধুসুদন দত্তের 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গের অন্তর্গত পাঠ্য 'অভিষেক' কাব্যাংশ থেকে উপরোক্ত উদ্ধৃতাংশটি গৃহীত। ‘বৃহন্নলারূপী কিরীটি' হলেন পাণ্ডবশ্রেষ্ঠ অর্জুন। তিনি দেবরাজ ইন্দ্রের দেওয়া কিরীট বা মুকুট মাথায় ধারণ করতেন বলে তাঁর আর-এক নাম কিরীটি।

|| পাঠ্যে উল্লিখিত 'বৃহন্নলারূপী কিরীটি' তথা তৃতীয় পাণ্ডব অর্জুন বিরাট রাজার গৃহে অজ্ঞাতবাসে থাকার সময় রাজকন্যা উত্তরাকে নৃত্যগীতাদি শিক্ষাদানের জন্য বৃহন্নলা ছদ্মবেশ ধারণ করেন। সেই সময় কৌরব ভ্রাতৃবর্গ বিরাট রাজার গোধন অপহরণ করে বিরাটকে পরাজিত ও বন্দি করেন। রাজপুত্রvউত্তরের সারথিরূপে এবং বৃহন্নলারূপী অর্জুন যুদ্ধে কৌরবদের সম্মুখীন হন এবং গোধনসমূহ উদ্ধার করে, শত্রুদের পরাজিত করে বিরাট রাজাকে বিপদ থেকে মুক্ত করেন। 'অভিষেক' কবিতায় কবি মধুসূদন অত্যন্ত সচেতনভাবেই দুই শ্রেষ্ঠ যোদ্ধার পরাক্রম বোঝাতে ধনুর্ধর অর্জুনের সঙ্গে ইন্দ্রজিতের সাহসিকতার তুলনা করেছেন।


|| "নাশিতে তারকে মহাসুর' বলতে, দেবসেনাপতি কার্তিকেয়র হাতে

তারকাসুর বধের প্রসঙ্গটি উত্থাপিত হয়েছে। তারকাসুর একসময় স্বর্গরাজ্য অধিকার করে দেবলোকে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল।

পার্বতী ও মহাদেবের পুত্র দেবসেনাপতি কার্তিকেয় স্বর্গরাজ্য নিষ্কণ্টক করার জন্য তারকাসুরকে বধ করে দেবতাদের রক্ষা করেন। স্বাজাত্যবোধ ও স্বাদেশিকতায় উদ্দীপিত পিতৃভক্ত বীর ইন্দ্রজিৎকে কবি দেবসেনাপতি কার্তিকের সঙ্গে তুলনা করেছেন।


প্রশ্ন:  তবে কেন তুমি, গুণনিধি, ত্যজ কিঙ্করীরে আজি?

—কিঙ্করী” কে? তাঁর চরিত্রবৈশিষ্ট্য আলোচনা করো।


উওর:  মধুসূদনের 'অভিষেক' কাব্যাংশে কিঙ্করী হলেন প্রমীলা। ‘কিঙ্করী' শব্দের অর্থ দাসী। স্বামীর বিরহে কাতর এক স্ত্রীর আকুতি প্রমীলার এই উক্তির মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছে।

| প্রমীলা রাবণের পুত্রবধূ, মেঘনাদের স্ত্রী। মহাকাব্যে চিত্রিত প্রমীলা চরিত্র কবির কল্পনাপ্রসূত। মূল বাল্মীকি রামায়ণে এই চরিত্র সম্পর্কে উল্লেখ না-থাকলেও কৃত্তিবাসী রামায়ণে এই চরিত্রের উল্লেখ চরিত্র বৈশিষ্ট্য আছে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য সাহিত্যের সংমিশ্রণে মধুসূদন তাঁর এই মানসকন্যাকে অঙ্কন করেছেন; যা বাংলা সাহিত্যে বিরল।


পতিবিরহে কাতর : পাঠে আমরা প্রমীলাকে পাই এমন এক নারী হিসেবে যিনি যুদ্ধগামী পাতিকে বিদায় দিতে অনিচ্ছুক। একজন কুলবধূর পক্ষে তাই স্বাভাবিক। তিনি পতিপ্রেমে মুগ্ধ, তাই সাময়িক পতিবিরহ যে তাঁর পক্ষে অসহনীয় তার উল্লেখ তাঁর উক্তিতেই পাওয়া যায়।

যোগ্য পত্নী : প্রমীলা মেঘনাদের সুযোগ্য পত্নী। সর্বজয়ী প্রেমে তিনি মেঘনাদকে জয় করেছেন। মেঘনাদের উক্তিতেই তা স্পষ্ট, ইন্দ্ৰজিতে জিতি তুমি, সতি,/বেঁধেছ যে দৃঢ় বাঁধে, কে পারে খুলিতে/ সে বাঁধে ?'—এ কেবল মুখের কথা নয়, এ এক পরমসত্য। নারী যে বিচিত্র রূপ ধরতে পারে, তা প্রমীলার মধ্যে দেখা যায়। যেভাবে তিনি দেব-দৈত্য-নর-ত্রাস রণরঙ্গে মত্ত বীরকে নিজের প্রেমে আবদ্ধ করেছেন তা তুলনাহীন।

প্রশ্ন  ‘যেন উড়িলা মৈনাক-শৈল– পৌরাণিক আখ্যানটি লেখো।

পাঠ্য কবিতা অবলম্বনে ইন্দ্রজিতের লঙ্কাযাত্রার বর্ণনা দাও।

উত্তর >  পাঠ্য 'অভিষেক' কাব্যাংশে কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত উদ্ধৃত প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন।

কৈলাসের দক্ষিণে অবস্থিত মৈনাক পর্বত হিমালয় ও মেনকার পুত্র। পুরাণ অনুসারে পূর্বকালে পর্বতদের পাখা থাকত। পাখির মতো তাঁরা চারদিকে আকাশপথে ভ্রমণ করতে পারতেন। দেবতা ও ঋষিরা এই পর্বতদের সর্বদা ভয় করতেন। ইন্দ্র একবার ক্রুদ্ধ হয়ে সব পর্বতের পক্ষচ্ছেদ করেছিলেন। কিন্তু মৈনাক পবনদেবের সাহায্যে সাগরে আশ্রয় নিয়ে ইন্দ্রের আক্রমণ থেকে রক্ষা পান। হনুমানের সাগর পার হওয়ার সময় পবনদেবের উপকারের কথা স্মরণ করে তাঁর বিশ্রামের জন্য মৈনাক পর্বত জল থেকে উঠে এসে হনুমানকে তার উপর বিশ্রাম নিতে বলেন। হনুমান তাঁকে স্পর্শ করে ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যান। রামায়ণে আমরা এই কাহিনির

উল্লেখ পাই।

| প্রভাষা যাত্রীর ছদ্মবেশধারী লক্ষ্মীর কাছে স্বর্ণলঙ্কার ঘোরতর দুর্দিনের

কথা শুনে, ইন্দ্রজিতের প্রমোদকানন ত্যাগ করে স্বর্ণলঙ্কার উদ্দেশে যাত্রাকে

কবি মৈনাক শৈলের হেমপাখা বিস্তার করে সমস্ত আকাশময় ঘুরে বেড়ানোর সঙ্গে তুলনা করেছেন। ক্রুব্ধ ইন্দ্রজিতের ধনুকের টংকার যেন মেঘমাঝে গরুড়ের প্রবল গর্জন। ইন্দ্রজিতের এই প্রবল প্রতাপে স্বর্ণলঙ্কাসহ সমুদ্র বারবার কেঁপে উঠতে থাকে।

 প্ৰশ্ন  ‘নমি পুত্র পিতার চরণে, করজোড়ে কহিলা;-পিতা ও পুত্রের পরিচয় দাও। পাঠ্যাংশ অবলম্বনে পিতা ও পুত্রের কথোপকথন নিজের ভাষায় লেখো ।


উত্তর >  মধুসূদনের 'মেঘনাদবধ কাব্য'-এর প্রথম সর্গ থেকে গৃহীত পাঠ্য

 অভিষেক’ কাব্যাংশের উদ্ধৃত অংশটিতে পিতা হলেন লঙ্কাধিপতি রাবণ এবং পুত্র হল রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ।

||| পিতা রাবণকে প্রণাম জানিয়ে ইন্দ্রজিৎ যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চান। তাঁর হাতে নিশারণে নিহত রাম পুনর্জীবন লাভ করেছেন শুনে তিনি রাঘবকে অগ্নি অস্ত্রে ভস্ম করার কিংবা রাজপদে বেঁধে আনার সংকল্প করেন। পুত্রের কথায় পুত্রবৎসল এক পিতার হৃদয়ের প্রকৃত স্বরূপটি ফুটে ওঠে। সেখানে ধ্বনিত হয় স্নেহ-হাহাকার ও অসহায়তা। রক্ষোকুলের শ্রেষ্ঠ সম্পদটিকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাতে তাঁর মন চায় না। তিনি চান না স্বর্ণলঙ্কার শেষ কুলপ্রদীপটি নির্বাপিত হোক। কারণ স্বয়ং বিধাতা রাবণের প্রতি বিরূপ; না-হলে শিলা যেমন জলে ভাসে না, তেমনই মৃত কখনও পুনর্জীবন পায় না। অথচ এক্ষেত্রে তাই ঘটেছে। কিন্তু পৌরুষ ও সৎসাহসে উদ্দীপ্ত ইন্দ্রজিৎ অগ্নিদেবকে রুষ্ট করতে কিংবা পরাজিত ইন্দ্রদেবের হাসির পাত্র হতে পারেন না। তাই তিনি দ্বিতীয়বার রাঘবক পরাজিত করার জন্য পিতার আজ্ঞা চান। রাবণের অন্তর ক্ষতবিক্ষত, মানসিক টানাপোড়েনে তিনি আকুল-অস্থির। তাঁর দৃষ্টির সামনে ভূপতিত পর্বতসম কুম্ভকর্ণ। তিনি প্রাণাধিক প্রিয় ‘বীরমণি’-কে প্রথমে ইষ্টদেবের পূজা ও তারপর নিকুম্ভিলা যজ্ঞ সাঙ্গ করে পরদিন সকালে যুদ্ধযাত্রা করতে বলেন। কিন্তু দ্বিধাদ্বন্দ্ব প্রশমিত করে যথাবিধি মেনে সেনাপতি পদে ইন্দ্রজিতের অভিষেক ঘটান। এখানে এক ভাগ্যবিড়ম্বিত-শোকাহত ও নিঃসঙ্গ পিতার পাশে, সাহস-অহংকার আর বীরধর্মে উজ্জীবিত পুত্রের আশ্চর্য ছবি তুলে ধরেছেন কবি মধুসুদন।


প্রশ্ন: 'হায়, বিধি বাম মম প্রতি-বক্তা কে? তার এরূপ বক্তব্যের কারণ কী ?

উত্তর >  মাইকেল মধুসূদন দত্তের 'অভিষেক' নামাঙ্কিত পদ্যাংশের অন্তর্গত প্রশ্নোদ্ধৃত অংশের উক্তির বক্তা হলেন রাবণ স্বয়ং।

| প্রিয় ভ্রাতা বীরবাহুর মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ক্রুদ্ধ ইন্দ্ৰজিৎ লঙ্কায় উপস্থিত হয়ে পিতা রাবণের কাছে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করেন। পুত্র বীরবাহুর শোক কাটতে না কাটতে রামের বিরুদ্ধে এই ভয়ানক যুদ্ধে রাবণ তাঁর আর এক প্রিয় পুত্রকে পাঠাতে চান না। নিয়তির নিষ্ঠুরতাকে রাবণ তাঁর জীবনে বারবার

উপলব্ধি করেছেন। ইন্দ্রজিতের সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত ও নিহত রাম পুনর্জীবন

লাভ করে বীরবাহুকে হত্যা করেছে—এই সংবাদে তিনি একদিকে যেমন হতাশ হয়েছেন, অন্যদিকে নিয়তির নিষ্ঠুর খেলাকেও মানতে বাধ্য হয়েছেন। ভ্রাতা কুম্ভকর্ণের মতো বীরকেও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে তিনি দেখেছেন। তাই তিনি রাক্ষসকুল শেখর ইন্দ্রজিৎকে বলেন- 'এ কাল সমরে, /নাহি চাহে প্রাণ মম পাঠাইতে তোমা/বারম্বার।' কিন্তু ভাগ্য তাঁর প্রতি এতটাই বিরূপ যে, শেষপর্যন্ত লঙ্কার শ্রেষ্ঠ সন্তান তথা প্রিয় পুত্র ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধে পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি।

প্রশ্ন:  'কি ছার সে নয়, তারে ডরাও আপনি,/ রাজেন্দ্র ? থাকিতে দাস, যদি যাও রণে- রাজেন্দ্র' কে? তাঁর প্রতি বক্তার এমন মন্তব্যের কারণ আলোচনা করো।

উত্তর > আমাদের পাঠ্য মধুসূদনের ‘অভিষেক' নামক কাব্যাংশে ‘রাজেন্দ্র’ বলতে লঙ্কাধিপতি রাবণকে বোঝানো হয়েছে। অসুরারি রিপু ইন্দ্রজিৎ তাঁর পিতাকে এ নামে অভিহিত করেছেন।

| প্রভাষার ছদ্মবেশধারী লক্ষ্মীর মুখে রামের হাতে বীরবাহুর মৃত্যু এবং লঙ্কার এই ঘোর দুর্দিনে শোকাহত রাবণের যুদ্ধযাত্রার কথা শুনে, নিজেকে তীব্র ধিক্কার জানিয়ে প্রমোদকানন ত্যাগ করে ইন্দ্রজিৎ লঙ্কায় আসেন। রামের মায়া না-বুঝলেও ইন্দ্রজিৎ তাঁকে ভস্ম করার কিংবা বেঁধে আনার অঙ্গীকার করে পিতার কাছে যুদ্ধের অনুমতি চান। বিধাতার কাছে পরাজিত পুত্রবৎসল পিতা রাবণ লঙ্কার রাজবংশের শেষ প্রদীপকে নির্বাপিত করতে চান না। তাই তিনি ইন্দ্রজিৎকে যুদ্ধের অনুমতি দিতে নারাজ। কিন্তু পৌরুষের মাহাত্ম্যে উজ্জ্বল দেবরাজ ইন্দ্রকে যিনি পরাস্ত করেছেন তিনি যুদ্ধে না-গিয়ে পিতাকে পাঠালে ইন্দ্র হাসবেন এবং অগ্নি রাগ করবেন। তাই পিতার ভেঙে পড়া মানসিক নিজের বীরদর্পকে উজ্জীবিত করার জন্য গভীর আত্মপ্রত্যয়ের ইন্দ্রজিতের এমন মন্তব্য।

প্রশ্ন: 'তারে ডরাও আপনি, বক্তা ও শ্রোতা কারা ? বক্তার মন্তব্যের কারণ কী? শ্রোতাকে বক্তা কী বলে আশ্বস্ত করেন?

উত্তর >  মাইকেল মধুসুদন দত্তের 'অভিষেক' কাব্যাংশ থেকে আে

প্রশ্নোদৃত অংশটি গৃহীত। উক্ত অংশে বক্তা হলেন। রাবণপুত্র ইন্দ্রজিৎ এবং শ্রোতা হলেন রক্ষোরাজ রাবণ।

| প্রভাষার ছদ্মবেশধারী লক্ষ্মীর কাছে ইন্দ্রজিৎ স্বর্ণলঙ্কার ঘোরতর

দুর্দিনের সংবাদ সহ আর একটি অবিশ্বাস্য সংবাদ পেলেন, পরাজিত ও মরণোন্মুখ রামচন্দ্র পুনরায় বেঁচে উঠে ভাই বীরবাহুকে হত্যা করেছেন। কোবে প্রমোদকানন ত্যাগ করে ইন্দ্রজিৎ স্বর্ণলঙ্কায় এসে উপস্থিত হন এবং পিতাকে আশ্বস্ত করে স্বয়ং শত্রুনিধনের উদ্দেশ্যে যুদ্ধযাত্রার বাসনা প্রকাশ করেন। পুত্রবৎসল‍্য পিতা রাবণের পুত্রকে যুদ্ধে পাঠাতে মন সায় দেয় না।

|| ইন্দ্রজিৎ রাবণকে আশ্বস্ত করে বলেন—রামচন্দ্র একজন সামান্য মানুষ তাই তাকে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ তিনি দেখেন না। ইন্দ্রজিতের মতো সেবক থাকতে পিতা যদি যুদ্ধে যান তবে তা কলঙ্গের সমান। এই ঘটনায় মেঘবাহন ইন্দ্র হাসবেন, আর অগ্নিদেবও ক্রোধান্বিত হবেন। পরপর দু-বার শত্রুকুলকে মৃতপ্রায় করে যুদ্ধক্ষেত্রে জয়ী হয়েছেন ইন্দ্রজিৎ। এবার তিনি দেখতে চান কোন

ওষুধের বলে রাঘব পুনরায় প্রাণ ফিরে পায়। এই বিশ্বাস নিয়ে তিনি রাবণরাজাকে আশ্বস্ত করে যুদ্ধযাত্রার অনুমতি চাইলেন।